শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:৪৯

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে রাজপথে বিরোধীরা

মাহমুদ আজহার

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ে রাজপথে বিরোধীরা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আন্দোলন কর্মসূচির মাধ্যমেই ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে বিএনপি। এক বছর ধরে ‘নিশ্চুপ’ থাকা এ দলটি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি নিয়ে আবারো রাজপথে ‘সরব’ হওয়ার চিন্তা করছে। বেগম জিয়ার জামিন ইস্যুতে ‘আপাতত’ বিক্ষোভ আর প্রতিবাদ সমাবেশেই থাকবে বিএনপি। তবে চূড়ান্তভাবে তার জামিন না হলে রাজপথে পর্যায়ক্রমে কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। ধীরে ধীরে ‘সরকার পতনে একদফা আন্দোলন’ কর্মসূচিতে যাওয়ার কথাও ভাবছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির সংশ্লিষ্ট সূত্রে  এ তথ্য জানা গেছে। জানা যায়, সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে স্কাইপিতে বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে আগামী বৃহস্পতিবার জামিন শুনানি পর্যন্ত অপেক্ষার সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া চলতি সপ্তাহে বিক্ষোভ কর্মসূচিও দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সবাই একমত হন। কোনো কারণে বেগম জিয়ার জামিন না হলে রাজপথে নেমে সরকারকে বড় ধরনের ‘ধাক্কা’ দেওয়া হবে। আন্দোলন কর্মসূচি ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি মিলবে না তা স্পষ্ট হয়েছে। এ জন্য নেতা-কর্মীদের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকতে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে ডিসেম্বরের ২৮ থেকে ৩০ ডিসেম্বরের মধ্যে রাজপথে বড় ধরনের শোডাউনের বিষয়টিও ভাবছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা বলেন, বিষয়টি রাজনৈতিক। তাই শুধু আইনি প্রক্রিয়ায়  খালেদা জিয়ার মুক্তি যে সম্ভব নয়, তা এরই মধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। কারণ, আইনি প্রক্রিয়ায় যা যা করা সম্ভব- তাদের আইনজীবীরা গত ২১ মাসে তার সব কিছুই করেছেন। এখন সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া শিগগিরই বেগম জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। সরকারকে ‘চাপ’ দিতে হলে রাজপথেই নামতে হবে। আন্দোলন কর্মসূচি ছাড়া বেগম জিয়ার মুক্তি মিলবে না। এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতিতে গোটা জাতি আজ উদ্বিগ্ন। অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসার জন্য তার মুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন। তার সুচিকিৎসা না হলে যে কোনো সময় চরম দুঃখজনক ঘটনাও ঘটতে পারে। গণতন্ত্রের নেত্রীর কিছু হলে সব দায়-দায়িত্ব এই অনির্বাচিত সরকারকেই নিতে হবে। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল হিসেবে বিএনপিও ঘরে বসে থাকবে না। আমাদেরও দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। রাজপথে আন্দোলন কর্মসূচিতে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথই সামনে খোলা নেই।’

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, বেগম জিয়ার জামিনে মুক্তি ইস্যুতে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করতেও আগ্রহ ছিল বিএনপির। দলের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন সভা-সমাবেশেও বক্তৃতা-বিবৃতিতে সরকারকে আকারে ইঙ্গিতে এ কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের অনাগ্রহের কারণে বিএনপির চেষ্টায় ভাটা পড়ে। বিএনপির তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ধারণা ছিল, বিএনপির গুটি কয়েক নেতা সংসদে যাওয়ার পর এ ইস্যুতে সংলাপ-সমঝোতার বরফ গলবে। কিন্তু তাতে কিছুই হয়নি। তবে বিএনপির এক প্রভাবশালী নেতা জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বেগম জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়া নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছিল। সেই ইঙ্গিতের কারণেই বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা সংসদে যান। দলের সিনিয়র নেতাদের বড় একটি অংশও তাই চেয়েছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া প্যারোলে মুক্তি চান না। তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া দলের সিনিয়র নেতা ও পরিবারের সদস্যদের কাছে এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন। এরপর থেকে সরকার আরও কঠোরতার দিকে যায়। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার-এ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা ও স্বৈরাচারের পতন ঘটানো। এ জন্য প্রয়োজন জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের নেত্রী  বেগম খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা। এখানে  নৈরাজ্য সৃষ্টি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা সুস্পষ্ট ইস্যু নিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি পালন করতে চাই। আমরা ইতিপূর্বে অনেক কর্মসূচি করেছি। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেছি। সরকার যদি সেখানে কোনো রকমের প্ররোচনা বা সাবোট্যাজ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে তার দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তাবে।’

সূত্রে জানা যায়, অগোছালো দল নিয়েই বিএনপি এখন রাজপথের আন্দোলনের কথা চিন্তাভাবনা করছে। আপাতত দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের চিন্তাও নেই বিএনপিতে। অঙ্গ সংগঠনগুলোকে এরই মধ্যে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে, কয়েক দফা সময় নিয়েও কমিটি দিতে ব্যর্থ হলে নতুন করে ওইসব অঙ্গ সংগঠন ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে সংশ্লিষ্ট অঙ্গ-সংগঠনগুলোকে নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি দেওয়া হবে। বিশেষ করে বিএনপির রাজপথের হাতিয়ার বলে খ্যাত, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের প্রতি এই বার্তা দেওয়া হয়েছে। দলের সিনিয়র নেতাদের অভিযোগ, বিএনপির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতারা এখন ব্যস্ত কমিটি নিয়ে। বেগম জিয়ার মুক্তির চেয়ে কমিটিতে পদ-পদবি পাওয়া নিয়েই তারা বেশি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের দৃষ্টি কমিটির দিকে। কবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে সেদিকেই তাকিয়ে আছেন তারা। যুবদলের কমিটি হচ্ছে-হবে করতে করতে ৫ সদস্যের কমিটিতেই মেয়াদ প্রায় শেষ করে ফেলেছেন। তাদের কয়েক দফা সময় বেঁধে দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তাতেও কাজ হচ্ছে না। আংশিক কমিটি দিয়ে এরই মধ্যে মেয়াদ শেষ করেছে স্বেচ্ছাসেবক দল। ছাত্রদলের দুই সদস্যের কমিটি দিয়েই চলছে মাসের পর মাস। তাদের আরও অভিযোগ, আগে কোথাও সভা-সমাবেশে সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা হতো অঙ্গ-সংগঠন বা মাঠপর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে। এখন মামলা হচ্ছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে। কার্যত, অঙ্গ-সংগঠনগুলো নিষ্ক্রিয় থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি শুধু সিনিয়র নেতাদের দিকে। তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, তারা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর ক্ষুব্ধ। প্রায় দুই বছর ধরে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়া। তার জন্য একটি হরতাল কর্মসূচি দিতেও ব্যর্থ হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। শুরুর দিকে কয়েকটি প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন বা প্রতীকী অনশনের ডাক দিলেও এখন মাঠে কোনো কর্মসূচি নেই। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য, কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান, গুটি কয়েক উপদেষ্টা, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, দুই-তিনজন যুগ্ম মহাসচিব ও কয়েকজন সাংগঠনিক-সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকলেও নিষ্ক্রিয় ৫০২ সদস্যের ঢাউস কমিটির প্রায় সবাই। তাছাড়া জেলা পর্যায়ের নেতাদের বড় অংশই থাকেন ঢাকায়। অনেকেই সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা করে চলেন। কেন্দ্রীয় নিষ্ক্রিয় নেতাদের সরিয়ে দেওয়ার দাবিও তৃণমূলের। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, ‘জনগণ এই সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। এখন দেশের মানুষ আন্দোলন চায়, কর্মসূচি আমরা দেব এবং সেই কর্মসূচি সময়মতো উপযুক্ত সময় দেব। আমরা এমন কর্মসূচি দেব যাতে, বাংলাদেশের মাটিতে গণবিস্ফোরণ ঘটে। দেশের মানুষ বেগম জিয়াকে মুক্ত করে আনবে। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে, আইনের শাসন ফিরে আসবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরে আসবে এবং দেশের মানুষ আবার স্বস্তি ফিরে পাবে।’


আপনার মন্তব্য

close