Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:২১
আপডেট : ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ২১:৪৫

হাউস অব কমন্স এর ভূতুড়ে প্রতিবেদন ও সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব

এম সানজীব হোসেন

হাউস অব কমন্স এর ভূতুড়ে প্রতিবেদন ও সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব
প্রতীকী ছবি

মোবাইল ফোনে একটি দৈনিক পড়ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়লো ওই দৈনিকের একটি প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম, ‘হাউস অব কমন্সের প্রতিবেদন: দাবি পূরণ ছাড়া বিএনপির ভোটে আসা ছিল অপ্রত্যাশিত’।[১]

শিরোনামটি দেখে খটকা লাগলো। প্রায় দুই বছর ধরে আমি যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন সেশনাল টিউটর হিসেবে স্নাতক ছাত্র-ছাত্রীদের ‘জেনারেল প্রিন্সিপালস অব কন্সটিটিউশনাল অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ল’ পড়াচ্ছি। হাউস অব কমন্স হচ্ছে যুক্তরাজ্যের সংসদের নিম্নকক্ষ বা লোয়ার হাউস। বিএনপি ও বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে ‘হাউস অব কমন্স’ একটি প্রতিবেদন ছাপিয়ে ফেলেছে – যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক আইন পড়ানোর অভিজ্ঞতার কারণে তা বিশ্বাস হচ্ছিলো না।

দ্রুত প্রতিবেদনটি পড়লাম। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন লন্ডনে অবস্থানরত জনাব তবারুকুল ইসলাম। ফেইসবুকে তিনি নিজেকে ওই দৈনিকের লন্ডন করেসপন্ডেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।[২]

প্রতিবেদনের শুরুতেই জনাব ইসলাম জানাচ্ছেন:

“বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারে-কাছেও নেই বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স। এক প্রতিবেদনে হাউস অব কমন্স এই মন্তব্য করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ণ তীব্র রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে হাউস অব কমন্স বলেছে, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আয়োজনসহ কোনও দাবি পূরণ না হওয়া স্বত্বেও নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের ঘোষণা অপ্রত্যাশিত।”

এর পর জনাব ইসলাম লিখেছেন:

“বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সের এই প্রতিবেদন ‘রিসার্চ ব্রিফিং’ নামে পরিচিত। দেশটির এমপিদের অবগতির জন্য এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।”

তিনি আরো জানাচ্ছেন-

“হাউস অব কমন্সের এই প্রতিবেদনে বিএনপির দাবি-দাওয়া, খালেদার মামলা ও সাজা, সংলাপের আয়োজনসহ সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে।”

ওই প্রতিবেদনে অন্তত ছয়বার দাবি করা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স-এর। এই প্রতিবেদনের পঙ্‌ক্তি পড়ে পাঠকদের এমনটাই ভাবা স্বাভাবিক যে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স একটি ‘রিসার্চ ব্রিফিং’ প্রকাশ করেছে যেখানে  হাউস অফ কমন্স তার বক্তব্য তুলে ধরেছে। বক্তব্যের মূলমন্ত্র হচ্ছে এই যে “বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারে-কাছেও নেই”।

প্রিয় পাঠক, আপনাদের স্পষ্টভাবে জানাচ্ছি যে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স কোনও ‘রিসার্চ ব্রিফিং’ প্রকাশ করেনি।

নভেম্বর ২৯, ২০১৮ তারিখে যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’ একটি ‘ব্রিফিং পেপার’ প্রকাশ করে, যার নাম ‘Bangladesh: November 2018 update’।[৩]

‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’ হচ্ছে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স-এর একটি স্বাধীন তথ্য ও গবেষণা ইউনিট। এ কথা তার ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবেই বলা আছে।[৪]

এখানে আরো উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ‘Bangladesh: November 2018 update’ শিরোনামের ব্রিফিং পেপারটি হাউস অব কমন্স রচনা করেনি, এমনকি হাউফ অব কমন্স-এর কোন সংসদ সদস্যও রচনা করেননি। ব্রিফিং পেপারটি রচনা করেছেন জনাব জন লান (Jon Lunn), যিনি হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির একজন সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট।[৫]

এরকম অসংখ্য ব্রিফিং পেপার বা রিসার্চ ব্রিফ যুক্তরাজ্যের হাউস অফ কমন্স লাইব্রেরি, হাউস অব লর্ডস লাইব্রেরি ও পার্লামেন্টারি অফিস অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কর্মকর্তারা নিয়মিত ভিত্তিতে রচনা ও প্রকাশ করে থাকেন।

নভেম্বর ২৯, ২০১৮ তারিখে ‘Bangladesh: November 2018 update’ সহ মোট ৫টি ব্রিফিং পেপার প্রকাশিত হয়েছে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি থেকে।[৬]

বাকি ব্রিফিং পেপারগুলোর বিষয়বস্তু ছিল উত্তর আফ্রিকা, জলবায়ু পরিবর্তন, যুক্তরাজ্যের গৃহায়ণ প্রকল্প ও উইল লেখকদের বিধিনিয়ম।

২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে যখন আমার পিএইচডি সংক্রান্ত গবেষণা করছিলাম তখন আমাদের ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কিত এমন বেশ কিছু ব্রিফিং পেপার পড়েছিলাম।[৭] এগুলো লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাজ্যের সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে অবগত করা যাতে তারা প্রয়োজনে এইসব ব্রিফিং পেপার বা রিসার্চ ব্রিফ পড়ে একটি অবস্থান গ্রহণ করতে সক্ষম হন, যা পরবর্তীতে হাউস অব কমন্স বা হাউস অব লর্ডস-এর সভায় আলোচনা ও ঐকমত্যে পোঁছার পর ওই দুটি সভার ভাষ্য হিসেবে পরিচিতি পাবে। একারণেই জনাব জন লান রচিত ‘Bangladesh: November 2018 update’ এর শেষ পৃষ্ঠায় ‘Disclaimer’-এর নিচে বলা আছে:

“This information is provided to Members of Parliament in support of their parliamentary duties. It is a general briefing only and should not be relied on as a substitute for specific advice. The House of Commons or the author(s) shall not be liable for any errors or omissions, or for any loss or damage of any kind arising from its use, and may remove, vary or amend any information at any time without prior notice.”[৮]

সহজ ভাষায় আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হলো, হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট জন লান রচিত ব্রিফিং পেপার কখনোই যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স-এর প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হবে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ‘প্রিন্সিপাল অব পার্লামেন্টারি সভেরিনিটি’, যা যুক্তরাজ্যের সংবিধানের অন্যতম মূলমন্ত্র হিসেবে পরিচিত। প্রিন্সিপাল অব পার্লামেন্টারি সভেরিনিটির কারণেই যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টকে সার্বভৌম ভাবা হয়। এই কারণেই পার্লামেন্টের ক্ষমতা আছে ইচ্ছেমত আইন সৃষ্টি বা বাতিল করার। ফলে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ওয়েবসাইট জানাচ্ছে:

“Parliamentary sovereignty is a principle of the UK constitution. It makes Parliament the supreme legal authority in the UK, which can create or end any law. Generally, the courts cannot overrule its legislation and no Parliament can pass laws that future Parliaments cannot change. Parliamentary sovereignty is the most important part of the UK constitution.”[৯]

তাই যখন হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির একজন সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট একটি ব্রিফিং পেপার রচনা করবেন, ‘প্রিন্সিপাল অব পার্লামেন্টারি সভেরিনিটি’র আলোকে সেই ব্রিফিং পেপার ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’র ব্রিফিং পেপার হিসেবে বিবেচিত হবে, এবং তা কখনওই হাউস অব কমন্স বা যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ব্রিফিং পেপার বা প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হবে না। প্রয়োজনে হাউস অব কমন্স একটি সার্বভৌম সত্তা হিসেবে অবশ্যই সেই ব্রিফিং পেপার পড়বে এবং তার সাথে সাথে আরো বহু তথ্য-উপাত্ত ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেয়ার পর তার নিজস্ব বক্তব্য প্রকাশ হিসেবে করবে।

‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’র ব্রিফিং পেপার যেকোনও অবস্থাতেই হাউস অব কমন্স বা হাউস অব লর্ডস-এর প্রতিবেদন হিসেবে বিবেচিত হবে না, এই বিষয়টি নিয়ে আমি ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবিধানিক আইনের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকের সাথে আলোচনা করেছি। প্রিয় পাঠক, আপনাদের আশ্বস্ত করছি, আমার ব্যাখ্যায় কোনও ভুল নেই।

বাংলাদেশের নির্বাচনী মাঠে সবার সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই, এমন কোনও কথা যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স’ বলেনি। কথাগুলো বলেছেন জন লান, যিনি ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’র একজন সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট। দৈনিকটির হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির একজন সিনিয়র রিসার্চ অ্যানালিস্ট-এর বক্তব্যকে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স- এর বক্তব্য হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন, যা শুধু ভুল নয়, অনৈতিকও বটে।

পাঠক, সেই প্রতিবেদনের শুরুতেই হাউস অব কমন্স-এর ছবি দেয়া হয়েছে। যেন এই ধারণাই দেয়া হচ্ছে যে, হাউস অব কমন্স-এর সভাকক্ষেই বর্ণিত ব্রিফিং পেপারটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাঠককে বিভ্রান্ত করার এমন কৌশল কোনওভাবেই কাম্য নয়।

প্রতিবেদক এবং ওই দৈনিকটিকে বলবো, এমন স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ব্যাপারে আপনাদের আরো অনেক যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। একজন সাধারণ নাগরিক ও পাঠক হিসেবে বাংলাদেশের একটি অন্যতম দৈনিকের কাছ থেকে আমরা যৎসামান্য পেশাদারিত্ব আশা করতেই পারি। সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

সূত্র:

[১] তবারুকুল ইসলাম, ‘হাউস অব কমন্সের প্রতিবেদন দাবি পূরণ ছাড়া বিএনপির ভোটে আসা ছিল অপ্রত্যাশিত’ 

[২] Md Tabaruqul Islam https://bit.ly/2KIbuFg

[৩] Jon Lunn, ‘Bangladesh: November 2018 update’ (House of Commons Library, 29 November 2018) https://bit.ly/2zyL0la

[৪] ‘The Commons Library and its research service’ https://bit.ly/2mjDdRu। এখানে স্পষ্টভাবেই বলা আছেঃ “The House of Commons Library is an independent research and information unit.”

[৫] Jon Lunn, ‘Bangladesh: November 2018 update’ (House of Commons Library, 29 November 2018) https://bit.ly/2zyL0la

[৬] ‘Commons Briefing Papers’ https://bit.ly/2TYlHlr

[৭] Jon Lunn and Arabella Lang, ‘Bangladesh: the International Crimes Tribunal’ (House of Commons Library, 3 May 2012) https://bit.ly/2Q4U5Na

[৮] Jon Lunn, ‘Bangladesh: November 2018 update’ (House of Commons Library, 29 November 2018) https://bit.ly/2zyL0la

[৯] ‘Parliament’s authority’ https://bit.ly/2ffJGuN

বিডি প্রতিদিন/১ ডিসেম্বর ২০১৮/আরাফাত


আপনার মন্তব্য