২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৯:৩৭

বিটুমিনের সনদ জালিয়াতি: এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল, আমদানিকারকের জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিটুমিনের সনদ জালিয়াতি: এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল, আমদানিকারকের জরিমানা

মান সনদ জালিয়াতি করে আমদানিকৃত নিম্নমানের বিটুমিন ছাড়িয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ‘সানশাইন এজেন্সি’র লাইসেন্স বাতিল করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস। একইসঙ্গে আমদানিকারক ঢাকার ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’- এর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে মোট ৫০ লাখ টাকা।  

জাল সনদ দিয়ে নিম্নমানের বিটুমিন ছাড়ের বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেন কাস্টমস কমিশনার। তদন্ত রিপোর্ট কমিশনারের দপ্তরে জমা হয় গত ৮ আগস্ট। আমদানিকারক দোষ স্বীকার করার পরই এই আদেশ দিয়েছেন কাস্টমস কমিশনার।  

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের লাইসেন্স ইতোমধ্যে বাতিল করা হয়েছে। আর জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আমদানিকারককে শোকজ করা হয়েছিল। জবাব পাওয়ার পর তাকে (আমদানিকারক) শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দোষ স্বীকার করায় চালানটির ন্যায়নির্ণয় করে ৪০ লাখ টাকা ব্যক্তিগত এবং আরো ১০ লাখ টাকা বিমোচন জরিমানা করা হয়েছে।  

কাস্টমস কমিশনার আরও বলেন, উচ্চ আদালত থেকে আমদানিকারক আদেশ এনেছেন অন্য প্রতিষ্ঠান-বুয়েট ও বিএসটিআই থেকে বিটুমিনের মান পরীক্ষা করার। আইন অনুযায়ী মোট তিনটি প্রতিষ্ঠান থেকে মান পরীক্ষা করে যাচাইয়ের সুযোগ আছে। এখন অন্য প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট পেলেই পণ্যছাড়ের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে চট্টগ্রাম কাস্টমসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বিটুমিনের মান পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর একাধিক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয়বার পরীক্ষার জন্য বিএসটিআই এবং বুয়েটে নমুনা পাঠিয়েছিল। এর মধ্যে মাইশা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানিকৃত বিটুমিনের নমুনার প্রথম মান পরীক্ষা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে হয়েছিল। সেখানে রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর পুনরায় নমুনা পরীক্ষার জন্য বিএসটিআই এবং বুয়েটে পাঠায়। দ্বিতীয় পরীক্ষার রিপোর্ট কাস্টমসে জমা হয়েছে। রিপোর্টে দেখা যায়, ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো বিএসটিআই এবং বুয়েট রিপোর্টও নেগেটিভ এসেছে।

কর্মকর্তারা আরও জানান, এখন মাইশা এন্টারপ্রাইজ মান উত্তীর্ণ না হওয়া এসব বিটুমিন ছাড় করার জন্য ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছে। মাইশা এন্টারপ্রাইজের মতো কয়েকজন আমদানিকারক মান উত্তীর্ণ না হওয়া বিটুমিনের চালান খালাসে কৌশল অবলম্বন করছে।  

উল্লেখ্য, জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া মান সনদ জমা দিয়ে আমদানিকৃত বিটুমিনের একটি চালান খালাসের সময় চট্টগ্রাম কাস্টমসের হাতে ধরা পড়ে গত জুনে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ঢাকার ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’। প্রতিষ্ঠানটি ১০ হাজার টন বিটুমিনের চালান ছাড়ের জন্য ভুয়া মানসনদ তৈরি করে চট্টগ্রাম কাস্টমসে জমা দিয়েছিল। ৭২ লাখ টাকার শুল্ক পরিশোধ করে ৫০ কন্টেইনারের মধ্যে ৯টি কন্টেইনার বিটুমিন গত ২৮ জুন ছাড়ও করে নেয়। এরইমধ্যে অভিযোগ পেয়ে সনদ যাচাই করতে গিয়ে জালিয়াতি ধরা পড়ে। এরপরই ৫০ কন্টেইনারের পুরো চালানটি আটক করে কাস্টমস। একদিন পরই ছাড় হওয়া বিটুমিন ভর্তি কন্টেইনারগুলো বন্দরে ফিরিয়ে এনে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো সিসিটিসিএল-এ আটক রাখা হয়েছে।

জালিয়াতির মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির কোয়ালিটি কন্ট্রোলের প্রধান জাহেদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের মান পরীক্ষার যন্ত্রটি সম্পূর্ণ অটোমেটিক এবং সবচে আধুনিক। আমাদের নমুনা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সময় লাগে দুই ঘণ্টা কিন্তু মেশিনে এটি পরীক্ষা করতে লাগে ৪/৫ মিনিট। আর বিটুমিন পরীক্ষার কাজটি আমরা নিজেরাই করে থাকি। যন্ত্রটি এতটাই আধুনিক সেখানে ম্যানিপুলেশনের কোনো সুযোগ নেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের মান সনদ জালিয়াতি করায় আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এজন্য আমরা তাদের কঠোর শাস্তি চাই। যাতে আর কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।  

এদিকে, নিম্নমানের আমদানিকৃত বিুটমিন ছাড় করার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনারকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় থেকেও ওই তদবির করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে, জাল সনদ জমা দেওয়া চালানটি কিভাবে ছাড় দেওয়া যায় তার একটি কৌশল বের করা।  

এ বিষয়ে কাস্টমস কমিশনার ফখরুল আলম বলছেন, ভেতরে-বাইরে চাপ থাকলেও কিছু করার নেই। আইনের বাইরে তো আমার যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।  

উল্লেখ্য, দেশে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতদিন বিটুমিন আমদানি হলেও মান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। ফলে অহরহ নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি হচ্ছিল; কোনোভাবেই সেটি ঠেকানো যাচ্ছিল না। এতে করে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণে হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছিল সরকারের। সর্বশেষ গত ২৫ মে বিটুমিনের মান নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তিনটি নির্ধারিত ল্যাবে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে। এরপর থেকেই মূলত নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির চক্রটি বিপাকে পড়ে। মান যাচাই বাধ্যতামূলক করার পর জুন মাসেই প্রথম নিম্নমানের বিটুমিনের চালান ধরা পড়লো কাস্টমসের হাতে।  

নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে আমদানিকারক ঢাকার ‘ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড’ ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্মকর্তার স্বাক্ষর-প্যাড জালিয়াতি করে ভুয়া মানসনদ চট্টগ্রাম কাস্টমসে জমা দিয়ে বিটুমিন চালান ছাড় নিতে চেয়েছিল। কার যোগসাজশে চালানটি ছাড় হয়েছে তা জানতে কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ শফিউদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সান শাইন এজেন্সি’র জালিয়াতির প্রমাণ পায়।  

আর রিপোর্টে ইস্টার্ন রিফাইনারি কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল ছিল কিনা নিশ্চিত হতে তদন্ত কমিটি পুলিশের সিআইডি এক্সপার্টদের সহযোগিতা নেয়। সিআইডি বিশ্লেষণ করে জাল স্বাক্ষরের বিষয়টি নিশ্চিত করে। আর এই জালিয়াতি কাজের পুরোটাই নেতৃত্বে ছিল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সান শাইন এজেন্সি।

জালিয়াতির কারণে লাইসেন্স সাসপেন্ড হওয়া সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সান শাইন এজেন্সির মালিক মাহমুদ রেজা বলেন, ‘আপনাদের কাছে কে এসব তথ্য দেয়? আমি তো এখনো লাইসেন্স নিয়ে কাজ করছি। বিটুমিন চালানে জাল সনদের বিষয়ে জড়িত থাকার কথা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আপনি প্লিজ এসব বিষয়ে আমদানিকারকের সঙ্গে কথা বলেন। আমদানিকারক ডকুমেন্ট দিয়েছে আমরা সে অনুযায়ী পণ্য ছাড় করেছি। এর বাইরে কিছু থাকলে আমদানিকারকই জানবেন।  

বিটুমিনের দুটি বড় চালান এলো বন্দরে 

হঠাৎ করে বেড়ে গেছে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি। চট্টগ্রামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এসব নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম বন্দরের ৯ নম্বর জেটিতে নোঙ্গর করেছে এমভি নিগার নামের একটি ইরানি পতাকাবাহী কার্গো জাহাজ। এই জাহাজটিতে ২৬২ কন্টেইনার বিটুমিন রয়েছে। আমদানিকারক চট্টগ্রামের জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স এবং হাসান কনস্ট্রাকশন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান। এছাড়া এমটি ওয়াইএলডাব্লিউ নামের আরেকটি জাহাজে (বাল্ক) ৫ হাজার ৩৩৮ মেট্রিক টন তরল বিটুমিন আমদানি করেছে পিএইচপি স্পিনিং মিল লিমিটেড।  

কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, পিএইচপি স্পিনিং মিল লিমিটেড পণ্য খালাসের জন্য বিল অব এন্ট্রি জমা দিয়েছে। তবে আমদানিকারক জাহাঙ্গীর অ্যান্ড আদার্স এবং হাসান কনস্ট্রাকশন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান এখনো বিল অব এন্ট্রি জমা দেয়নি।  

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত

এই বিভাগের আরও খবর