শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ জুলাই, ২০২১ ২৩:১৬

অজ্ঞাত লাশের পারিবারিক কবরস্থান

মির্জা মেহেদী তমাল

অজ্ঞাত লাশের পারিবারিক কবরস্থান
Google News

টহল দিতে গিয়ে পুলিশ ময়মনসিংহের মধুপুর ঘনবন এলাকার রাস্তায় এক নারীর লাশ দেখতে পায়। ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ। পরদিন পুলিশ অজ্ঞাত নারীর দাফন করে। এদিকে নারীর লাশ উদ্ধারের সংবাদে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার আসানবাড়ি গ্রামের হাফিজুর মধুপুর থানায় হাজির হন। পুলিশ কর্মকর্তারা ওই নারীর কাপড় দেখায় হাফিজুরকে। তিনি পুলিশকে বলেন, এই মেয়েটা তার বোন। পরে অজ্ঞাত ওই নারীর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে পুলিশ। হাফিজুর তার বোনের লাশ নিয়ে যান নিজ গ্রামে। ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের আগস্টে। ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজের এলএলবি শেষ বর্ষের এক ছাত্রীকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণের পর ঘাড় মটকে হত্যা করা হয়। মধুপুর থানা পুলিশ ২৬ আগস্ট অজ্ঞাত হিসেবে লাশটি দাফন করে। পরে মধুপুর থানায় রূপার সালোয়ার- কামিজ দেখে পরিচয় শনাক্ত করেন তার বড় ভাই হাফিজুর ইসলাম। এভাবেই অজ্ঞাত নারীর লাশ ফিরে পেল পারিবারিক কবরস্থান। এ ঘটনায় বাসচালক ও হেলপারসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে মধুপুর থানা পুলিশ। তাদের মধ্যে তিনজন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে রূপাকে গণধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে বাসচালক ময়মনসিংহ  কোতোয়ালি এলাকার শহিদুল ইসলামের ছেলে হাবিবুর রহমান (৩০), সুপারভাইজার একই এলাকার সুলতান উদ্দিনের ছেলে ফজল আলী গেন্দু (৫৮), হেলপার মুক্তাগাছার নন্দীবাড়ির মৃত কামাল হোসেনের ছেলে আকরাম (৩৫) ও খোরশেদ আলমের ছেলে শামিম মিয়া (২৫) এবং তাদের সহযোগী ময়মনসিংহ সদরের মৃত সুজা মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (১৯)।

জিজ্ঞাসাবাদে রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করে তারা। পুলিশকে জানিয়েছে, ঘটনার দিন বাসে রূপাসহ ছয় থেকে সাতজন যাত্রী ছিলেন। অন্য যাত্রীরা সিরাজগঞ্জ মোড় এবং বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নেমে যান। বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার সময় রূপা একাই বাসে ছিলেন। বাসটি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার কাছাকাছি এলে বাসের সহকারী শামীম জোর করে তাকে বাসের পেছনের আসনে নিয়ে যায়। এ সময় রূপা তার কাছে থাকা ৫ হাজার টাকা ও মুঠোফোন শামীমকে দিয়ে দেন এবং ক্ষতি না করতে অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধ উপেক্ষা করে শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীর তাকে ধর্ষণ করে। রূপা চিৎকার শুরু করলে ধর্ষকরা তার মুখ চেপে ধরে। এক পর্যায়ে ঘাড় মটকে তাকে হত্যা করে। পরে মধুপুর উপজেলা সদর পেরিয়ে বন এলাকা শুরু হলে পঁচিশ মাইল এলাকার রাস্তার পাশে লাশ ফেলে দেওয়া হয়। পরে পঁচিশ মাইল এলাকায় সড়কের ধারে ওই তরুণীর রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকার খবর পায় মধুপুর থানা পুলিশ। সুরতহাল রিপোর্ট করে লাশ থানায় নিয়ে আসে তারা। তাতেই ধর্ষণের পর হত্যার আলামত পরিলক্ষিত হয়। রূপার ভাই হাফিজুর রহমান গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে রাতে মধুপুর থানায় উপস্থিত হয়ে লাশের ছবি ও পরনের কাপড় দেখে বোন রূপার পরিচয় শনাক্ত করেন। তার দেওয়া তথ্যর ওপর নির্ভর করে অভিযানে নামে পুলিশ। হাফিজুর জানান, তার ছোট বোন রূপা বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স শেষ করে ঢাকার আইডিয়াল ল কলেজে এলএলবি শেষ বর্ষে পড়ছিল। পাশাপাশি সে ময়মনসিংহ জেলা সদরে অবস্থিত ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রোমোশনাল ডিভিশনে কর্মরত ছিল এবং সেখানেই থাকত। ২৫ আগস্ট সে শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় অংশ নিতে বগুড়া যায়। পরীক্ষা শেষে বগুড়া থেকে ময়মনসিংহগামী ছোঁয়া পরিবহনের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৩৯৬৩) নামক একটি বাসে তার এক সহকর্মীর সঙ্গে ওঠে। সহকর্মীর কর্মস্থল ঢাকায় হওয়ায় সে এলেঙ্গায় নেমে যায় এবং রূপা ওই বাসেই ময়মনসিংহ যাচ্ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে সে ময়মনসিংহ না পৌঁছলে সহকর্মীরা মোবাইলে ফোনে যোগাযোগ করেন। এক যুবক ফোনটি রিসিভ করে এবং রূপা ভুল করে ফোনটি ফেলে রেখে গেছে জানিয়ে সংযোগ কেটে দেয়। এরপর থেকে ফোনটি আর খোলা পাওয়া যায়নি। এদিকে রূপা কর্মস্থলে না পৌঁছলে ইউনিলিভার বাংলাদেশের অফিস থেকে স্বজনদের বিষয়টি অবগত করা হয়। পরে পরিবার থেকে রূপার নিখোঁজের বিষয়ে ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় জিডি করা হয়। মধুপুর থানা পুলিশ জানায়, স্বজনরা থানায় এসে ছবি দেখে খুন হওয়া তরুণীর পরিচয় শনাক্ত করেন এবং নিহতের বড় ভাই হাফিজুর ইসলাম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন। রাতেই অভিযান চালিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ছোঁয়া পরিবহন বাসের চালক, সুপারভাইজার, সহকারীসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই সময় ওই তরুণীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার এবং বাসটি জব্দ করা হয়। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। পরে আদালতের নির্দেশে লাশ উত্তোলন করে সিরাজগঞ্জ নেওয়া হয়। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।