শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:৩১

রোহিঙ্গা নিয়ে যত বাণিজ্য

সরকারি বনভূমির ভাড়া নিচ্ছে প্রভাবশালীরা, হোটেল ও অন্যান্য আবাসন ব্যবসাও রমরমা

ফারুক তাহের, চট্টগ্রাম

রোহিঙ্গা নিয়ে যত বাণিজ্য

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে উখিয়া-টেকনাফের সরকারি বনভূমিতে ঘর তুলে ভাড়া দেওয়া এখন প্রভাবশালীদের নিয়মিত বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা নিজেরাই মাথা গোঁজার জন্য ঘর তুলে নিলেও জায়গার জন্য এককালীন হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বড় অংকের টাকা। বিদেশি এনজিওর পক্ষ থেকে পাহাড়ি বনভূমি দখল করে রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা-কর্মীরা। আবার স্থানীয়রা নিজেদের বাড়ির অংশ কিংবা আঙিনায় নতুন ঘর তুলে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকে ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে আদায় করছে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া ও মোটা অংকের জামানত। একইভাবে কক্সবাজার শহরের উপকণ্ঠে এবং উখিয়া-টেকনাফের হোটেলগুলোতে গত এক বছর ধরে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। রমরমা ব্যবসা করে যাচ্ছেন হোটেল মালিকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুসলিম এইড নামের একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) পক্ষে স্থানীয় মুফিজ আলম ও তার ভাই মোহাম্মদ আলম লেদা ক্যাম্পের পাশে সরকারি বনভূমিতে শেড নির্মাণ করে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দিয়েছে। এসব শেডের প্রতিটি কক্ষ মাসে ৪-৫শ টাকা করে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়। এছাড়া উখিয়া এবং টেকনাফের ৩০টি ক্যাম্পের অধিকাংশ রোহিঙ্গা পরিবারকে প্রতি মাসে ভাড়া গুনতে হয়। এই ভাড়া আদায়ের জন্য গড়ে ওঠেছে কয়েকটি সিন্ডিকেট। যেখানে সরকারদলীয় নেতা-কর্মীর পাশাপাশি বিএনপি এবং জামায়াতের প্রভাবশালীরাও রয়েছে বলে জানা গেছে।  সরকারি বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের জন্য শেড নির্মাণ প্রসঙ্গে টেকনাফের সহকারী বন সংরক্ষক সরওয়ার আলম বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনেক অবৈধ শেড আমরা উচ্ছেদ করেছি। অনেকে অবৈধভাবে ভাড়া আদায় করছে বলে আমরা জেনেছি। এসব বন্ধ করতে আমরা শিগগিরই অভিযানে নামব।’ এদিকে টেকনাফের সাগরপারের ইউনিয়ন বাহারছড়ায়ও বেশকিছু বস্তি তৈরি করে রোহিঙ্গাদের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নের শামলাপুর বাজার এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। শামলাপুর বাজারের আশপাশে অর্ধলক্ষাধিক রোহিঙ্গার বসবাস রয়েছে। বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা আজিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বস্তির ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। টেকনাফ উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের কর্মীরা এই ইউপি চেয়ারম্যানের এরকম বেশকিছু বস্তি উচ্ছেদ করে দিয়েছে। এদিকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি আবাসন বাণিজ্য চলছে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী এলাকায়। কুতুপালং এলাকায় বন বিভাগের কয়েকশ একর জমিতে রয়েছে রোহিঙ্গা শিবির। এই শিবিরে রয়েছে কমপক্ষে ৬০ হাজার অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা। কুতুপালং অনিবন্ধিত শিবিরটি নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মৌলভী বখতিয়ার আহমদ। তিনি রোহিঙ্গা শিবিরকে পুঁজি করে তৈরি করেছেন বিশাল মার্কেট। এখানে রয়েছে কয়েকশ দোকান। শিবিরে রোহিঙ্গাদের যে কোনো শালিস-বিচারও সম্পন্ন করেন তিনি। এর বাইরে কুতুপালং অনিবন্ধিত ক্যাম্পের গহিন বনভূমিতে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক ভাড়া আদায় করে একটি সিন্ডিকেট। মৌলভী বখতিয়ার বলেন, ‘আমার নিজের জায়গায়ই দোকান নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছি। এগুলো কোনো অবৈধ জায়গা নয়। দোকানে স্থানীয়দের সঙ্গে রোহিঙ্গারাও কেনাবেচা করে। আমার বিরুদ্ধে অনেকেই মিথ্যা অপবাদ দেয়, যেগুলো ভিত্তিহীন।’  এদিকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি এনজিওগুলো নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য প্রজেক্ট অফিস করতে গিয়ে ভাড়া ও জামানত হিসেবে বিপুল অংকের টাকা গুনতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা সুযোগ পেয়ে নিজেদের অব্যবহূত জায়গা ও ঘর ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা আদায় করছে। যে ঘর বা বাসার মাসিক ভাড়া ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা, সে একই ঘর বা বাসার ভাড়া এখন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে।


আপনার মন্তব্য