শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ মার্চ, ২০২১ ১৮:৫৭
প্রিন্ট করুন printer

কৃতজ্ঞতা, তবে শঙ্কা চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের জন্য

রিয়াজ হায়দার চৌধুরী

কৃতজ্ঞতা, তবে শঙ্কা চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের জন্য

চট্টগ্রাম সিটির ৭ বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টুর মৃত্যুতে 'প্যানেল মেয়র' নির্বাচন স্থগিত করেছেন মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরী। কৃতজ্ঞতা, প্রিয় মেয়র। শোকের খবরটি পেয়েই বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণে লিখেছিলাম। 

চট্টল মেয়র শহরে একজন আদি বাসিন্দা এবং বনেদি পারিবারিক ঐতিহ্যের মানবিক মানুষ। তিনি নগরবাসীর নার্ভ বুঝেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা মেয়র কিংবা জননেতাদের 'পান থেকে চুন খসলে'ই সামাজিক মাধ্যম ভাসিয়ে দেন, তাদের কাউকেই এ বিষয়টি নিয়ে একটি বাক্য লিখে মেয়র কিংবা চসিক পর্ষদের প্রশংসা করতে দেখলাম না । 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কী তবে নিছক সমালোচনার জন্য? শহরের ৬ জন মেয়রকেই খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। কারো সাথে রাজনৈতিক সাংগাঠনিক, কারো সাথে পেশাগত কারণে সম্পর্কের বিস্তৃতি। চট্টগ্রামের মেয়রদের একেকজনের সময়কাল এক এক মাত্রায় ছন্দময়। এক এক কালে মানুষের বলয়, বিস্তৃতির রকমফের। তাদের অনেকগুলো ভালো কাজ গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে ইতিবাচকতার আলো পায়নি।

আবার কোন কোন খারাপ কাজও ধামাচাপা পড়ে গেছে। নানা কারণে এমনটি হয়েছে। সে সব কারণ আপাত বিশ্লেষণ না করলেও একথা নিশ্চিত বলতে পারি, এর দায় আমাদের সবারই। কেবল সমালোচনা। কেবল ঈর্ষাতেই আমরা যেন মশগুল। এই যেন রাজনীতি ও সমাজের রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সার্বিক বিশ্লেষণে বলা যায়, নাগরিক সমাজের মন-মানসিকতা ক্রমশ যেন আত্মকেন্দ্রিকতা দলবাজি আর আভ্যন্তরীণ গ্রুপিংয়ের ঘেরাটোপে বন্দি হচ্ছে। দু একটি উদাহরণ দেয়া যাক। যেমন, চট্টগ্রামের প্রথম 'বিজয়মেলা'র গোড়াপত্তন করেন নাগরিক সমাজ। বীর মুক্তিযোদ্ধা কবি সাংবাদিক লেখক সাংস্কৃতিক সংগঠকরাই এর উদ্যোগে ছিলেন। নেপথ্যে অবশ্যই রাজনৈতিক শক্তি ছিল। দু বছর না যেতেই সেই উদ্যোগের হাল ধরেন সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা-জননেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। 

নিছক আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে নয়, মুক্তি সংগ্রামী হিসেবেও এক্ষেত্রে তার দায়বোধ ছিল। মত পার্থক্যের কারনে কেউ কেউ তার এমন কর্তৃত্ব নিয়ে এতদিন পরেও প্রশ্ন তোলেন। 

একথা অনস্বীকার্য যে এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী সে সময় মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার হাল ধরে প্রায় তিন দশকের ধারাবাহিকতা অব্যাহত না রাখলে তবে হয়তো এতদিনে সেই মেলার অস্তিত্বই না থাকার আশঙ্কা তৈরি হতো।চট্টগ্রামের এমন বহু ভাল উদ্যোগ সুশীল সমাজ কিংবা নাগরিক সমাজ ধরে রাখতে পারেননি। রাজনৈতিক চেতনার ডানায় ভর করে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সমন্বয় না হলে কোন বৃহত্তর আয়োজন সাধারণত টিকে থাকে না।

এই মেলার গোড়াপত্তনের সময়ে আরেকজন মেয়রের অবদান আমরা প্রায়ই ভুলে যায়! অনেকটা দলগত কারণেই এমনটি হয়েছে। মেলার সূচনালগ্নে মিউনিসিপ্যালিটির প্রথম মেয়র ছিলেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি সে সময়ের জাতীয় পার্টির চট্টগ্রাম শহরের সভাপতিও ছিলেন। তিনি মেয়র থাকাকালেই মেলার প্রথম দিকের উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন চসিকের নানা উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ দিয়েই। বিজয় মেলাকে উল্লেখযোগ্য প্রণোদনা দেন তিনি। এমনকি চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের ভিত্তি মূলেও তার অবদান ছিল। এজন্য তিনি পরবর্তীতে মামলার আসামিও হন। কিন্তু হাল আমলের নগরের 'ইতিহাস রচনাকারীরা' সাবেক এই মেয়রের এসব অবদানের কথা ভুলেও উচ্চারণ করেন না । 

কেউ দলগত কারণে কেউ গোষ্ঠীগত ঘেরাটোপ কিংবা আত্মকেন্দ্রিকতায় অতীতের প্রতি অবিচার করেন।

আরেকটি উদাহরণ দেয়া যাক। চট্টগ্রামের সদ্য সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই শহরবাসীর জন্য ঝুঁকি ও বিড়ম্বনার নাম ছিল বিলবোর্ড। বিলবোর্ডকে কেন্দ্র করে হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হলেও চসিকের ফান্ডে প্রত্যাশিত রাজস্ব জুটত না। সংবাদপত্রগুলো বিলবোর্ড নিয়ে অভিন্ন প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছিল। 

নাগরিক সমাজের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে মেয়র পদে দায়িত্ব নিয়েই প্রত্যাশিত পদক্ষেপটি নেন আ জ ম নাছির উদ্দিন। কিন্তু তাঁর বিদায়লগ্নে কিংবা বিদায়ের পরে লক্ষ্য করা গেছে, পাঁচ বছরের কার্যকালের সফলতা-ব্যর্থতার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেউ বিলবোর্ড উচ্ছেদে এই মানুষটির নির্লোভ কঠোর অবস্থান কিংবা এতো বড় সাফল্যের বিষয়ে তেমন ইতিবাচক যুথসই স্বীকৃতি দেননি। অনেকে এ নিয়ে কথা বলতেও যেন লজ্জা পান! সাবেক এই মেয়রের কাছ থেকে সংবাদমাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমের অনেকেই অনেক ভাবে উপকৃত ও লাভবান হয়েছেন। তাঁদেরও অনেকেই এক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা দূরে থাক, যেন 'চেয়ারে নেই, তাই এসব বলারও কোন দায়বদ্ধতা নেই' বলে ভাবছেন । সেই সময়কার খুব কাছে কাছে নিয়মিত থাকা অনেকে এর মধ্যে কেল্লা বদল করেছেন ! 

বলা যাক, বিএনপি সমর্থিত এম মনজুর আলমের কথা। তার সময়কালে নানামুখী চাপের মধ্যেও ধৈর্য ও সততার যে পরীক্ষা দিয়ে গেছেন তা কয়জন শহরবাসীই বা সচেতনতার সাথে উপস্থাপন করেন! 

বিএনপি'র আরেক নেতা চট্টগ্রামের দ্বিতীয় মনোনীত মেয়র মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন। দলগত বিভক্তির প্রভাব উপেক্ষা করলে একথা স্পষ্ট, যে কেউই স্বীকার করবেন তার প্রশাসনিক বিচক্ষণতা ছিল অনন্য ।

শহরবাসীর ভাগ্য উন্নয়নে সেবার দায়িত্ব পাওয়া এই জনপ্রতিনিধিদের কারো ক্ষেত্রেই সঠিক মর্যাদাটুকু দেননি এই শহরের অনেক দায়িত্বশীল। সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সিদ্ধান্তের বাইরে নাগরিক দায়বদ্ধতার পর্যায় বিবেচনাতেও এটি বলা চলেই। তাই নতুন মেয়রের জন্য শংকা জাগে। উদ্বিগ্ন হই। দল ও শহরবাসী- এই দুই আঙ্গিক থেকেই চট্টল মেয়রের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ। 
   
আশা করি, ভালো মন্দের বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যম,গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমের সহযোদ্ধারা আরো বেশি দায়িত্ববান হবেন। 

সামাজিক মাধ্যমের অপরিণামদর্শী ছোবল থেকে সবাইকে রক্ষা, রাজনৈতিক প্রশাসনিকভালো উদ্যোগগুলোর প্রশংসা এবং খারাপ পদক্ষেপ থেকে পরিত্রাণে নাগরিক দায়িত্ব রয়েছে। 

যে শহর কিংবা রাষ্ট্রের আলো-হাওয়া জল নিয়ে আমরা বেঁচে আছি, সেই শহর কিংবা রাষ্ট্রের জন্য এতোটুকুন দায় কি আমাদের থাকা উচিত নয়? আশা করি উন্নয়ন ও ভবিষ্যত প্রজন্মের স্বার্থে এর গুরুত্ব অনুধাবন করবো আমরা। 

লেখক: সহ-সভাপতি, বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন আহ্বায়ক, চট্টগ্রাম নাগরিক উদ্যোগ; সিন্ডিকেট সদস্য, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত

এই বিভাগের আরও খবর