শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩৫

পানিশূন্য তিস্তা, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন

নদীর কান্না

রেজাউল করিম মানিক, লালমনিরহাট

পানিশূন্য তিস্তা, জীববৈচিত্র্য বিপন্ন
এক সময়ের খরস্রোতা তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর -বাংলাদেশ প্রতিদিন

করালগ্রাসী প্রমত্তা তিস্তা বর্ষায় ফুলে-ফেঁপে দু’কূল ভাসিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। এ নদীর হিংস্র থাবায় ভেঙে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও স্থাপনা। সেই তিস্তা নদী এখন শুকিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। খেয়াপারে বা মাছ ধরতে বর্ষায় নৌকা নিয়ে ছুটে চলা মাঝি-মাল্লাদের দৌড়ঝাঁপ নেই। পানি আর মাছে পূর্ণ তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে শুধুই বালুচর। মাছ ধরতে না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নদীর দুপাড়ের কয়েক হাজার জেলেপরিবার। বিপন্ন হতে বসেছে তিস্তার বুকে বাস করা নানা জীববৈচিত্র্য। নৌকা নয়, পায়ে হেঁটেই তিস্তা পাড়ি দিচ্ছে মানুষজন। তিস্তাপাড়ে শুধু চলছে হাহাকার। কৃষক, জেলে থেকে শুরু করে তিস্তার সুবিধাভোগী লাখো মানুষের কান্নায় তিস্তাপাড়ের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। রংপুর আঞ্চলিক মৎস্য অফিস সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ অংশে তিস্তার বুকজুড়ে বাস করত ৫৬ প্রজাতির মাছ। পানি না থাকায় আজ সেগুলো বিলুপ্তির পথে। আর বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অফিসের সূত্রমতে, তিস্তায় বাস করা ৭৯ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের অধিকাংশই এখন বিপন্ন। শুধু তিস্তায় নয়, অন্যান্য নদীতেও পানি সংকটের কারণে রংপুর অঞ্চল ধীরে ধীরে মরুময় হয়ে যাচ্ছে বলে অভিমত পোষণ করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলসের পরিচালক নদী বিশেষজ্ঞ ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, তিস্তাসহ অন্যান্য নদী এখন শুধুই ইতিহাস। আগামী প্রজন্ম জানবেই না নদী নামের শব্দটি। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিচুক্তি করা না গেলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে সব নদী, নিশ্চিত মরুময় হবে এ অঞ্চল। তিনি বলেন, ভারতের অংশে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি থাকা সত্ত্বেও ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে বাংলাদেশ অংশে তিস্তা মরতে বসেছে। এটি ভারতের স্পষ্টত আন্তর্জাতিক নদী আইনের লঙ্ঘন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভিতর দিয়ে বাংলাদেশ পানি পেতে ব্যর্থ হলে আইনি লড়াইয়ে গিয়ে হলেও তিস্তায় অভিন্ন অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর নীলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ঐতিহাসিক তিস্তা নদী। লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশেছে। ভারতের চেয়ে নদীটি বাংলাদেশে পড়েছে বেশি অংশ। তিস্তার দৈর্ঘ্য ৩১৫ কিলোমিটার হলেও বাংলাদেশ অংশে পড়েছে ১৬৫ কিলোমিটার। ভারতের গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে সেই দেশের সরকার একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণ করায় এ নদী মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ফলে লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী জেলার ১৬৫ কিলোমিটার তিস্তার অববাহিকায় জীবনযাত্রা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার তিস্তা ব্যারাজ অকার্যকর হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তিস্তা রেলসেতু, তিস্তা সড়কসেতু ও নির্মাণাধীন দ্বিতীয় তিস্তা সড়কসেতু দাঁড়িয়ে রয়েছে ধুঁ ধু বালুচরের ওপর। সেতু থাকলেও পায়ে হেঁটেই পার হচ্ছে এ নদী অনেকে। ঢেউহীন তিস্তায় রয়েছে শুধুই বালুকণা। এ নদীতে মাছ আহরণ করে শুঁটকি ও মাছ বিক্রি করে জীবনযাপন করতেন এ অঞ্চলের হাজারো জেলে। তারাও আজ কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ ছাড়া মাঝি-মাল্লারাও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। হারিয়ে গেছে তিস্তার বুকে বাস করা নানা বৈচিত্র্যময় প্রাণী।

পানি না থাকায় তিস্তার সুবিধাভোগী জেলে ও মাঝি-মাল্লাদের কষ্টের কথা স্বীকার করে রংপুর বিভাগীয়  পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতিপ্রসাদ ঘোষ জানালেন, যতটুকু পানি আছে, সে পানিটুকু ব্যারাজের মাধ্যমে ক্যানেলে নেওয়ার পর তিস্তার বুকজুড়ে বালুচর সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দুপাড়ের এই তিস্তাকে পুঁজি করে জীবিকা নির্বাহ করত, তাদের  কষ্ট পৌঁছেছে চরমে।


আপনার মন্তব্য