Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : রবিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২১ জানুয়ারি, ২০১৭ ২৩:২৭
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর খুলছে কাল
আলী আজম
পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর খুলছে কাল
রাজধানীর রাজারবাগে দৃষ্টিনন্দন পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর —রোহেত রাজীব

স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইন। প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধও রাজারবাগ থেকেই শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের ওই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে স্থাপিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। ইতিমধ্যে জাদুঘরের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। আগামীকাল সোমবার পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনী দিন জাদুঘরটি উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই জাদুঘরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পুলিশের ব্যবহূত সরঞ্জামাদি ও অস্ত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রদর্শিত হবে।

পুলিশ বলছে, দেড় বিঘা জমির ওপর নির্মিত ভবনটির ডিজাইন করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ও প্রখ্যাত স্থপতি মীর আল-আমিন। ইন্টিরিয়রে ছিলেন সৈয়দ হুমায়ুন রশিদ বনি। প্রতিদিন শুভেচ্ছা মূল্যের টিকিটের বিনিময়ে সর্বসাধারণের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত থাকবে। স্থায়ী ভবন নির্মাণ করার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (সংস্থাপন) মো. হাবিবুর রহমান। তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন এআইজি আবিদা সুলতানা। পুলিশ সদর দফতর সূত্র বলছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী একযোগে আক্রমণ করেছিল ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে রাজারবাগেই বাঙালি পুলিশ সদস্যরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একই সঙ্গে পুলিশ সদস্যরা বেতার যন্ত্রের মাধ্যমে ঢাকা আক্রান্ত হওয়ার বার্তা সারা দেশের থানাগুলোতে পাঠিয়ে দেন। জানিয়ে দেন, তারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন।

পুলিশের এই প্রতিরোধ যুদ্ধের খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়। রাজারবাগ আক্রান্ত হওয়ার পরপরই ওয়ারলেস বা বেতারযন্ত্রের অপারেটর মো. শাহজাহান মিয়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজ উদ্যোগে ইংরেজিতে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণের বার্তাটি দেশের সব থানায় পাঠিয়েছিলেন। ২৫ মার্চ তিনি বেতার বার্তায় বলেন, ‘বেইজ ফর অল স্টেশন্স অব ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ, কিপ লিসেন অ্যান্ড ওয়াচ, উই আর অলরেডি অ্যাটাকড বাই পাক আর্মি। ট্রাই টু সেভ ইয়োরসেলভস, ওভার।’

ওইদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে সারা দেশে এই বার্তা ছড়িয়ে দেন। এই জাদুঘরে সেই ঐতিহাসিক অমূল্য বেতারযন্ত্রটি স্থান পেয়েছে। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে প্রতিরোধ গড়ে প্রাণ হারান শতাধিক পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা। জাদুঘরে স্থান পাবে সেই পাগলা ঘণ্টা, যা বাজিয়ে সেই রাতে পুলিশ সদস্যদের একত্রিত করছিলেন কনস্টেবল আবদুল আলি। এ ছাড়াও থাকবে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহূত রাইফেল, বন্দুক, মর্টারশেল, হাতব্যাগ, টুপি, চশমা, মানিব্যাগ ও ইউনিফর্ম। দেয়ালজুড়ে থাকবে মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের যুদ্ধের সময়ের ডায়েরি, হাতে লেখা বিভিন্ন বার্তা, বিভিন্ন ধরনের আলোকচিত্র এবং পোস্টার।

পুলিশ সদর দফতর সূত্র বলছে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ১৪ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ১০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য। ওই সময়ে শহীদদের মধ্যে একজন ডিআইজি, চারজন পুলিশ সুপারসহ ৭৫১ জনের নাম পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন রাজশাহীর তত্কালীন ডিআইজি শহীদ মামুন মাহমুদ, রাজশাহীর পুলিশ সুপার শহীদ শাহ আবদুল মজিদ, কুমিল্লার পুলিশ সুপার শহীদ কবির উদ্দিন আহমেদ, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার শহীদ এম শামসুল হক, পিরোজপুর মহাকুমা পুলিশ কর্মকর্তা (এসডিপিও) এবং কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও ডক্টর জাফর ইকবালের বাবা ফয়েজুর রহমান আহমেদ প্রমুখ।

পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রধান উদ্যোক্তা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (সংস্থাপন) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশের অবদান অনেক। এ অবদান ও স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য আগেই জাদুঘর করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর নানা সীমাবদ্ধতায় তা গড়ে তোলা হয়নি। অনেক পরে হলেও আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছি।

বর্তমান আইজিপি ২০০৯ সালে ডিএমপি কমিশনার থাকাকালে ডিসি (প্রশাসন) ছিলেন হাবিবুর রহমান। তখনই তত্কালীন ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে পরামর্শ করে জাদুঘর স্থাপনের পরিকল্পনা করেন। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ সদস্যদের ব্যবহূত বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ, বন্দুকসহ নানা দুষ্প্রাপ্য সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে থাকেন, যা প্রথমে রাজারবাগ টেলিকম ভবনের একটি কক্ষে সংরক্ষণ করা হয়। ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ টেলিকমভবনে প্রথম জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়।

পরবর্তীতে দেড় বিঘা জমির ওপর নতুন একটি ভবনে জাদুঘরটি স্থানান্তর করা হয়েছে। জাদুঘরটি আগামী মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর মাসে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এবং অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত শনি থেকে বৃহস্পতিবার খোলা থাকবে। শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বুধবার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে। বিশেষ দিবস ব্যতীত সরকারি ছুটির দিনে জাদুঘর বন্ধ থাকবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের অবদান নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ওই সময় তারা একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। সেটি করতে গিয়ে শহীদ পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্মারক সংগ্রহ করা হয়। রাজারবাগে ২৫ মার্চ যেসব পুলিশ সদস্যরা প্রতিরোধ তৈরি করেছিল তাদের সঙ্গে বিশদ আলোচনা হয়। এরপর রাজারবাগ পুলিশ লাইনের টেলিকম ভবনে প্রাথমিকভাবে সংগ্রহগুলো সংরক্ষণ করা হয়। এতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যরাও সহায়তা করেছেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশ যে অকুতোভয় ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছে তার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১১ সালে বাংলাদেশ পুলিশ ‘স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১১’ লাভ করে। ২০১৫ সালের ১০ মার্চ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের স্থায়ী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করবেন। জাদুঘরে পুলিশ সৃষ্টি থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিবর্তনের ইতিহাস স্থান পাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে স্থাপিত স্মৃতিসৌধের পাশে জাদুঘরটির স্থায়ী ভবন নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। নতুন ভবনের বেইজমেন্টে পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের সব ধরনের স্মৃতি সংরক্ষণ থাকছে। এ ছাড়া গ্রাউন্ড ফ্লোরে থাকছে বঙ্গবন্ধু গ্যালারি। যেখানে বঙ্গবন্ধুর দুর্লভ ১৫টি ছবি থাকবে। থাকবে ভার্চুয়াল লাইব্রেরি এবং স্যুভেনির। ভবনের ওপরে থাকছে বাংলাদেশের লাল-সুবজ পতাকা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাতে প্রথম পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে থ্রিনটথ্রি রাইফেল দিয়ে পুলিশের অকুতোভয় সদস্যরা যেস্থান থেকে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন যেখানে প্রথম রক্ত ঝরেছিল সেই রক্তাক্ত ভূমিতে জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি অত্যাধুনিক, সুদৃশ্য ও নান্দনিক অবয়বে নির্মিত হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে আবেদন জানিয়ে বলা হয়েছে— বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, পুলিশ সদস্যসহ দেশের সব নাগরিকের কাছে মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের ভূমিকাসংশ্লিষ্ট কোনো দলিলপত্র, সরঞ্জাম, আসবাবপত্র, স্মারক, চিঠিপত্র, ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার্য সামগ্রী, অস্ত্র বা গোলাবারুদের অংশ, ডায়েরি, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি, স্মৃতিস্মারক, পুলিশ মুক্তিযোদ্ধা সম্পর্কিত অপর কোনো তথ্য ইত্যাদি থাকলে তা পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য দিতে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে স্মারকদাতার নাম ‘বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’-এ যথাযোগ্য মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হবে।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow