শিরোনাম
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ২২:৪৬
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:০২
প্রিন্ট করুন printer

পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানিকে আনতে বাধা কেন?

অনলাইন ডেস্ক

পুঁজিবাজারে ভালো কোম্পানিকে আনতে বাধা কেন?
ফাইল ছবি

সরকারি ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডকে পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ দিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের আবেদনকে উপেক্ষা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

বিজয় দিবসের ছুটির মধ্যে ইস্যুকৃত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এই চিঠি ব্যাংকিং সেক্টরের প্রাইমারি রেগুলেটর বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সংক্রান্ত নির্দেশনাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রক্রিয়াধীন এই ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের আবেদনটি যাচাই-বাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিএসইসির এই স্থগিত করার নির্দেশকে স্বায়ত্বশাসিত এক্সচেঞ্জের অভ্যন্তরীণ কর্মপ্রক্রিয়ায় অবাঞ্চনীয় হস্তক্ষেপ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং রুলস অনুযায়ী, যেকোনো লিস্টিংয়ের বিষয়ে আইনের ধারার ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদকে দেওয়া আছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পরিচালক এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা বেস্ট হোল্ডিংসের ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সরকারের ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্নয়নকে সহযোগিতা করার পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করছি। দিনের শেষে স্বতন্ত্র বোর্ড তার বিবেচনায় যেটি পুঁজিবাজার এবং দেশের স্বার্থে ভালো হবে, তাকেই প্রধান্য দিয়ে কমিশনকে জানানো হবে। এটাই নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। অথচ আমাদের এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ করে আমাদেরই আভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণগুলোকে চিঠিতে তুলে দিয়ে স্থগিতাদেশ আশ্চর্য ব্যাপার। আমাদের জানা মতে, বিএসইসি এই ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের বিষয়ে শুরু থেকেই সম্পূর্ণভাবে অবহিত।’

বিষয়টি এমন না যে আগে কোনো কোম্পানিকে ডিরেক্ট লিস্টিং করে ডিএসইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এর আগেও আরো অনেক কোম্পানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এগুলো হলো-ডেসকো (১৮.০৬.০৬), পাওয়ার গ্রিড বিডি লিমিটেড (১৮.০৫.০৬), যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (১৮.১১.০৭), মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (১৪.১১.০৭), তিতাস গ্যাস (০৯.০৬.০৮), নাভানা সিএনজি লিমিটেড (২৬.০৭.০৯), সাইনপুকুর সিরামিক্স (৩০.১০.০৮), এসিআই ফরমুলেশান্স (৩০.১০.০৮), ওশেন কন্টেইনার্স লিমিটেড (২২.০২.১০) ও খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (১৫.০৩.১০)।

সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর পাঠানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, কমিশনের ২০১৬ সালের একটি নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকারের মালিকানাধীন ব্যতীত অন্য কোনো কোম্পানির ক্ষেত্রে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের প্রভিশন কাজে লাগাতে পারবে না দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ। অর্থাৎ বিএসইসির নির্দেশনা অনুসারে সরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যতীত কোনো বেসরকারি কোম্পানির ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আইনি সুযোগ নেই।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বেস্ট হোল্ডিংসের ৫২ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ মালিকানা রয়েছে ব্যক্তি ও কিছু প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির হাতে। আর বাকি ৪৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মধ্যে ২৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত চার ব্যাংকের হাতে। এর মধ্যে সোনালী ও জনতা ব্যাংকের কাছে রয়েছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ হারে। আর অগ্রণী ব্যাংকের কাছে ৬ দশমিক ৬২ ও রূপালী ব্যাংকের কাছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চলতি বছরের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দেশনা জারি করে। চলতি বছরের ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিওএস সার্কুলার ইস্যুকৃত নির্দেশনায় বলা হয়, যে সকল অবকাঠামোগত প্রকল্প বা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ইক্যুইটিতে ব্যাংকের বিনিয়োগ আছে তাদের জরুরি ভিত্তিতে ৬ মাসের মধ্যে ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। বেস্ট হোল্ডিং লিমিটেডে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের আবেদন এ সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনেই করা হয়েছে।

জানা যায়, পুঁজিবাজারের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য ব্যাংকগুলো তাদের হোল্ডিংয়ের প্রথম বছর ৫ শতাংশ বিক্রি করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইস্যুকারী ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানিকে তার আয় থেকে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এতে আরো বলা হয়েছে, ডিরেক্টর লিস্টিং পদ্ধতিতে বিক্রিত শেয়ারের মূল্য বিনিয়োগকারী ব্যাংকের বিনিয়োগ মূল্য হতে কম হতে পারবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্দেশনাকে সমর্থন করে অর্থমন্ত্রী এ বছরের ৮ সেপ্টেম্বর দুই নীতি নির্ধারক বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনকে নির্দেশ দেন।

এরই ধারাবাহিকতায় বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেড ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকারী ব্যাংকগুলোর শেয়ার হোল্ডিংয়ের ৫ শতাংশ বিক্রির মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আবেদন করে। 

ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি হিসেবে ডিরেক্ট লিস্টিং রুলসে কিছু ছাড় চাওয়া হয়েছে, যা কিনা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পর্ষদকে পক্ষে দেওয়ার ক্ষমতা আইনেই আছে। যদিও মূল আইনে বলা উল্লেখ নেই, শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্ত হতে পারবে তবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে এই বিষয়ে এই নির্দেশনা জারি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘পুঁজিবাজারকে রক্ষা করতে সবসময় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংককে বিভিন্ন ছাড় এবং প্রণোদনা চেয়ে আবেদন করছেন। এই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত নমনীয় এবং অনেকগুলো ছাড় ও প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। অথচ ব্যাংকের ঝুঁকি কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক যখন ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশনা দিলো সেখানে বাংলাদেশ সিডিকউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের আপত্তি আসল। এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং দুই রেগুলেটরের সমন্বয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের উন্নতির পরিপন্থি। আমরা আশা করবো বাংলাদেশ সিডিকউরিটজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আমাদের এই নির্দেশনার বিষয়ে নমনীয় হবেন।’

পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এই ধরনের হস্তক্ষেপ করছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএসইসির একজন কর্মকর্তা জানান। কিন্তু কি ধরনের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে তার ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। 

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র এ বিষয়ে বলেন, ‘ভালো কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে খুব কমই আসছে, এটাই আমাদের মতো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ ধরনের অনেক কোম্পানি রেগুলেটরি অনুমোদন করছে। যেখানে লিস্টিংয়ের পর থেকেই কোনো ডিভিডেন্ড পাওয়া যায় না। অথচ একটা ভালো ইনফ্রাস্ট্রাকচার কোম্পানি যেখানে কিনা এতগুলো সরকারি ব্যাংক যাচাই-বাচাই করে বিনিয়োগ করলো এবং যার থেকে বছর বছর ধরে ডিভিডেন্ড পাওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত করা হয়েছে সেটা পুঁজিবাজারে আনতে এত বাধা কেন বুঝলাম না। আমাদের নীতি নির্ধারকরা পাঞ্জা লড়াই না করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কথা ভেবে এ ধরনের কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করার সুযোগ করে দেবেন বলে আশা রাখি। আমরাও দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের অংশীদার হতে চাই।’

বিডি প্রতিদিন/এমআই


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর