শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৪

অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে শঙ্কা বাড়ছে

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে কমেছে শাক-সবজি রপ্তানি, আটকে গেছে ১৫০ কনটেইনার চামড়ার পণ্য, ৩ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা

রুকনুজ্জামান অঞ্জন

অপ্রচলিত রপ্তানি খাতে শঙ্কা বাড়ছে

করোনাভাইরাস চীন থেকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে যাওয়ায় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে সংশ্লিষ্ট মহলে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানি বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রপ্তানি গন্তব্য জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সে করোনাভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় দেশের ছোট ছোট রপ্তানি খাত ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এ অবস্থায় সরকারের কাছে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তুলে ধরে নিজ নিজ খাতে প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুবিধা দাবি করছেন রপ্তানিকারকরা।

করোনার কারণে অপ্রচলিত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে নগদ প্রণোদনার বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগেও যে কোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর সরকার উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিতে করোনার  নেতিবাচক প্রভাবও গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, যদি সুনির্দিষ্ট কোনো খাতের সহায়তার দরকার পড়ে, সেটি দিতে কার্পণ্য করবে না সরকার। এ জন্য দেশের কোন কোন খাতে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে সে তথ্যও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের ক্ষতিকর প্রভাব এখন শুধু একটি বা দুটি দেশে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বেশির ভাগ দেশেই এ ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে অন্য দেশগুলো তাদের শিল্প খাত রক্ষায় কী উদ্যোগ নেয়, সেটিও দেখতে হবে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশের শিল্প খাতে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। সূত্রগুলো জানায়, করোনার প্রভাব বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ায় কয়েক দিন ধরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেছে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প খাতগুলো। ১ মার্চ বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন এক চিঠিতে জানিয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে তাদের ১৫০ কনটেইনার চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আটকে গেছে। এতে তাৎক্ষণিক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে প্রায় ২৪০ কোটি টাকা। চীনের পর ইউরোপে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ফলে নতুন করে কোনো ক্রয়াদেশ পাচ্ছেন না তারা। এ অবস্থা চলমান থাকলে শুধু চামড়া খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে বলে আশঙ্কা করেছে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ জানান, যদি করোনাভাইরাসের চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে চামড়া খাত বড় রকমের ঝুঁকিতে পড়বে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য চামড়া রপ্তানির বিকল্প বাজার খুঁজে বের করা দরকার। চিঠিতে সহজ শর্তে ঋণ ও প্রণোদনারও দাবি জানান বিটিএর চেয়ারম্যান।

শাক-সবজি ও ফলমূল রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাউড প্রোডাক্টস এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সচিব সফিক উল্লাহ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে জানিয়েছেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রথম দিকে এমিরেটসের ফ্লাইট সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় তাদের রপ্তানি কমেছে। চিঠিতে বলা হয়, ইতালিতে বাংলাদেশ থেকে দৈনিক পাঁচ থেকে সাত টন মরিচ রপ্তানি হলেও এখন সেটি তিন টনে নেমে এসেছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ টন সবজি ও ফলমূল রপ্তানি হয়ে থাকে। সেটি কমে ৩০-৩৫ টনে নেমে এসেছে। শুধু চামড়া বা সবজি নয়, এরই মধ্যে বিপর্যয়ে পড়েছে দেশের আরেক অপ্রচলিত পণ্য কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানি খাত। ক্ষতির আশঙ্কা করছেন হালকা প্রকৌশলী, হিমায়িত মাছ, প্লাস্টিক, আইসিটি, হারবালসহ অন্যান্য অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানিকারকরাও। করোনার ক্ষয়ক্ষতি জানতে এসব অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানিকারকদের নিয়ে সম্প্রতি একটি সভা করেছে বাংলাদেশ বিজনেস প্রমোশন কাউন্সিল (বিপিসি)। সভার কার্যবিবরণীতে সংশ্লিষ্ট খাতের রপ্তানিকারকদের উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কাঁকড়া ও কুঁচে রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ লাইভ অ্যান্ড চিল্ড ফুড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান গাজী আবুল কাসেম সভায় বলেন, তাদের পণ্যের ৯০ শতাংশ রপ্তানি হয় চীনে। ২৫ জানুয়ারি থেকে দেশটি বাংলাদেশ হতে আমদানি বন্ধ রেখেছে। এতে করে খামারে মজুদ করে রাখা কাঁকড়া ও কুঁচে মারা যাচ্ছে। এ খাতের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২ লাখ মানুষের জীবন হুমকিতে পড়েছে। হিমায়িত মাছ রপ্তানিকারকদের সংগঠন ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়শেনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান আশফাক মাসুদ বলেন, গত বছর তারা চীনে অপ্রচলিত মৎস্য রপ্তানি করে ১৩ দশমিক ৩৭ মিলিয়ন ডলার আয় করেছিলেন। এই সময়টাকে রপ্তানির প্রধান সময় ধরে তারা হিমায়িত চিংড়ি ও অপ্রচলিত মৎস্য মজুদ করেছিলেন। কিন্তু এখন তারা তা রপ্তানি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তাইওয়ানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১২ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৫তম আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক ফেয়ার-২০২০-এর আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা। কিন্তু করোনার কারণে সেটি স্থগিত করা হয়েছে। ফলে মেলা থেকে যে রপ্তানি আদেশ তারা প্রত্যাশা করেছিলেন, সেটি পাওয়া যাবে না।


আপনার মন্তব্য