শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুন, ২০২১ ২৩:২৩

ভুল প্রেমের খেসারত

মির্জা মেহেদী তমাল

ভুল প্রেমের খেসারত
Google News

স্ত্রী, তিন মেয়ে আর এক ছেলেকে নিয়ে ব্যবসায়ী সাদিকুর রহমানের পরিবার। বড় মেয়ে জাপানে। মেজো মেয়ে ঢাকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএর ছাত্রী। একমাত্র ছেলে ব্যবসা করছেন। মাঝে-মধ্যে তাকে বিদেশ থাকতে হয়। ছোট মেয়ে স্কুলে পড়ে। আত্মীয়-স্বজনরা তাদের পরিবারকে আদর্শ পরিবার হিসেবেই মনে করে। সকালে এক টেবিলে বসে স্ত্রী রোমানা নার্গিস আর দুই মেয়ে রুমা ও শান্তা (ছদ্মনাম)-সহ সকালের নাস্তা করছিলেন সাদিকুর রহমান। কলিংবেল বাজে। রোমানা নার্গিস দরজা খুলে দেন। সামনে দাঁড়ানো দুই যুবক। রুবেল আর মিথুন। স্থানীয় বখাটে যুবক। সাতসকালে তাদের দেখেই ভয় পান রোমানা নার্গিস। বলেন, ‘কী চাও তোমরা?’ সাদিক সাহেবকে চাই-রুবেলের জবাব। দুই বোন ততক্ষণে মায়ের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তখন রুবেল ছোট বোনকে উদ্দেশ করে বলে, ‘এই যাও, তোমার বাবাকে ডেকে নিয়ে আসো।’ এ কথা শুনে ভয় পায় মা আর দুই মেয়ে। হইচই শুনে সাদিকুর এগিয়ে আসেন দরজার কাছে। সাদিকুরকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়ে রুবেল আর মিথুন। রুবেল বলে, ‘আপনার মেয়ে শান্তাকে আমি বিয়ে করব। আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিন।’ এ কথা শুনে সাদিকুর হতভম্ব। বলে কী এই ছেলে। ‘এই তুমি কী বলছ এসব। বের হয়ে যাও এখান থেকে। বলেছি না, আমার মেয়ের পেছনে তুমি ঘুরবা না- রাগ হয়ে বলেন সাদিকুর। রুবেল আর মিথুন যেন বেপরোয়া হয়ে উঠল। শান্তার হাত ধরে রুবেল বলে, চলো শান্তা। আমরা নিজেরাই বিয়ে করব। রুবেল তাকে টানতে থাকে। সাদিকুর রহমান বলেন, ‘কোথায় যাও, পাগলামি করো না।’ ঠিক তখনই রুবেল কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তল বের করে। বেশি ঝামেলা করবেন, একদম শেষ করে দেব। শান্তা এ সময় রুবেল আর রুবেলের বন্ধুকে বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে বলে। কিন্তু রুবেল বলে, তোমাকে না নিয়ে আমি যাব না। উত্তেজিত হয়ে পড়েন সাদিকুর। তিনি রুবেলকে বলেন, বেরিয়ে যাও, নইলে পুলিশকে খবর দেব। রুবেল তার হাতের পিস্তলটি সাদিকুরের মাথায় ঠেকায়। ট্রিগারে চাপ দেয়। গুলি সাদিকুরের মাথায় বিদ্ধ হলে তিনি লুটিয়ে পড়েন। ‘এই তুমি কী করলা’ রোমানা নার্গিস চিৎকার করে বলতে থাকেন। রুবেলের বন্ধু মিথুন তাকে জাপটে ধরে রাখে। তখন রুবেল তার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি চালায়। সাদিকুরের দেহের ওপর লুটিয়ে পড়েন রোমানা নার্গিস। চোখের সামনে বাবা-মায়ের ছটফট দেখে ভীষণ ভয় পায় দুই বোন। দৌড়ে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পায় তারা। এক পর্যায়ে বড় মেয়ে রুমা দোতলা থেকে নিচে নেমে সিকিউরিটি গার্ডকে বলে খুনিদের আটকানোর জন্য। সিকিউরিটি দুই যুবককে জাপটে ধরার চেষ্টা করে। কিন্তু পিস্তল দেখালে তাদের ছেড়ে দেয় সিকিউরিটি গার্ড। পরে স্থানীয়রা দুই যুবককে ধাওয়া করে। এক পর্যায়ে তারা ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ সাদিকুর এবং রোমানা নার্গিসকে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ডাক্তার তাদের মৃত ঘোষণা করেন। গুলশানের কালাচাঁদপুরের একটি বাড়িতে এই জোড়া খুনের ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার পর পুলিশ আসে। তদন্ত শুরু হয়। পুলিশ জানতে পারে স্থানীয় বখাটে যুবক রুবেল দীর্ঘদিন ধরে সাদিকুর রহমানের মেয়ে শান্তাকে উত্ত্যক্ত করত। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে শান্তাকে আটকে প্রেম নিবেদন করত। দিন দিন এমন পরিস্থিতিতে শান্তাও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক হয়। যা সাদিকুর রহমানের পরিবারের কারও চোখে ধরা পড়েনি। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তারা কথা বলত। এক পর্যায়ে ঘটনার তিন মাস আগে শান্তা জানতে পারে রুবেল ইয়াবায় আসক্ত। অপরাধ জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। এরপর থেকে শান্তা রুবেলের কাছ থেকে সরে আসতে থাকে। এতে রুবেল আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে স্কুলে যাতায়াতের পথে শান্তাকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে শান্তা ঘটনাটি তার ব্যবসায়ী বাবা সাদিকুর রহমানকে জানায়। পরে শান্তাকে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন তার বাবা-মা। এ সময় রুবেল কয়েক দফা বাড়িতে ঢুকে ব্যবসায়ী সাদিকুর রহমানকে তার মেয়ে শান্তার বিয়ের প্রস্তাব দেয়। প্রতিবারই রুবেল প্রত্যাখ্যাত হয়। ঘটনার দুই দিন আগে শান্তাদের বাসায় গিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে এসেছিল। সেই হুমকির ৪৮ ঘণ্টা পর দুজনকে গুলি করে হত্যা করে। যাওয়ার সময় রুবেল বলে যায়, ‘যাহ, শেষ করে দিয়ে গেলাম।’ পুলিশ জানায়, ভুল প্রেমের খেসারত দিতে হয়েছে চরমভাবে।