শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ জুলাই, ২০২০ ০০:৩২

অনিয়মেই ডুবছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, চার বছরে ছয় অডিও ফাঁস, উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাট, প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি

জহুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া

অনিয়মেই ডুবছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

দুর্নীতি, লুটপাট আর নানা অনিয়মের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারী নিয়োগ পাওয়ার পর একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যায়ের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে ঠেকেছে। অভিযোগ উঠেছে, উপাচার্যের মদদপুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি চক্র গত তিন বছর ধরে নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য, মেগা প্রকল্পের আড়ালে দুর্নীতি আর বিধি লঙ্ঘন করে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা-কর্মীসহ প্রায় দুই শতাধিক লোককে ডে-লেবার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা এখন বহুল আলোচিত। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য বিষয়ে একাধিক ফোনালাপের অডিও ক্লিপ এখন সবার হাতে।

বর্তমান উপাচার্যের আমলে ঘটে যাওয়া সব অনিয়ম, দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্ত দাবির পাশাপাশি কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক সংগঠন, বঙ্গবন্ধু পরিষদ ও কর্মকর্তা সমিতি থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শিক্ষকরা। এসব সংগঠন ইতিমধ্যে লুটপাট ও অনিয়মের প্রমাণসহ প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী ও ইউজিসি চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে। এতে উপাচার্যের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার বর্ণনা রয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্য : অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমান উপাচার্যের আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৬৫ জন। এ নিয়োগে বড় অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। গত ৪ বছরে নিয়োগ বাণিজ্যের ব্যাপারে ফোনালাপের অন্তত ৫টি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়েছে। এর প্রতিটির সঙ্গে উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষক ড. রুহুল আমিন, ইলেকট্রনিক বিভাগের শিক্ষক এস এম আবদুর রহিম ও সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমানের সম্পৃক্ততা এসেছে। ফাঁস ফোনালাপের অডিও ক্লিপে তাদের কথোপকথন উঠে এসেছে। প্রতি শিক্ষক নিয়োগে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে। সর্বশেষ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলে আরিফ খান নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর কাছে এই তিন শিক্ষক ২৮ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে দাবি করা অর্থের পরিমাণ কমিয়ে ১৮ লাখ টাকা করা হয়। ফাঁস হওয়া ফোনালাপ থেকে এমনটিই জানা যায়। টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় আরিফ হাসান খান নামের ওই প্রার্থীকে তার সব যোগত্যা থাকার পরও পরীক্ষার জন্য ডাকা হয়নি। এই ফোনালাপ ফাঁস হলে তদন্ত কমিটি গঠন করেন উপাচার্য। সেই তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন। পরে সাবেক প্রক্টরসহ অন্যদের চাপে তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে থেমে যায় তদন্তকাজ। পরে আরিফ হাসান খান বিচার চেয়ে তিন পৃষ্ঠার একটি লিখিত অভিযোগ দেন উপাচার্যের কাছে।

এ বিষয়ে আরিফ খান বলেন, ‘চাকরির জন্য আমার সব যোগ্যতা ছিল। কিন্তু রহুল আমিন স্যার, রহিম স্যার ও সাবেক প্রক্টর মাহবুবুর রহমান আমার কাছে সর্বশেষ ১৮ লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। আমি অর্থ দিতে না পারায় অন্যদের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা করে নিয়ে চাকরি দিয়েছেন। আমি লিখিত অভিযোগ দিলেও শুধু তারা ভিসির অত্যন্ত কাছের লোক হওয়ায় উপযুক্ত বিচার পাচ্ছি না।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, ‘আমার সময়ে শিক্ষক নিয়োগে যত ফোনালাপের অডিও ফাঁস হয়েছে তার জন্য তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। তদন্ত টিমের সুপারিশ অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে এমন নজির রয়েছে। তবে আরিফের বিষয়টি জানার পর তদন্ত টিম করেছিলাম। সেই কমিটির প্রধান পদত্যাগ করলে আরেকজনকে প্রধান করা হয়েছে। সেটির তদন্ত চলছে।

উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য : সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে। তবে এ কাজে হরিলুট চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বড় দুটি টেন্ডার ঘিরে ইবির প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেন সাবেক প্রক্টর মাহবুবুর রহমান ও ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিব। তারা একটি বড় কাজ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক নেতাকে দেওয়ার জন্য চাপ দেন। কাজ না দিলে পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনার পর প্রধান প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল পদত্যাগ করার ঘোষণা দেন। পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সব কিছু জানিয়ে দেওয়ার কথাও বলেন। এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হলে ওই প্রকৌশলীর বাসায় গোপনে এসে দেখা করেন সাবেক প্রক্টর মাহবুবুর রহমান। এ বিষয়ে উপাচার্য তদন্ত টিম গঠন করলেও শুধু তার ঘনিষ্ঠজনের জড়িত থাকায় তদন্ত থেমে আছে।

এ ছাড়া প্রতিটি কাজ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ভিসিপন্থি কয়েকজন শিক্ষক নেতার বিরুদ্ধে। ঠিকাদারদের জিম্মি করে মেগা প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি।

এ বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি দেওয়ার পর তিনি পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। এরপর আমি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত টিম করেছি। করোনার কারণে টিম কাজ করতে পারছে না।’

ডে লেবার নিয়োগে ঘাপলা : সম্প্রতি ছাত্রলীগের কিছু সাবেক নেতা-কর্মী, উপাচার্য ও সাবেক প্রক্টরের ঘনিষ্ঠজনদের ডে-লেবার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যার সংখ্যা প্রায় দুই শতাধিক। এর মধ্যে ইবি থেকে পাস করা ছাত্রলীগের অনেক সাবেক নেতা-কর্মী রয়েছে। এদের বেশির ভাগ কাজ না করেই প্রতি মাসে বেতন নিচ্ছেন। এদের নিয়োগ দিতেও দুই থেকে তিন লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ। অভিযোগ আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের প্রধান সাইফুল ইসলাম ডে-লেবারদের প্রতিজনের নামে বিল তোলেন সাড়ে ৯ হাজার টাকা। আর তাদের পেমেন্ট দেন সাড়ে ৫ হাজার টাকা করে। বিষয়টি জানাজানি হলে উপাচার্য একটি লোক দেখানো তদন্ত টিম করেন। এ ব্যাপারে উপাচার্য ড. হারুন উর রশিদ আসকারী বলেন, বিষয়টি আমার নজরে আসায় একটি তদন্ত টিম করেছি। তারা এখনো রিপোর্ট দেয়নি। আমি তাদের তাগাদা দিয়েছি দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য।

শিক্ষক সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনে বিভাজন সৃষ্টি : শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষক সমিতিসহ সব সংগঠনের মাঝে বিভেদ তৈরি করে রাখা হয়েছে। ইবিতে শিক্ষক  সমিতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারী সমিতি ও ছাত্রলীগের মাঝে বিভেদ তৈরি করা হয়েছে। কর্মকর্তা সমিতি, কর্মচারী সমিতি নির্বাচনে ভোটে হেরে উপাচার্যপন্থিরা রাতারাতি জামায়াত-বিএনপি ও জাসদের লোকজনকে দিয়ে পাল্টা কমিটি করেছে।

রেজাউল করিম রেজা নামে একজন শিক্ষক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পেলেও গত ১০ বছরে তার পিতার মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দিতে পারেননি। বিষয়টি জানাজানি হলে উপাচার্য তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বারবার তাকে সুযোগ দিয়ে আসছে। এ ছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে আলোচিত সমালোচিত হয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যায় শাখার সাধারণ সম্পাদক শিক্ষক নেতা প্রফেসর ড. মাহাবুবুল আরেফিন বলেন, উত্তরাঞ্চলের একটি সিন্ডিকেট ভিসি হারুন উর রশিদ আসকারীকে গ্রাস করেছে। সেই সিন্ডিকেটের কয়েকজন বিতর্কিত শিক্ষক ভিসিসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের ইশারায় পরিচালনা করে আসছে। ভিসির নানা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিন্ডিকেটের মূল হোতা সাবেক প্রক্টর মাহবুবুুর রহমান, নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত দুই শিক্ষক রহুল আমিন, আবদুর রহিম, ভিসির দুই ভগ্নিপতিসহ এক ডজন শিক্ষক জড়িয়ে পড়েন নিয়োগ বাণিজ্যে, মেগা প্রকল্পের আড়ালে হরিলুট, ডে-লেবার নিয়োগ দেওয়ার নামে অর্থ লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। যার প্রমাণ গত চার বছরে ৫টি অডিও ফাঁস হয়েছে। এরা সবাই ভিসি ও সাবেক প্রক্টরের ডান হাত হিসেবে পরিচিত। নামমাত্র তদন্ত কমিটি হলেও তারা সবাই বহাল তবিয়তে আছেন।

কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীর মুর্শেদুর রহমান বলেন, হারুন-উর-রশিদ আসকারী উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এক সভায় বলেছিলেন, ‘দুর্নীতি থাকলে আসকারী থাকবে না, আর আসকারী থাকলে দুর্নীতি থাকবে না’। সেদিন তার এ বক্তব্যে করতালি দিয়েছিল সবাই। কিন্তু প্রথম একটি বছর তার ভালো কাটলেও এরপর থেকে একের পর এক  কেলেঙ্কারির ঘটনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যায়ের ভাবমূর্তি একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ৪টি বছর উন্নয়নের আড়ালে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে উপাচার্যের মদদপুষ্ট চক্র।

ইবি শাপলা ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সিনিয়র শিক্ষক প্রফেসর ড. মুঈদ রহমান বলেন, ‘আসকারী আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ভিসি হিসেবে আসার পর একটি বছর  তিনি ভালো ছিলেন। এরপর তিনি একটি সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন। কেন তিনি জিম্মি হয়ে পড়লেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এরপর শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, মেগা প্রকল্পে দুর্নীতিসহ নানা বিষয় সামনে এসেছে। শিক্ষক রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। জামায়াত-বিএনপি আগের থেকে মাথাচাড়া দিচ্ছে। অর্থ যেখানে থাকে সেখানে অনর্থ ডেকে আনবে এটাই বড় কথা। আদর্শের জায়গাটি আর নেই।’

তবে উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন উর রশিদ আসকারীর দাবি- পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে তার আমলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছু ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগে ঘুষ বাণিজ্যসহ সব ধরনের অনিয়মের তদন্ত হয়েছে বা হচ্ছে। দায়ীদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।


আপনার মন্তব্য