শিরোনাম
শনিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২৩ ০০:০০ টা

থেমে নেই ভার্চুয়াল কয়েনের লেনদেন

মাহবুব মমতাজী

থেমে নেই ভার্চুয়াল কয়েনের লেনদেন

‘আমাদের ওয়েবসাইটের উদ্দেশ্য হলো শুধু ফ্রিল্যান্সারদের সহযোগিতা করা’- এ কথাটির প্রচার হতে দেখা গেছে একটি ওয়েবসাইটে। পরে সেই ওয়েবসাইটটি ঘেঁটে দেখা যায়, সেটি ভার্চুয়াল কয়েন কেনাবেচার বিশাল এক ভার্চুয়াল বাজার। দেখতে অনেকটা শেয়ারবাজারের ওয়েবসাইটের মতো। ওয়েবসাইটটি হলো- ক্যাশওয়ালেটবিডি ডটকম (https://cashwalletbd.com।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, এখানে টাকা থেকে কিংবা ডলার ভার্চুয়াল কয়েনে স্থানান্তর করা যায়। এরপর তা পেপাল, স্ক্রিল, পেজা, পেওনিয়ার, পারফেক্ট মানি, ওয়েবমানি, বিটিসি ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে নেওয়া যায়। ওই ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সেখানে সব ধরনের ক্রিপ্টোকারেন্সি ক্যাশ করা যায়। আবার ক্যাশ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিও করা সম্ভব। এটি দেশের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো সময়। টাকা ক্যাশ এবং ইন করার জন্য দুটি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) নাম পাওয়া যায়। সে দুটি হলো- নগদ ও রকেট। লাইট কয়েন, পারফেক্ট মানি, পেয়ার, অ্যাডভান্সক্যাশ এবং ওয়েবমানিকে রূপান্তরের জন্য আলাদা আলাদা মূল্য তালিকাও দেওয়া হয়েছে। আর এই ওয়েবসাইটে লেনদেনের জন্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়। ইউজার নাম ও পাসওয়ার্ড দিয়ে ওয়েবসাইটিতে লেনদেন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, তারা এই ওয়েবসাইটি সম্পর্কে এখনো জানেন না।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টারের বিশেষ পুলিশ সুপার রেজাউল মাসুদ এ প্রতিবেদককে জানান, তারা এখনো ওই ওয়েবসাইটটি সম্পর্কে জানতে পারেননি। তবে তারা খোঁজখবর নিয়ে দেখবেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাইবার ও স্পেশাল ক্রাইম-উত্তরের উপকমিশনার (ডিসি) তারেক বিন রশিদ বলেন, ‘আমরা বিটকয়েন কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার বিভিন্ন ওয়েবসাইট চিহ্নিত করি। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আইনগত ব্যবস্থা নিই।’

জানা গেছে, এমএফএস প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে ডিজিটাল হুন্ডি এবং অবৈধ গেমিং, বেটিং, ক্রিপ্টোট্রেডিং বা অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিং-সংক্রান্ত লেনদেন চিহ্নিত করতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে ফজলে রাব্বিকে এবং মোহাম্মদপুর থেকে শামীমা আক্তারকে গ্রেফতার করে সিআইডি। এরা টিএমআই নামে একটি অ্যাপসে হুন্ডি করে আসছিলেন। আর টিএমআই অ্যাপসের পরিচালক মিজানুর রহমান ইতালির রোমে অবস্থান করছেন। টপআপটোয়েন্টিফোর ডট ইনফো নামের আরেকটি ওয়েব অ্যাপসের মাধ্যমেও হুন্ডি লেনদেনে তারা জড়িত। এই অ্যাপস ছাড়াও হুন্ডির জন্য সৌদি আরবকেন্দ্রিক ‘ইজিক্যাশ’ নামে আরেকটি অ্যাপসের খোঁজ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, ‘এভাবে ওয়েবসাইটে লেনদেন সম্পূর্ণ অবৈধ। তবে এটা আমাদের নলেজে নেই।’

এদিকে অনলাইনে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে ফরেক্স ট্রেডিং সাইটে মানুষের বিনিয়োগের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচারে জড়িত একটি চক্রকে চিহ্নিত করে ডিবি। এদের খপ্পরে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে লাভের আশায় বিনিয়োগ করে অনেক মানুষ সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ফরেক্স ট্রেডিংয়ে অন্তত ১৪২টি ওয়েব লিংক পাওয়া গেছে। এসবের ৯টি বাংলাদেশি এজেন্টকে চিহ্নিত করেছে ডিবি। এই এজেন্ট পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধে গত বছর ২২ নভেম্বর রাজধানীর রমনা থানায় একটি মামলা করেন ডিবির সাইবার ও স্পেশাল ক্রাইমের এসআই ধর্মেন্দু দাশ। তিনি তার মামলায় ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারে ৮০-৯০ জনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরা দীর্ঘদিন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে ডলার, ইউএসডিটি, এডিএ, ইটিএইচ, বিটিসি, বিএনবি ও ইটিসিসহ ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ ই-ট্রানজেকশন করে।

ওই চক্রের চারজনকে পাবনার ঈশ্বরদী এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে ডিবি। তারা হলেন- আবিদ রহমান শুভ, ফয়সাল আহম্মেদ সরকার, কামরুন নাহার ও তাইফুর রহমান তন্ময়।

ডিবি জানায়, এদের ফরেক্স ট্রেডিং সাইটগুলো অনেকটা শেয়ারবাজারে শেয়ার কেনাবেচার মতো। এটি অনলাইনে শেয়ার কেনাবেচার একটি প্ল্যাটফরম। এটিতে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেই।

যেভাবে ফরেক্স ট্রেডিংয়ে জড়িয়ে পড়েন : কামরুন নাহার ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনলাইনে বিডি জবসের মাধ্যমে আবেদন করেন। পরে আইটি গ্রো ডিভিশন লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক ইনস্ট্রাফরেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনডি সানারজো সাইমাতুপেগ অনলাইনে ভাইভা নিয়ে কামরুন নাহারকে বাংলাদেশি অংশের ক্লায়েন্ট রিলেশন ম্যানেজার পদে নিয়োগ দেন। ইনস্ট্রাফরেক্স সাইটে তিনি তার মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেন। তাইফুর রহমান তন্ময় ইন্দোনেশিয়ান নাগরিক এনডি সানারজো সাইমাতুপেগের মাধ্যমে ২০১৩ সালে নিয়োগ পেয়ে ইনস্ট্রাফরেক্স ট্রেডিং সাইটের বাংলাদেশ অংশের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজার ও অ্যাডমিন হিসেবে কাজ করেন। পরে এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের নাম পরিবর্তন করে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটির কোনো জনবল প্রয়োজন হলে তিনি নিয়োগ দেন।

সর্বশেষ খবর