মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ টা

আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়েছে করোনায়

জিন্নাতুন নূর

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুধু প্রাণই কেড়ে নিচ্ছে না, এই ভাইরাস মানুষকে আগের চেয়ে বেশি আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলছে বলে জানিয়েছেন মনোবিজ্ঞানীরা। জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা, অসহায়ত্ববোধ, মূল্যহীন হয়ে পড়ার ভয় এবং অর্থনৈতিক চাপে দেশে আত্মহত্যার ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে কভিড-১৯ পরিস্থিতি চলে যাওয়ার পর দেশে এক ধরনের ‘মেন্টাল হেলথ এপিডেমিক’ তৈরি হতে পারে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে সতর্ক করেছেন মনোচিকিৎসকরা। বিষয়টি মোকাবিলার জন্য এরই মধ্যে গবেষণা শুরু করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, কভিড-১৯ পরিস্থিতি চলে যাওয়ার পর  বাংলাদেশে এক ধরনের মেন্টাল হেলথ এপিডেমিক তৈরি হবে। আর উল্লেখযোগ্য মানুষ তখন বিষণœতাসহ বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনাভাইরাসের কারণে অনেকেই এখন পরিবারের সদস্যদের হারাচ্ছেন। এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষের দিন কাটছে। যেসব মানুষ করোনাকালীন এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারছেন না অর্থাৎ বর্তমানের সামাজিক চাপ থেকে তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তারা আত্মহত্যার মতো দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন। কিন্তু করোনা শেষে অনেকেই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ ‘পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডারে’ ভুগবেন। গবেষণাতেও জানা গেছে যে, করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিষয়ে ‘ব্রেন, বিহ্যাভিয়ার, অ্যান্ড ইমিউনিটি’ জার্নালে নতুন একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। তাতে ফুটে উঠেছে কভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার মতো হতাশাজনক এক প্রবণতার কথা। আর এমন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, ভারত, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও ব্রিটেনের মতো দেশে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, করোনাভাইরাস মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তুলবে। তারা বলেন, করোনায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে আইসোলেশন অনেককে হতাশ করে তুলছে। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে। বাড়ছে হতাশা। এ ছাড়া করোনার কারণে চাকরি হারিয়ে অনেকে বেকার হয়ে পড়েন। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে হতাশার কারণে অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে থাকতে পারে।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ডা. গোলাম রাব্বানী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন,   করোনাকালীন মানুষের ওপর এখন অতিরিক্ত মানসিক চাপ। বিশেষ করে এই কঠিন পরিস্থিতি যারা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারছেন না সেসব মানুষ এবং যারা আগে থেকেই নানা ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন তারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সুইসাইডাল টেনডেন্সি ছাড়াও, মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগতে পারেন, তাদের ইমপালসিভিটি হতে পারে, বার্ন আউট হয়েও তারা আত্মহত্যা করতে পারেন। সারা বিশ্বের মতো করোনার কারণে বাংলাদেশেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়েছে। আমরা কভিড-১৯ এবং মানসিক অসুস্থতা নিয়ে গবেষণা করছি। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মানুষকে আমরা কাউন্সিলিং করাব।

গত ১১ জুলাই নাটোরের বড়াইগ্রামে করোনা পরিস্থিতিতে চাকরি হারিয়ে জেনি বেবি কস্তা নামের এক তরুণী আত্মহত্যা করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ওয়ালে দেওয়া স্ট্যাটাসে একাধিকবার আত্মহত্যার ইঙ্গিত দেন। জানা যায়, স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর গত ১৬ বছরে জেনি আর কারও সঙ্গে ঘর বাঁধেননি। এরপর ঢাকায় এসে চাকরি করেন। করোনায় চাকরি হারিয়ে জেনি তার ভাইয়ের সঙ্গে গত তিন মাস ধরে গ্রামে অবস্থান করছিলেন। এ সময় ভাই-ভাবিদের হাতে তিনি একাধিকবার শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এ অবস্থায় মানসিকভাবে চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। গত শনিবার নিজের শোয়ার ঘরে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন জেনি। সাভারের আশুলিয়ায় করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর অবসাদগ্রস্ত হয়ে সুলতান আহমেদ (৫৮) নামে এক ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থতায় ভোগা সুলতান করোনায় সংক্রমিত হয়ে নিজ বাড়ির একটি কক্ষে সিলিং ফ্যানে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ভেবে কলেজ ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে সুজন দেওয়ানজী (৩৬) নামের আরেক যুবক আত্মহত্যা করেন। তিন সন্তানের জনক ও একটি বেসরকারি শিল্প কারখানায় কাজ করতেন সুজন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এমন সন্দেহে রাজধানীর খিলগাঁওয়ের পাঁচতলা বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে তোফাজ্জল হোসেন (৪০) নামে এক পুলিশ কনস্টেবল আত্মহত্যা করেন। জানা যায়, করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর তোফাজ্জল করোনা পরীক্ষা করান। কিন্তু ফল নেগেটিভ আসার পরও তিনি সন্দেহ করেন যে তার ফল ঠিকভাবে আসেনি আবার করোনায় আক্রান্ত হবেন। এতে কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে এক পর্যায়ে আত্মহত্যা করেন।

মনোচিকিৎসক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সামাজিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে মনে হচ্ছে যে মহামারীতে মানসিক সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ মানুষ এখন অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আছে। এর সঙ্গে আছে মৃত্যুভয়। আর মানুষ যখন চাপে থাকে তখন আবেগে আক্রান্ত হন। আবেগের মধ্যে এক ধরনের অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা তৈরি হয়। সেখানে একজনের রাগ, ক্ষোভ ও বিরক্তি হতে পারে। একে বলা হয় সাইকোলজিক্যাল ডিজরাপশন। আর এই রাগ-ক্ষোভ থেকে অনেক সময় আত্মহত্যার মতো অঘটন ঘটে যেতে পারে।

সর্বশেষ খবর