শিরোনাম
প্রকাশ : ৫ আগস্ট, ২০২০ ১৬:৪২

সরকারি রিপোর্ট কার্ডে প্রমাণিত এক বছরে কাশ্মীরে ব্যাপক উন্নয়নের খতিয়ান

অনলাইন ডেস্ক

সরকারি রিপোর্ট কার্ডে প্রমাণিত এক বছরে কাশ্মীরে ব্যাপক উন্নয়নের খতিয়ান
ফাইল ছবি

জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে উন্নয়নের বন্যা বইছে। কেন্দ্রশাসিত হওয়ার পর গত এক বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে ভূমি সংস্কার প্রভৃতি পেয়েছে বাড়তি গুরুত্ব। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করে জানানো হয়েছে- নব গঠিত দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খতিয়ান। অন্তত তিন ডজন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়নের সাক্ষী জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। এক বছরেই মানুষের জীবনযাপনের মান বদলে গেছে অনেকটা। শিক্ষা ক্ষেত্রে এসেছে আমূল পরিবর্তন। গড়ে উঠেছে সাধারণ স্কুল-কলেজের পাশাপাশি মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। 

সরকারি চাকরিরও সুযোগ বেড়েছে বেকারদের জন্য। রয়েছে দেশের অন্যান্য প্রান্তের মতো কাশ্মীর উপত্যকা সংরক্ষণের সুবিধা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রিপোর্ট কার্ডে উল্লেখ রয়েছে - গত এক বছরে মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে গৃহীত একগুচ্ছ স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কথাও।

গত বছর ৫ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিলুপ্তি ঘটে। বিতর্কিত ৩৭০ ধারাকে রদ করে জন্ম নেয় দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ। অবসান ঘটে উপত্যকায় বংশ পরম্পরায় পারিবারিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের। মানুষের কল্যাণই রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিচ্ছিন্নতাবাদের হাত ধরে জন্ম নেওয়া দেশীয় ও বিদেশি রাজনৈতিক মদদপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটিয়ে সেখানে এখন সার্বিক জনকল্যাণই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন ও জনগণের মূল লক্ষ্য। 

গত এক বছরে উপত্যকার মানুষদের জীবনযাপনের মান উন্নয়নে একগুচ্ছ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। রীতিমতো খতিয়ান প্রকাশ করে সরকার ৩৬টি সাফল্যের উল্লেখ করেছে। গত এক বছরে অর্জিত এই সাফল্যগুলোর প্রায় সবই জনহিতকর কর্মসূচির অঙ্গ। ব্যাপক কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই উপত্যকায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপক বন্দোবস্ত করা হয়।

খতিয়ান অনুযায়ী, গত এক বছরের মধ্যে ৫০টি নতুন ডিগ্রি কলেজ খোলা হয়েছে। এই কলেজগুলোতে ২৫ হাজারেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনার সুযোগ পাবে। সাধারণ ডিগ্রি কলেজের পাশাপাশি গত এক বছরে চালু হয়েছে সাতটি মেডিকেল কলেজ। এই মেডিকেল কলেজগুলোতে অতিরিক্ত ১৪০০ মেডিকেল বা প্যারামেডিকেল শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। এছাড়াও উপত্যকায় গড়ে উঠেছে ৫টি নতুন নার্সিং কলেজ। রাজ্যবাসীর স্বার্থে সরকারি উদ্যোগে একটি ক্যান্সার ইন্সটিটিউটও গড়ে তুলেছে সরকার। চিকিৎসার পাশাপাশি শিক্ষার ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে গত এক বছরে। কর্মসংস্থানেরও সুযোগ পাচ্ছেন স্থানীয় বেকাররা।

গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্রই এখন চাকরির ব্যাপক সুযোগ জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের বাসিন্দাদের জন্য। জম্মু-কাশ্মীরের গ্রামোন্নয়ন সচিব শীতল নন্দা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, স্টেট স্টাফ কমিশন বোর্ড নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু করে দিয়েছে। কর্মখালির প্রচুর বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হচ্ছে। নিয়োগও পাচ্ছেন স্থানীয়রা। গত এক বছর ধরেই চলছে স্থানীয়দের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ প্রক্রিয়া। অনেকে ইতিমধ্যেই কাজে যোগ দিয়েছেন। বাকিদের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন  নতুন পদও সৃষ্টি হচ্ছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর সরকার যুবকদের জন্যে ইতিমধ্যেই ১০ হাজারেরও বেশি পদ সৃষ্টি করেছে। সেই পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে পুরোদমে। এই মুহূর্তেই রয়েছে ১৮০০ হিসাব রক্ষকের সরকারি চাকরি। এছাড়াও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি নিয়োগেরও বিজ্ঞাপন দিয়ে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছে। নিয়োগে গুরুত্ব পাচ্ছে স্বচ্ছতা। কারণ সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনকে কেন্দ্রীয় সরকার বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সরকার গ্রামোন্নয়নের ওপর বাড়তি নজর দিচ্ছে। গ্রামোন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয়দের অংশগ্রহণকে দেওয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার। তাই পঞ্চায়েতকে শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি। পঞ্চায়েতের কাজে স্বচ্ছতা আনতে নিয়োগ করা হচ্ছে প্রায় ২ হাজার হিসাবরক্ষক। পঞ্চায়েতের কাজ যাতে সুষ্ঠভাবে করা যায় তাই এই উদ্যোগ। তৃণমূল স্তরে গণতান্ত্রিক ভিতকে শক্ত-পোক্ত করতে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব রুরাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পঞ্চায়েত রাজের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষজ্ঞের মতামত। তারা সমীক্ষা করে পঞ্চায়েতের কর্মীবল নিয়োগের বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার সেই পরামর্শ মতোই পঞ্চায়েতের নিজস্ব পদ তৈরি করছে। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়নে পঞ্চায়েতের কর্মী ও অফিসাররাই নিচ্ছেন মুখ্য ভূমিকা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ পাচ্ছে অগ্রাধিকার।

ব্যক্তিগত প্রতিভার উন্মোচনে হাতে নেওয়া হয়েছে হিম্মত কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলা হচ্ছে। স্কুল বা কলেজ ছুট ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে কর্মমুখী। তাদের প্রতিভা ও পছন্দ মতো প্রশিক্ষণের পর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করছে সরকার। ইতিমধ্যেই প্রশিক্ষিতদের ৭০ শতাংশেরই কর্মসংস্থানের বন্দোবস্ত করা গেছে বলে জানা গেছে। সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ ও পরে কাজের সুযোগ পেয়ে স্থানীয়রাও এখন খুব খুশি। 

সরকারি তথ্য বলছে, জম্মু ও কাশ্মীরে এখনও পর্যন্ত ৭৪ হাজার তরুণ প্রশিক্ষণ লাভ করেছে হিম্মত প্রকল্পে। জেলা কর্মসংস্থান দপ্তরে আরও ৬ লাখ তরুণ-তরুণীদের তাদের নাম নথিভুক্ত করেছে প্রশিক্ষণের জন্য। আসলে তাদের সামনে নতুন দিশা হিসাবে দেখা দিয়েছে এই প্রশিক্ষণ প্রকল্প। ৩৭০ ধারা রদ আসলে কাশ্মীরের মানুষের জীবন ধারাতেই নিয়ে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

হিমায়ত প্রকল্প প্রকৃত অর্থেই স্থায়ী রোজগারের দিশা দিচ্ছে যুবকদের। স্থানীয় যুবকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরাই নিজেদের জীবনযাপন করতে পাচ্ছেন। সরকার সব রকমের সাহায্য করছে। নিজেদের পছন্দের জীবন বেছে নিতে অর্থও মোটেই প্রতিবন্ধক হচ্ছে না। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যুবকদের স্বরোজগারের জন্য যাবতীয় বাধা দূর করতে সাহায্য করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। উৎপাদন থেকে বিনিয়গেও মিলছে সরকারি সহযোগিতা। 

কেন্দ্রের খতিয়া বলছে, হিম্মত থেকে প্রশিক্ষিতরা করোনাকালীন এই দুর্যোগেও পাচ্ছেন কর্মসংস্থানের সুযোগ। স্বাস্থ্যকর্মী হিসাবে প্রশিক্ষিতরা হাসপাতালে চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে নিযুক্ত রয়েছেন। 

অ্যাম্বুলেন্সে ডিউটির কাজেও লাগানো হচ্ছে তাদের। প্রশিক্ষিতরা যেমন আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি করোনা আক্রান্তরাও পাচ্ছেন প্রশিক্ষিত কর্মীদের সহযোগিতা। করোনা অতিমারি প্রতিরোধে হিম্মত প্রশিক্ষিতদের ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রের দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করছেন স্থানীয় মানুষ।

উপকৃতরা নিজেরাই এখন সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নানাভাবে উপকৃত উপত্যকার বেকাররা। যেমন রিয়াজির ইমতিয়াজ খান। তিনি নিজেই জানালেন হিম্মত তার জীবিকার পথ খুলে দিয়েছে। সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে করোনা অতিমারির সময়ও সংসার চালাতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। হিম্মত থেকেই সে অনুপ্রাণিত ও প্রশিক্ষিত হয়ে এখন পিপিই কিট তৈরি করছে। 

সরকারি সহযোগীতা সেই কিট বিক্রি করে ভালোই লাভ হচ্ছে। এরজন্য ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি ইমতিয়াজ। বেকারদের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদেরও অনেক সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে গত এক বছরে। স্কুল পড়ুয়াদের জন্য আনা হয়েছে স্টুডেন্ট হেল্থ কার্ড প্রকল্প। এই প্রকল্পে স্কুল পড়ুয়াদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন মতো চিকিৎসারও বন্দোবস্ত করে সরকার। 

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৮ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী এই প্রকল্পে উপকৃত হয়েছে। এছাড়াও সংখ্যালঘুদের জন্য প্রাক-মাধ্যমিক বৃত্তি প্রকল্পে গত এক বছরে উপকৃত হয়েছে ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭০ জন শিক্ষার্থী।

সব মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখের ছাত্র ও বেকার সমাজ গত এক বছরে দারুণভাবে উপকৃত।  
এছাড়াও সামাজিক কল্যাণে নেওয়া হয়েছে একগুচ্ছ কর্মসূচি। কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারাও পেয়েছেন জমির মালিকানা। মহিলাদের দেওয়া হয়েছে সম্পত্তির অধিকার। সংখ্যালঘু, তফসিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ের মানুষদের পাশাপাশি প্রতিবন্দি, দুস্থ, বিধবারা পাচ্ছেন সমাজকল্যাণ দপ্তরের বিভিন্ন কর্মসূচির সুবিধা। বিদ্যুতায়ন, পরিকাঠামোর উন্নয়ন থেকে শুরু আধুনিক কৃষির উন্নয়নে দেওয়া হচ্ছে সার্বিক সরকারি সহযোগিতা। কাশ্মীরের বিখ্যাত আপেল চাষীরা পাচ্ছেন অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে কৃষির সুবিধা। ফুলচাষীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের তেলকল খোলা হচ্ছে উপত্যকায়। চকচকে রাস্তাঘাটের পাশাপাশি শহরের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজকেও গুরুত্ব দিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। 

খেলাধুলার উন্নয়নের পাশাপাশি উপত্যকার ঐতিহ্যমণ্ডিত কারূ ও কুঠির শিল্পকেও চাঙ্গা করতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। সব মিলিয়ে উপত্যকার মানুষদের কাছে রাজ্যভাগ আশীর্বাদ হিসেবে ধরা দিয়েছে। স্থানীয় মানুষ সেটা বুঝতে পারছেন। আর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্ট কার্ডেও উঠে এসেছে মাত্র এক বছরে কাশ্মীরের আমূল পরিবর্তনের খতিয়ান।

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর