Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৭ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ জুলাই, ২০১৯ ২৩:৪৭

রোগের নাম ফেসবুক

মির্জা মেহেদী তমাল

রোগের নাম ফেসবুক

সামসুল আরেফীন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। বেশ কিছুদিন ধরে তিনি মানসিক অশান্তিতে ভুগছেন। কারণটি হলো তার বড় মেয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্রীর আচরণ নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত। ইদানীং ঘুমের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস মিস করছে সে। দুপুর বা কখনো কখনো বিকালেও ঘুম থেকে উঠছে সে। ওই সময় পর্যন্ত তার ফোনও বন্ধ থাকছে। বাসার লোকজন তাকে ঘুম থেকে তুলতেও পারে না। দরজায় নক করলেও ভিতর থেকে সে চিৎকার করে বলতে থাকে, এখন যেন তাকে কেউ ডিস্টার্ব না করে, ঘুমাচ্ছি। সামসুল আরেফীন তার মেয়ের এই বদলে যাওয়া আচরণের বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন তার স্ত্রীর কাছে। সে সময়ে তিনি বিষয়টা আমলে নেননি। কিন্তু একটা সময় এসে তিনি নিজেই বুঝতে পারেন বিষয়টি। যখন তার মেয়েকে বেশ কিছুদিন দুপুর বা বিকালের আগে ফোন করেও পাচ্ছিলেন না। পরে বিকালে মেয়েটি তাকে ফোন করে জানায়, সে ঘুমুচ্ছিল। তাই ফোন বন্ধ রেখেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়েও সে যায়নি। তার ঘুম ভাঙেনি। সামসুল আরেফীন এ নিয়ে তার মেয়ের এক বন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। সেই বন্ধুর কাছ থেকেই তিনি জানতে পারলেন মেয়ের পাল্টে যাওয়ার নেপথ্য কথা। সামসুল আরেফীন জানতে পারে, তার মেয়ে সারা রাত সামাজিক যোগাযোগ করে সারা দিন ঘুমায়। এই রুটিনেই চলছে কয়েক মাস হলো। নিয়মিত ক্লাসেও যাচ্ছে না। এমনকি পরীক্ষা বাদ পড়ছে। লেখাপড়ায় পিছিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারছে না। মেজাজ খিটখিটে হয়েছে। মেয়েটির বন্ধুর কাছেই জানতে পারে সামসুল আরেফীন। সেই বন্ধুটি তাকে বলেছে, সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হলেও ইদানীং তার সঙ্গেও নাকি খারাপ মেজাজ দেখায় মেয়েটি।’ সামসুল আরেফীন তার মেয়ের সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেন। মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুঁদ হয়ে থাকা মেয়েটি তার বাবাকে বলেছে, ‘আমি বুঝতে পারছি বিষয়টি নেশার মতো হয়ে গেছে। ছাড়তে পারছি না। আমি পিছিয়ে পড়ছি। আমার এখন পড়ার কথা ছিল চতুর্থ বর্ষে।’

সামসুল আরেফীন তার মেয়ের এ অবস্থায় কথা বলেন একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে। চিকিৎসক বলেছেন, তার মেয়ে ফেসবুক রোগে আক্রান্ত। যা নেশার চেয়েও ভয়ঙ্কর। যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষক জার্মানির একটি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১ জন শিক্ষার্থীর ফেসবুক ব্যবহারের ওপর গবেষণা করেছেন। তারা সবাই ফেসবুকে প্রচুর সময় কাটান। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিমাত্রায় বিচরণ মাদকাসক্তির মতোই খারাপ। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত জার্নাল অব বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশন সাময়িকীতে গবেষণাটি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন বেরিয়েছে। গবেষকরা লিখেছেন, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করেন, ভুল বা বাজে সিদ্ধান্ত নেন। তারা দেখেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বেশি নেন।

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ দুটি আসক্তির মধ্যে অনেক সাদৃশ্য আছে। বেশ কিছুদিন হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত ছেলেমেয়েদের নিয়েও অভিভাবকেরা নিয়মিত তাদের ব্যক্তিগত চেম্বারে যাচ্ছেন। তারা বলেন, এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসক্তিকে মানসিক রোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মনোরোগ চিকিৎসকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়ার্ল্ড সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসোসিয়েশন যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তিকে রোগ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য একটি খসড়া নীতিমালাও তৈরি করেছে। গবেষকেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়মিত ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। ইন্টারনেটের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন নতুন নতুন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকছে। ২০১৬ সালে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ বলেছিল, একজন ব্যবহারকারী দৈনিক গড়ে ৫০ মিনিট সময় ফেসবুকে কাটায়। এই গবেষকেরা যে শিক্ষার্থীদের বেছে নিয়েছিলেন, তারা মানসিকভাবে ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এ নির্ভরশীলতা আসক্তির সমতুল্য। প্রাথমিকভাবে গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ফেসবুক ব্যবহার করতে না পারলে তাদের কেমন লাগে, তারা কখনো এ অভ্যাস ছাড়তে চেয়েছেন কি না এবং তাদের কাজ বা পড়াশোনার ওপর অভ্যাসটি কি প্রভাব ফেলেছে। গবেষণার শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিচারের জন্য আইওয়া গ্যামব্লিং টাস্ক নামে পরিচিত একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রতিটি দানের হারজিত বিচার করে ভালো তাস বেছে নিতে হয়। মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া বোঝার জন্য এটি একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। গবেষকেরা দেখেছেন, ফেসবুকে সবচেয়ে আসক্ত শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে খারাপ তাস বেছে নিয়েছিলেন। ফেসবুকে তুলনামূলকভাবে কম যুক্ত শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত ভালো তাস বাছেন।

সাধারণভাবে এ পরীক্ষায় কোকেন, গাঁজা বা অন্য কোনো মাদকে আসক্ত ব্যক্তিকেও একই ধারার ক্ষতিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের এ গবেষকেরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুফল ব্যাপক। কিন্তু এর খারাপ দিকটি হচ্ছে, এতে আসক্তির ঝুঁকি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে ৯ কোটির বেশি ইন্টারনেট সংযোগ আছে। আর সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের হিসাবে, দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে প্রায় ৩ কোটি মানুষ। ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আসক্তির আশঙ্কাও বাড়ছে। মোহিত কামাল বলেন, অনেক কিশোর ও তরুণ সামাজিক যোগাযোগে ব্যতিব্যস্ত থেকে দিনের একটা বড় সময় নষ্ট করছে। অনেকেরই এটা বদ অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। এতে পড়াশোনা আর রোজকার কাজের ক্ষতি হচ্ছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, ফেসবুক বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ফেসবুক বন্ধ করার চেষ্টা করা হলে সমস্যা কমবে না বরং বাড়বে। তার চেয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাটি করা যেতে পারে ভিতর থেকে, সমস্যার মূল থেকে। আমাদের চিন্তা চেতনা আর অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে। নচেৎ অদূর ভবিষ্যতে হয়তো রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘ফেসবুক রোগ বিশেষজ্ঞ’ টাইপ ডাক্তারের সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যাবে। তিনি বলেন, ‘অল্প বয়সীরা যদি বাস্তবজীবনে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বা খেলাধুলার নির্মল পরিবেশ পায়, তাহলে মুঠোফোন ও ল্যাপটপের আসক্তি তাদের হবে না। সেই পরিবেশ তাদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে।’


আপনার মন্তব্য