শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ২৩:১০

তালাকে এগিয়ে নারীরা

ঢাকা সিটি করপোরেশন

জিন্নাতুন নূর

লুবনা আহমেদ। চাকরি করেন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। দুই বছর হলো বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা সোহানকে বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর প্রথম কয়েক মাস ভালোভাবে সংসার চলছিল। এর মধ্যে লুবনা আবিষ্কার করেন সোহানের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। সোহান প্রায়ই লুবনার মোবাইল ফোনের এসএমএস ও কললিস্ট চেক করে দেখেন। এমনকি লুবনার অনুপস্থিতিতে তার মোবাইলের ফেসবুকে ঢুকেও ইনবক্সে কী আছে তা পড়েন। লুবনা এগুলো লক্ষ্য করলেও অশান্তি এড়াতে এড়িয়ে গেছেন। এক সময় অফিসের সহকর্মীদের সঙ্গে লুবনার সম্পর্ক আছে— এ ধরনের অমূলক সন্দেহ শুরু করলে লুবনা তার প্রতিবাদ শুরু করেন। একপর্যায়ে লুবনাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে শুরু করেন সোহান। লুবনা তার মা-বাবাকে বিষয়টি জানান। একপর্যায়ে বিবাহবিচ্ছেদের দিকে যান তিনি। লুবনা-সোহান সম্প্রতি সিটি করপোরেশন অফিসে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ প্রতিদিনের কাছে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন লুবনা। তার মতো অনেক নারীই এখন স্বামীর দ্বারা বা তার পরিবারের কাছ থেকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে তালাক নেওয়ার সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন। একইভাবে মতের মিল না হওয়ায় এবং স্ত্রীর আর্থিক চাহিদা মেটাতে না পারার কারণেও অনেক পুরুষ বিচ্ছেদমুখী হচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট কিছু কারণে তালাকের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে আছে-স্বামী কর্তৃক যৌতুক দাবি, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের দ্বারা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার, মাদকাসক্তি, বিয়েবহির্ভূত সম্পর্ক, দুজনের জীবনযাপনে অমিল থাকা, সন্দেহপ্রবণতা, স্বামীর কাছ থেকে ভরণ-পোষণ না পাওয়া, স্ত্রীর অবাধ্য হওয়া, সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্কে জড়ানো ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞরা বিবাহবিচ্ছেদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বামী-স্ত্রীকে কাউন্সিলিং করানোসহ স্থানীয় এনজিও ও অভিভাবকদের নিয়ে গ্রুপ মিটিং করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল (সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) প্রাপ্ত তথ্যে দুই সিটিতে মোট ৩২ হাজার ৫৭৫টি তালাকের জন্য আবেদন পড়েছে। এর মধ্যে ২০১১ সালে ৫৩২২টি, ২০১২ সালে ২৭৫৩টি, ২০১৩ সালে ৭৯০০টি, ২০১৪ সালে ৯১০০টি এবং ২০১৫ এর সেপ্টেম্বরে ৭৫০০টি আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ১৫ হাজার ২৮৬টি তালাকের আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে নারীদের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ২৩০টি এবং পুরুষদের পক্ষ থেকে ৫ হাজার ৫৬টি তালাকের আবেদন করা হয়। যার মধ্যে কার্যকর হয় ১৪ হাজার ১৫১টি তালাক। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২০১২ সালে চার হাজার ৫১৮ জন আবেদন করেন। যার মধ্যে ৬৫ ভাগ নারীই আবেদন করেছেন। ২০১৩ সালে চার হাজার ৪৭০টি আবেদনের মধ্যে ৬৪ ভাগই মেয়েরা করেন। ২০১৪ সালে চার হাজার ৬০০ আবেদনের মধ্যে ৭৯ ভাগ নারী আবেদন করেন। আর ২০১৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত দুই হাজার ৮০০ আবেদনের মধ্যে ৮০ ভাগ নারী করেন। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১- সূত্রমতে, ২০১৫ সালে এই এলাকায় মোট ২৫৬টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে নারী আবেদন করেন ১৪৪টি আর পুরুষ করেন ১১২টি। ঢাকা দক্ষিণের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা বেগম শাহিনা খাতুন জানান, ২০১৫ সালে এই অঞ্চলে মোট ৪৪৪টি তালাকের আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে নারী দিয়েছেন ৩১৪টি আর পুরুষ দিয়েছেন ১৩০টি। আর ২০১৬ সালে এই পর্যন্ত মোট ৩৭টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে নারীর পক্ষ থেকে ২৮টি ও পুরুষের পক্ষ থেকে মোট ৯টি আবেদন জমা পড়ে।

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, শিক্ষার কারণে নারী এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। তারা এখন নিজেদের আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক বেশি দায়িত্বশীল। উত্তর সিটি করপোরেশনের সহকারী আইন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিউল আরিফ বলেন, নারীর তালাক দেওয়ার হার পুরুষের চেয়ে অবশ্যই বেশি। পেশাগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। লোকলজ্জা কাটিয়ে সংসারের অশান্তির শিকার না হয়ে তারা এর প্রতিবাদ করছেন। আগের মতো আর আপস করছেন না।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, সাধারণত দুই পক্ষের কাছ থেকে আবেদন পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ তা কার্যকরের আগে দুজনকেই ৯০ দিনের সময় দেন। এ জন্য প্রতি মাসে দুই পক্ষকে শুনানির জন্য ডাকেন। কিন্তু ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই এই শুনানির জন্য কোনো পক্ষ সিটি করপোরেশন অফিসে যান না। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ মোহিত কামাল বলেন, নৈতিক স্খলনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের সমাজে এখন বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে প্রবাসী বাঙালি, যাদের স্ত্রী তাদের থেকে দূরে থাকেন। তাদের ঘিরে এই প্রবাসীদের এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়। একই সঙ্গে বাড়ে সন্দেহ প্রবণতা যা পরবর্তীতে বিবাহবিচ্ছেদে গিয়ে ঠেকে। উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন নির্যাতিত নারীর জন্য তালাকের সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক। একই সঙ্গে আমাদের দেখতে হবে, এর ফলে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে পড়ল কিনা। কারণ এর প্রভাবে তালাক হওয়া দম্পতির সন্তানদের ভবিষ্যতে লালন-পালনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।


আপনার মন্তব্য