শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৯ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মে, ২০২১ ২৩:৪২

মঞ্চ সংকটে বাধাগ্রস্ত সংস্কৃতিচর্চা

মোস্তফা মতিহার

মঞ্চ সংকটে বাধাগ্রস্ত সংস্কৃতিচর্চা
Google News

সংস্কৃতি মানুষের চিত্তকে শুধু বিনোদিতই করে না, সমাজের নানা অসঙ্গতিও তুলে ধরে। জাতিসত্তার বিকাশেও রয়েছে সংস্কৃতির অপরিহার্যতা। যান্ত্রিক রাজধানী ঢাকা মহানগরীতে প্রায় ২ কোটি মানুষের বসত। উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে রাজধানীর পরিধি বাড়ার পাশাপাশি বিশাল সুরম্য অট্টালিকাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে কাজের খোঁজে আসা রাজধানীর বাসিন্দাদের সংখ্যা। তবে, এত সব বৃদ্ধির মধ্যেও বাড়েনি নাটক, সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের জন্য পর্যাপ্ত মিলনায়তনের সংখ্যা। মিলনায়তন সংকটের কারণে সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশ যেভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ঠিক একইভাবে ব্যস্ত নগরীতে হাঁফিয়ে ওঠা বাসিন্দারাও নিজেদের বিনোদনের খোরাক থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংস্কৃতির বিকাশ ও চর্চায় যে ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকার দরকার এই নগরীতে এখনো সেই ধরনের সুযোগ-সুবিধা গড়ে উঠেনি। অর্থাৎ মিলনায়তন সংকটের কারণেই ব্যাহত হচ্ছে সংস্কৃতি চর্চা ও বিকাশ।

সংস্কৃতির সূতিকাগার বলে খ্যাত রাজধানীর সেগুনবাগিচার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার তিনটি মিলনায়তন, সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্রের একটি মিলনায়তন ও চিত্রশালার একটি মিলনায়তন, একই এলাকার কচি-কাঁচার মিলনায়তন, নাটকসরণিখ্যাত বেইলি রোডের মহিলা    সমিতির মিলনায়তন ২ কোটি বাসিন্দার রাজধানীর জন্য অপ্রতুল বলেই মনে করছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ। এই মিলনায়তনগুলো একই এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় নগরীর অন্য প্রান্তের বাসিন্দাদের পক্ষে এই মিলনায়তনগুলোতে আসা সময় ও  কষ্টসাধ্য। উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী থেকে সেগুনবাগিচা কিংবা বেইলি রোডে এসে নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য অতিরিক্ত দুই থেকে তিন ঘণ্টার মতো সময় বেশি গুনতে হয় সংস্কৃতিপ্রিয়দের। সেই সঙ্গে তো রয়েছে যানজটের তীব্র যন্ত্রণা। রাজধানীর সব এলাকার বাসিন্দাদের বিনোদনের কথা চিন্তা করে গুলশান, ধানমন্ডি, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ ও নির্দিষ্ট দূরত্বের এলাকায় মঞ্চ নির্মাণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন সংস্কৃতিকর্মীরা। নির্দিষ্ট দূরত্বে আরও বেশ কয়েকটি মঞ্চ নির্মাণ করা হলে একদিকে সংস্কৃতিকর্মীদের সংস্কৃতি চর্চার পথ সুগম হবে আর বিনোদন বঞ্চিতরাও নিজ নিজ বসতি এলাকার মিলনায়তনগুলোতে গিয়ে নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, নৃত্য ইত্যাদি উপভোগ করতে পারবে। এ বিষয়ে অভিনেতা ও নির্দেশক মামুনুর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শিল্পকলা একাডেমি ও মহিলা সমিতির মিলনায়তনসহ হাতে গোনা কয়েকটি মিলনায়তন দিয়েই চলছে রাজধানীর প্রায় ২ কোটি বাসিন্দার বিনোদন। যার কারণে বেশিরভাগ নাগরিকই বিনোদন উপভোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। শুধু রাজধানীর বাসিন্দারাই যে বিনোদন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তা কিন্তু নয়, রাজধানীতে যারা সংস্কৃতিচর্চা করেন তারাও মিলনায়তনের অভাবে নিজেদের সংস্কৃতিচর্চাটা ঠিকমতো করতে পারছেন না। সংস্কৃতিকর্মীদের সংস্কৃতিচর্চার পথকে সুগম করে রাজধানীর বাসিন্দাদের বিনোদিত করার লক্ষ্যে রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, পল্লবী, মোহাম্মদপুর, গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও বেশ কয়েকটি মঞ্চ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। অভিনেত্রী ও নির্দেশক লাকী ইনাম বলেন, নাটক মঞ্চায়নের জন্য যে পরিমাণের মঞ্চ দরকার সেই পরিমাণের মঞ্চ আমাদের নেই। তাই আমি মনে করি নাটকের দল ও নাটকের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি মিলনায়তনের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হোক। রাজধানীর উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডি, গুলশানসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতে কয়েকটি মঞ্চ নির্মাণ করা হলে নাটকের বিকাশ আরও বেশি ঘটবে এবং দ্রুতই ঘটবে। বাংলাদেশ থিয়েটারের অধিকর্তা খন্দকার শাহ আলম বলেন, আমাদের যে পরিমাণ নাটকের দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে সে তুলনায় আমাদের মঞ্চ সংখ্যা একেবারেই নগণ্য। শুধু মঞ্চ সংকটের কারণে অনেক নাটকের দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিয়মিত তাদের চর্চা অব্যাহত রাখতে পারে না। কবে হল পাবে আর কবে নাটক মঞ্চায়ন করবে এ ধরনের চিন্তা তো আমাদের মাথায় সব সময়ই থাকে। এত চিন্তা মাথায় নিয়ে আর যাই হোক সংস্কৃতিচর্চাকে গতিশীল রাখা যায় না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক মঞ্চ স্থাপনের জন্য সরকারের কাছে আমরা জোর দাবি জানাই। নাটকের দল প্রাঙ্গণেমোর এর দল প্রধান নাট্যকার, অভিনেতা ও নির্দেশক অনন্ত হীরা বলেন, নাটকের দল বাড়লেও মিলনায়তন বাড়েনি। যার কারণে নতুন নতুন অনেক দল মিলনায়তন পাচ্ছে না। ফলে তাদের সংস্কৃতিচর্চার ব্যাঘাত ঘটছে ভীষণভাবে। নাটকের দল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আরও বাড়বে, কিন্তু মিলনায়তনের সংখ্যা যদি না বাড়ে তাহলে তারা চর্চাটা করবে কোথায়? যার কারণে আমি চাই রাজধানীতে আরও অনেক মঞ্চ নির্মাণ করা হোক। থিয়েটার বিষয়ক পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’র সম্পাদক পাভেল রহমান বলেন, রাজধানী চারদিকে সম্প্রসারিত হয়েছে, বিশাল বিশাল সুরম্য প্রাসাদসম অট্টালিকা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় জাতিসত্তার বিকাশে যে সংস্কৃতি কাজ করে থাকে সেই সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে মিলনায়তনের সংখ্যা বাড়েনি। রাজধানী আধুনিক হয়েছে, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে, মানুষের জীবনযাত্রার মানও বেড়েছে, কিন্তু সংস্কৃতি সেই আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে। উত্তরা, গুলশান, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর এমনকি নদীর ওই পাড়ে কেরানীগঞ্জ ও কামরাঙ্গীরচরেও মঞ্চ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেই আমি মনে করি। মিলনায়তনের অভাবে অনেক নাট্যদল ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাদের চর্চা ঠিকমতো করতে পারছে না। এতে করে তাদের বিকাশটা ঠিকমতো হচ্ছে না।