শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২২:৫১

তাবৎ ভারতীয় ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র ‘বঙ্গাল গেজেটি’

ড. শেখ আবদুস সালাম

তাবৎ ভারতীয় ভাষায় প্রথম সংবাদপত্র ‘বঙ্গাল গেজেটি’
একুশের প্রভাতফেরিতে মেয়েদের মিছিল ছবি : রফিকুল ইসলাম

ভারত-বাংলাদেশ অঞ্চলে আধুনিক এবং প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্রের গোড়াপত্তন ঘটে এখন থেকে প্রায় ২২৯ বছর আগে। ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি (শনিবার) কলকাতা থেকে প্রকাশিত ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র হচ্ছে ‘বেঙ্গল গেজেট’ বা ‘ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভার্টাইজার’। এটি ছিল একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত এ পত্রিকাটির সম্পাদকও ছিলেন একজন ইংরেজ। তার নাম জেমস অগাস্টাস হিকি। ১৭৮০ সালে মুদ্রিত আকারে সংবাদপত্রের প্রকাশ ঘটলেও ভারতবর্ষের বাংলা অঞ্চলে প্রথম কবে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে ভারত-বাংলা অঞ্চলে সাংবাদিকতা কর্মের অস্তিত্ব খুবই প্রাচীন।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, সেই মৌর্য যুগে রাজদরবারে এক ধরনের রাজকর্মচারী ছিল যারা রাজ্যের নানা জায়গা থেকে খবরাদি সংগ্রহ করত। এদের বলা হতো প্রতিবেদক। তাদের কাজটি ছিল আজকের যুগের রিপোর্টারদের কাজ, যেন এ যুগের সাংবাদিকতার কাজ। এক কথায় আমরা বলতে পারি যে, খ্রিস্টের জন্মের আগেও এ অঞ্চলে সাংবাদিকতা কাজের প্রচলন ছিল। তবে বাংলা অঞ্চলে সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতা তথা সংবাদপত্রের প্রচলন ঘটেছে ব্রিটিশ আমলে। ভারত-বাংলা অঞ্চলের আধুনিক সাংবাদিকতার ভিত তাই ব্রিটিশ আমলেই প্রোথিত।

ভারত উপমহাদেশে প্রেস বা ছাপাখানা স্থাপন এবং সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগটি গৃহীত হয়েছিল (১৭৬৮ সালে) একজন ইংরেজ দ্বারা। তিনি ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী। নাম ছিল উইলিয়াম বোল্টস। কোম্পানি আমলে ইংরেজদের মূল লক্ষ্য ছিল এ অঞ্চল থেকে অর্থ উপার্জন করা। মূলত নীল চাষের মাধ্যমেই তা বেশি মাত্রায় করা হতো। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোম্পানি ছাড়াও কোম্পানির কর্মচারীরাও ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্নভাবে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত হয়ে পড়ত। এমন একজন কর্মচারী ছিলেন উইলিয়াম বোল্টস। কোম্পানির এক সময় ধারণা জন্মায় যে, উইলিয়াম বোল্টস নিজ স্বার্থের জন্য দেশীয় নবাব এবং ওলন্দাজ বণিকদের সঙ্গে বেআইনিভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করে কোম্পানির স্বার্থ বিঘ্নিত করার কাজে লিপ্ত এবং এর মাধ্যমে তিনি বরং নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। সে কারণে তারা তাকে একপর্যায়ে কোম্পানির চাকরি থেকে বহিষ্কার করল। তখন বোল্টস সাহেব উদ্যোগ নিলেন তিনি কলকাতায় একটি প্রেস বসাবেন এবং সেখান থেকে একটি পত্রিকা বের করবেন। এ ব্যাপারে কলকাতা কাউন্সিল হলে হাতে লিখে একটি বিজ্ঞাপনও সেঁটে দিলেন এবং তাতে উৎসাহী সংশ্লিষ্ট যারা ছাপানোর কাজ চালাতে সক্ষম তাদের তার সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানালেন। তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে যারা উৎসাহী তাদেরও তার বাড়িতে এসে ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরাখবর নিয়ে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত পুস্তক-পুস্তিকা, কাগজপত্র পড়ার অনুরোধ জানালেন।

উইলিয়াম বোল্টস দীর্ঘদিন কোম্পানির কর্মচারী থাকায় তিনি কোম্পানির ভিতরের খবরাখবর জানতেন। তাই কোনোরকম ঝুঁকি না নিয়ে কোম্পানির লোকেরা তাকে মাদ্রাজে নিয়ে এসে জাহাজে করে সরাসরি দেশে (ব্রিটেনে) পাঠিয়ে দেয়। সংবাদপত্র প্রকাশের প্রথম উদ্যোগটি এভাবে পরিণতি পায়। এ ঘটনার এক যুগ পর ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় ভারতের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র ‘বেঙ্গল গেজেট’ বা ‘ক্যালকাটা জেনারেল অ্যাডভার্টাইজার’।

এখানে দুটো বিষয় লক্ষণীয়। একটি হচ্ছে উইলিয়াম বোল্টস কর্তৃক সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগটিই কিন্তু আদৌ আলোর মুখ দেখতে পারেনি। কারণ হচ্ছে কোম্পানির লোকদের ধারণা ছিল পত্রিকা প্রকাশিত হলে অনেক সময় তাদের ভিতরের অনেক বিষয় ফাঁস হয়ে যাবে যা তাদের বিব্রত অবস্থায় ফেলতে পারে। কাজেই শিশু জন্মানোর আগেই তাকে মেরে ফেলতে হবেÑ তারা সেই কাজটিই করলেন। ‘গণমাধ্যম এবং ক্ষমতাবান এ দুয়ের সম্পর্ক সব সময় সমান্তরাল নয় বরং অনেক সময় বৈরী এবং বিপরীত’ এ কথাটি সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগের দিন থেকে আজও সত্য হয়ে আছে। দ্বিতীয় ঘটনাটি হচ্ছে উপমহাদেশে প্রথম মুদ্রিত ও প্রকাশিত সংবাদপত্র হিকির গেজেটকে নিয়ে। ১৭৮০ সালে পত্রিকাটি প্রকাশের পর পরই সে সময়ের গভর্নর জেনারেল হেস্টিংস এবং হেস্টিংসের একজন বিচারপতি এলিজা ইম্পের সঙ্গে পত্রিকাটির বিবাদ শুরু হয়ে যায়। পত্রিকাটি এই দুজন ছাড়াও একপর্যায়ে মিসেস হেস্টিংসকে নিয়েও সত্য-মিথ্যা আবার অনেক সময় বানোয়াট খবর ছাপতে থাকে। এভাবে বছরদশেক টিকে থাকতে পারলেও একসময় এসে কর্তৃপক্ষীয় ক্রোধের কারণে পত্রিকাটির ডাক সুবিধা বাতিল, সম্পাদক হিকিকে কারাদণ্ড প্রদান এবং সর্বশেষ প্রেস বাজেয়াপ্ত করে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হলো। তাহলে আমরা জানতে পারলাম একটি পত্রিকার (প্রকাশের উদ্যোগ) মৃত্যু ঘটল জন্মের আগেই। আর এই উপমহাদেশের প্রথম প্রকাশিত পত্রিকার মৃত্যু ঘটল জন্মের মাত্র কয়েক বছরের মাথায়। এ ঘটনা থেকে গণমাধ্যম এবং ক্ষমতাধর এ দুপক্ষের সম্পর্ক উপলব্ধি করা যায়। তবে এটাও ঠিক যে, এ সম্পর্ক কিন্তু চিরায়ত এবং চিরসত্য। কোনো নির্দিষ্ট দেশে বা কোনো নির্দিষ্ট সরকার (ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ) কিংবা নির্দিষ্ট গণমাধ্যমকে এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় তা নয়। এ দুয়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু এবং ভারসাম্যপূর্ণ ব্যালেন্স ঘটিয়ে সাংবাদিকতা এবং ক্ষমতা পরিচালনা উভয় কাজকেই মূলত জনকল্যাণের কথা মাথায় রেখে এগিয়ে নিতে হবে।

হিকির গেজেট ছিল একটি সাপ্তাহিক এবং ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা। হিকির গেজেট প্রকাশের ৩৮ বছর পর ১৮১৮ সালের ২৩ মে ‘সমাচার দর্পণ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এটি ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা। কলকাতার অদূরে শ্রীরামপুর মিশনারির এক ইংরেজ জন ক্লার্ক মার্শম্যান এটির সম্পাদক ছিলেন। অনেকে এ পত্রিকাটিকে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা বলে থাকেন। এ নিয়ে ভিন্ন মতও রয়েছে। ২০১৮ সালে ২৫ জানুয়ারি কলকাতার দৈনিক আজকাল পত্রিকায় ‘প্রথম বাঙালি প্রকাশক ঠাঁই পাবেন মেলায়’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বাংলা ও তাবৎ ভারতীয় ভাষার মধ্যে যে বইটি আধুনিক ছাপাখানায় ছেপে বাজারে আসে তা হলো ‘অন্নদামঙ্গল’। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮১৬ সালে। প্রেস অব ফেরিস অ্যান্ড কোং থেকে ছাপানো বিদ্যা এবং সুন্দরকে নিয়ে রচিত এ বইটির লেখক ছিলেন ভারতচন্দ্র্র রায় গুনাকার। মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য। তিনি শ্রীরামপুর মিশন প্রেসের কম্পোজিটর হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। পরে অন্নদামঙ্গলের প্রকাশক হিসেবে এ অসামান্য কাজটি গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যই করেছিলেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত মনের আলাপ নামক একটি লিটল ম্যাগাজিনের ২০১৭ বর্ষপূর্তি সংখ্যায় পুলক মণ্ডল রচিত ‘বাংলা সংবাদপত্রের দুশো বছর : উপেক্ষিত নায়ক গঙ্গাকিশোর’ প্রবন্ধটিতে এসব তথ্য রয়েছে।

দৈনিক আজকাল পত্রিকার ২৫ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখের রিপোর্টটি থেকে জানা যায়, ‘বঙ্গাল গেজেটি’ নামে যে সাপ্তাহিক সংবাদপত্রটি বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার পাটুলী-বহরা গ্রামের বাসিন্দা গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য বের করেন সেটি শুধু বাংলায় নয়, ‘তাবৎ ভারতীয় ভাষার মধ্যে প্রথম প্রকাশিত সংবাদপত্র’। ১৮২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ নামক একটি ইংরেজি কাগজের প্রতিবেদনে গঙ্গাকিশোরের এরূপ স্বীকৃতি রয়েছে।

পরবর্তীকালে ১৮৫২ সালে ‘সংবাদপত্রের ইতিবৃত্ত’ বইটিতেও ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত এবং ১৮৫৫ সালে ‘ডেসক্রেপটিভ ক্যালকাটা অব বেঙ্গলি ওয়ার্কস’ বইটিতে ফাদার লং পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, গঙ্গাকিশোরের ‘বঙ্গাল গেজেটি’-ই বাংলা এবং তাবৎ ভারতীয় ভাষার প্রথম সংবাদপত্র।

১৮১৮ সালের ২৩ মে জন ক্লার্ক মার্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ’ কিংবা ওই একই বছর ১৪ মে থেকে ৯ জুলাই তারিখের মধ্যে যে কোনো একটি দিনে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘বঙ্গাল গেজেটি’ পত্রিকার কোনটি প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা এটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাংলা ভাষায় একজন বাঙালি কর্তৃক প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র যে ‘বঙ্গাল গেজেটি’ এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। ফাদার লং কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের লেখাতে ‘বঙ্গাল গেজেটি’-কে বাংলা তথা তাবৎ ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হিসেবেই দাবি করা হয়েছে।

 

লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মন্তব্য