শিরোনাম
শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০০:০০ টা

বর্ডার রোডে কমছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

শিমুল মাহমুদ, পার্বত্যাঞ্চল থেকে ফিরে

বর্ডার রোডে কমছে নিরাপত্তা ঝুঁকি

তিন পার্বত্য জেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল সুরক্ষায় তৈরি হচ্ছে ১ হাজার ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত সড়ক। প্রথম ধাপের ৩১৭ কিলোমিটার সীমান্ত সড়কের মধ্যে ১৭৪ কিলোমিটারের নির্মাণ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ আগামী জুনের মধ্যে শেষ হবে। খাগড়াছড়ির রামগড় থেকে শুরু হয়ে বান্দরবানের আলীকদমের পোয়ামুহুরিতে গিয়ে শেষ হবে সড়কটি। রাঙামাটিতে ১১৭ কিলোমিটার, খাগড়াছড়িতে ১৫ কিলোমিটার ও বান্দরবান সীমান্তে ৭৩ কিলোমিটার সড়ক নির্মিাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। দুই লেনের ১৮ ফুট প্রশস্ত এ সড়ক দুর্গম পাহাড়কে মূল জনপদের সঙ্গে যুক্ত করছে। তিন দিনের হাঁটা পথের দূরত্ব এখন নেমে এসেছে তিন ঘণ্টারও কম সময়ে। ফলে পাহাড়ের দুর্গম যোগাযোগ আর ‘দুর্গম’ থাকছে না। এ বর্ডার রোড বদলে দিয়েছে পার্বত্য জেলাগুলোর নিরাপত্তার ঝুঁকি। পার্বত্যবাসীর জীবনকে করেছে স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিময়। সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠেছে মানব বসতি, ঘরবাড়ি, দোকান ও বাজার। বেড়ে গেছে স্থানীয়দের আয় রোজগার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সদস্যরা এ অসাধ্য সাধন করেছে। পাহাড়ে নির্মাণ কাজ করা অনেক শ্রমসাধ্য। নির্মাণ উপকরণ বয়ে নিয়ে যেতে হয় অনেক দীর্ঘ পথ। সঙ্গে আছে নিরাপত্তার ঝুঁকি। গত কয়েকদিনে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বদলে যাওয়া পাহাড়ের অসামান্য উন্নয়ন দেখে মনে হলো, অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলের কৃষি, পর্যটন ও শিল্পায়নের গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। পাহাড়ের জনজীবন বদলে যাবে সমৃদ্ধির ছোঁয়ায়। বর্ডার রোড তৈরির উদ্ভাবনী ধারণাটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য তিন জেলার দুর্গম অঞ্চলগুলোয় যোগাযোগ বন্ধ্যত্ব দূর হচ্ছে। সীমান্তের গহিন ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নতুন সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়ায় খুশি স্থানীয়রা। এ ছাড়া পার্বত্য এলাকায় চোরাচালান ও মাদক নিয়ন্ত্রণে সীমান্ত সড়ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানো সহজ হবে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া সীমান্ত সড়কটির প্রথম পর্যায়ে ৩১৭ কিলোমিটারের কাজ সাতটি ভাগে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর পর শুরু হবে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্ডার রোডের কারণে উন্নয়ন চলে যাচ্ছে একেবারে তৃণমূলের কাছে। স্থানীয়রা সম্পৃক্ত হচ্ছেন আয়বর্ধক নানা কাজে। সীমান্ত সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে জনবসতি। নতুন নতুন ঘর বাড়ি। ঘরের পাশে দু-চারটি পেঁপে গাছ, রঙিন টিনের চালে গড়াগড়ি খাচ্ছে পুঁই, লাউয়ের ডগা-যা দিয়ে সারা বছরের সবজির চাহিদা মিটে যায়। টিনের চালে সোলার প্যানেল বসানো। কয়েক বছর আগেও যেটা কল্পনা করতে পারত না পাহাড়ের বাসিন্দারা। রাঙামাটির সাজেকের দাড়ি পাড়ার গৃহিণী সুখী চাকমা। ২৭ নভেম্বর পড়ন্ত বিকালে ঘরের সামনে বসে বাঁশ কোড়লের (বাঁশের কচি ডগা) সবজি প্রসেস করছিল। সড়কের পাশে আধা পাকা ঘর। টিনের চালে সোলার প্যানেল বসানো। ঘরের পাশে লাগানো পুঁইয়ের ডগা ঘরের চাল বেয়ে উঠে গেছে। জানতে চাইলে তিনি বললেন, সীমান্ত সড়ক হওয়ায় অনেক উপকার হয়েছে। এখান থেকে মাসালং বাজারে যেতে তিন দিন লাগত। এখন দ্রুত চলে যেতে পারি। ছোট মেয়েটা স্কুলে যেতে পারে সহজেই। তার স্বামী তরুণ জীবন চাকমা পিকআপের ড্রাইভার। বললেন, আগে দিঘীনালা ছিল। সাত বছর আগে এখানে এসেছি। রাস্তা হওয়ায় এখানে আয় রোজগার ভালো। আমাদের অনেক উপকার হয়েছে। বাঘাইছড়ির একটি এনজিওতে কাজ করেন সুমন্ত চাকমা। তিনি বলেন, সীমান্ত সড়ক পাহাড়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে। চিকিৎসাসেবাও পৌঁছে যাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায়।  উঁচু নিচু পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখে তৈরি হচ্ছে সীমান্ত সড়ক। এটিই দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক নির্মাণের অসাধারণ কীর্তি। সর্বোচ্চ পয়েন্টে এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট। এর আগে দেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক ছিল বান্দরবানে পাহাড়ের ওপর দিয়ে নির্মিত থানচি-আলীকদম সড়কটি। সীমান্ত সড়কের সঙ্গে পার্বত্য বিভিন্ন এলাকার মধ্যে প্রচুরসংখ্যক অভ্যন্তরীণ ‘কানেক্টিং রোড’ নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা অবাধে যাতায়াত সুবিধা পাবেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে- এ সীমান্ত সড়কের কারণে পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির বিরাট এক বিপ্লব ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে। সীমান্ত সড়কটি শুরু হয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম থেকে। এরপর দোছড়ি-আলীকদম-থানচি-রেমাক্রি-ধুপানিছড়া সড়ক হয়ে তিন দেশের (বাংলাদেশ-মিয়ানমার-ভারত) সীমানা তিন মুখ পাহাড় ঘেঁষে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সীমান্তের রামগড় পর্যন্ত পৌঁছবে। সীমান্ত সড়কের প্রকল্প কর্মকর্তা (উদয়পুর) মেজর এইচ এম ইকরামুল হক বলেন, এ সড়ক নির্মাণের ফলে গহিন পাহাড়ের অরক্ষিত এলাকাও পুরোপুরি নজরদারির মধ্যে চলে আসবে। বিস্তৃত এলাকার নিরাপত্তাসহ পর্যটন শিল্প বিকাশের পথ প্রশস্ত হবে। তিনি বলেন, পার্বত্য এলাকায় নির্মাণ কাজ করা খুবই কঠিন। এ সড়ক নির্মাণের ফলে স্থানীয়রা অনেক উপকৃত হচ্ছে। ফলে তাদের সহযোগিতা পাচ্ছি। নির্মাণকর্মীদের জন্য খাবার ও পানি আনতে হয় অনেক দূর থেকে। কনস্ট্রাকশন মেটেরিয়াল আনতে হয় চট্টগ্রাম থেকে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘ এ সড়ক পার্বত্য জেলাগুলোর সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন ঘটাবে। এ ছাড়া পাশের দেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, সীমান্ত এলাকার কৃষিপণ্য দেশের মূল ভূখন্ডে পরিবহনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং পার্বত্যাঞ্চলের বিভিন্ন শিল্পকারখানা স্থাপনের জন্য বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে ভারতের মিজোরাম-ত্রিপুরা এবং মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যের সঙ্গে সড়ক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করবে এটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর থেকে গত ২৬ বছরে সরকার তিন পার্বত্য জেলায় ১ হাজার ২১২ কিলোমিটার পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রাঙামাটি জেলায় ৬৬২ কিলোমিটার, খাগড়াছড়িতে ১৩০ কিলোমিটার ও বান্দরবানে ৪২০ কিলোমিটার। যার প্রধান ভূমিকায় ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

সর্বশেষ খবর