শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২৩:৩৪

আদালতের রায় বাংলায় লিখুন

অমর একুশে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

আদালতের রায় বাংলায় লিখুন

আদালতের রায় বাংলায় লিখতে বিচারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আমি বলব আদালতের রায়টা যদি কেউ ইংরেজিতেও লিখতে চান, লিখতে পারেন। কিন্তু একটা শর্ত থাকবে, এটা বাংলা ভাষাতেও প্রকাশ করতে হবে। এতে যিনি রায় পাবেন, তিনি পড়ে জানতে পারবেন, কী রায় তিনি পেলেন। না হলে অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকতে হয়। এতে হয়রানির শিকার হতে হয় ভুক্তভোগীকে।’ গতকাল বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অমর একুশে শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। বক্তব্যের শুরুতেই চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে মৃত্যুর ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, রাতে খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আহতদের তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা নিহত হয়েছেন, আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে অশ্রুসিক্ত দেখা যায়।

আদালতে বাংলা ভাষায় রায় লেখা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের যারা আদালতে আছেন, তারা যদি মাতৃভাষায় লেখার অভ্যাসটা করেন, এতে স্বল্পশিক্ষিত মানুষের সুবিধা হবে। তারা রায় পড়ে বুঝতে পারবেন যে এখানে বিচারক কী লিখেছেন, কী বলতে চেয়েছেন। অন্যথায় আইনজীবীর ওপর নির্ভরশীল থাকতে হবে।’ তিনি বলেন, আর ইংরেজিও রোমান স্টাইলে না লিখে একটু সহজ ইংরেজিতে লেখা উচিত। মাতৃভাষা ভালোভাবে শেখা ও চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা, মাতৃভাষা জানা, এটা অপরিহার্য। আজকে বিশ্ব গ্লোবাল ভিলেজ। আমাদের যোগাযোগটা, ভাষাগতভাবে যোগাযোগটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর সব দেশে কিন্তু নিজের ভাষা শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে একটা দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা নেয়। কাজেই দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে অন্য ভাষা শিক্ষার সুযোগ কিন্তু আমাদের দেশে আছে।’

তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে নয়টি ভাষা দিয়ে একটি অ্যাপস তৈরি করে দিয়েছি আমরা। এখন বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে দেশকে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইংরেজি একটা মাধ্যম হয়ে গেছে সারা বিশ্বে। কাজেই আমাদের দেশে এটা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শেখা যেতে পারে। বাংলা ভাষা মাতৃভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি, সেই ভাষাটাও সবাই যাতে ভালোভাবে রপ্ত করতে পারে সেই ব্যবস্থাটাও করা একান্তভাবে প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।’ শুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে একেক অঞ্চলে একেক ধরনের কথা বলি। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা অফিসিয়াল একটা ভাষা ব্যবহার করি, যে ভাষাটা প্রমিত বাংলা। এটি ইতিমধ্যে আমাদের বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে। সে জন্য বাংলা একাডেমিকেও ধন্যবাদ জানাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করি, সেটিকে একেবারে বাদ দেওয়া ঠিক নয়। বাদ দিলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বই থাকে না।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদিন (২১ ফেব্রুয়ারি) আমরা আমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জন করেছিলাম। আর এ সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে, যখন আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছিল। আমরা বাঙালি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। কিন্তু সেই বাংলায় আমাদের কথা বলতে না দিয়ে বাংলা ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার একটা চক্রান্ত শুরু হয়েছিল।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র হয়, যার দুটি অংশ। চারটি প্রদেশ। চার প্রদেশে চার ধরনের ভাষা। আর উর্দুকে একটা কমন ভাষা হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আসলে তারা উর্দুকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। আমরা যারা এই ভূখন্ডে বাস করতাম, আমাদের ভাষা কেড়ে নিয়ে একটা বিজাতীয় ভাষা ছড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করা হয়। আর সেই চক্রান্তের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালে আন্দোলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ।’

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। তিনি প্রথম এফএইচ হলে একটা সভা ডাকেন। যেখানে তমুদ্দুন মজলিস, ছাত্রলীগসহ আরও অনেক সংগঠন নিয়ে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলেছিলেন তিনি। সেই সময় ১১ মার্চ আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হয়। সারা দেশেই ধর্মঘট আহ্বান করা হয়।’ পরে ভাষা আন্দোলনে জাতির জনকের ভূমিকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা সে সময়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়। এ সময় ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখার সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে ভারতের ভাষাবিজ্ঞানী গণেশ দেবী বলেন, ভাষার বৈচিত্র্য একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলে, তাই সব জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ করতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সভাপতিত্বে এতে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বক্তৃতা করেন।


আপনার মন্তব্য