Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২২ জুন, ২০১৯ ১২:১৬
আপডেট : ২২ জুন, ২০১৯ ১৪:২৯

পাখি পালকদের এক দুঃস্বপ্নের নাম 'ফেদার প্লাকিং'!

কৌশিক সরকার কাব্য:

পাখি পালকদের এক দুঃস্বপ্নের নাম 'ফেদার প্লাকিং'!

নিয়মিত পাখি পালন করেন, তাদের প্রায় সবাই ফেদার প্লাকিং (FEATHER PLUCKING) নামটির সাথে কমবেশি পরিচিত এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভুক্তভোগী। সরল ইংরেজি বাংলা করলে যা দাঁড়ায়, 'পালক তুলে ফেলা'। নাম সরল হলেও এর থেকে পরিত্রাণের উপায়টি কিন্তু বেশ জটিল!

ফেদার প্লাকিং নিয়ে বিশদ আলোচনার আগে একটা প্রচলিত ভুল ধারণা এবং এর প্রেক্ষিতে ভুল বা অযথা চিকিৎসার কথা তুলে ধরছি।

ফেদার প্লাকিং আসলে দু'রকম, 
১) পরিণত পাখি তাদের বাচ্চার পালক কামড়ে তুলে ফেলে এবং 
২) পাখি নিজেই নিজের পালক কামড়ে তুলে ফেলে।

প্রচলিত ভুলটা হয় প্রথম সমস্যায় এবং বেশীরভাগ সৌখিন পাখি পালনকারী এটিকেই 'ফেদার প্লাকিং ডিজঅর্ডার' হিসেবে ধরে নিয়ে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন! এবং প্রচলিত সে ব্যবস্থাপত্রে যে ওষুধ/সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয় সেটা মূলত দ্বিতীয় সমস্যার সমাধান! 

প্রথম উপসর্গটি আমরা দেখতে পাই পাখি যখন আমাদের এভিয়ারিতে বাচ্চা ফুটিয়ে, তার গায়ে সদ্য গজিয়ে ওঠা পালক কামড়ে তুলে ফেলে। আমাদের দেশে প্রচলিতভাবে সবাই ধরে নেয় এই কাজটি পাখি করছে মূলত ক্যালসিয়াম বা অন্যান্য খনিজের ঘাটতির কারণে। কিন্তু পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে এর কারণ আসলে ভিন্ন!

সম্ভাব্য দুটো কারণ তারা উল্লেখ করেন। এক- পাখি নতুন করে শারীরিক চাহিদা অনুভব করে নতুন করে বাচ্চা উৎপাদন করতে চায় তাই তারা আগের বাচ্চাদের বাসা (Nest) ছাড়তে বাধ্য করতে এমনটা করে। কিন্তু কমপক্ষে ৪ সপ্তাহ (কিছু পাখির ক্ষেত্রে বেশী) আগে এমনটা করা অস্বাভাবিক কারণ এতে তার বাচ্চার বেচে থাকার (Survival) সম্ভাবনা ক্ষীণ। এবং দুই- এটি নেহায়েত একটি বদঅভ্যস বা মুদ্রাদোষ (ক্ষেত্র বিশেষে কিছু প্রয়োজনীয় উপাদান কামড়ে না খেতে বা কামড়াতে না পারাও এর জন্য দায়ী বলে ধরা হয়, তবে তা সবই নেহায়েত অনুমান ছাড়া কিছু নয়)।

এমন অবস্থায় যা করণীয় তা হল -এমন পাখিদের দ্বারা ভবিষ্যতে বাচ্চা উৎপাদন থেকে বিরত থাকা অথবা দীর্ঘ বিরতির পরে তাদের আবার বাচ্চা উৎপাদন করতে দেওয়া। যদি এতেও স্বভাবে কোন পরিবর্তন না আসে তবে পুরুষ এবং স্ত্রী পাখিটি আলাদা আলাদা অন্য পাখির সাথে ব্রিডিং করিয়ে দেখা। এবং এই সমস্যা চলাকালে বাচ্চা সরিয়ে তাদের নিজে খাইয়ে (Handfeeding) বড় করে তোলা। তবে যারা বাচ্চা খাওয়াতে যথেষ্ট পারদর্শী নন তারা একটা টোটকা অবলম্বন করে থাকেন তা হল বাচ্চার পালকে হালকা অ্যাপল সাইডার ভিনেগার (ACV) লাগিয়ে দেন যাতে এর টক স্বাদ মা/বাবা পাখিকে বাচ্চার পালকে মুখ দেয়া থেকে বিরত রাখে কারণ এই স্বাদ তাদের অপছন্দের। 

এবারে আসি দ্বিতীয় ফেদার প্লকিং সমস্যায় যেটা আসলে প্রধান এবং অন্যতম ভয়াবহ সমস্যা এভিয়ান সেক্টরে যা Pterotillomania  নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে পাখি নিজেই নিজের শরীরের পালক কামড়ে উজাড় করে ফেলে, যেখানে পাখির চামড়া স্পস্ট দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই সমস্যাটি মূলত টিয়া প্রজাতির পাখিদের মধ্যে ব্যপকভাবে দেখা যায়। তবে অন্যান্য পাখির ক্ষেত্রেও এমনটা হতে পারে।

এর কারণ শারীরিক (physical) অথবা মানষিক (psychological)  দুটোই হতে পারে! তবে পাখির দেহে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম যৌগের অভাব (chelated calcium deficiency) এর অন্যতম প্রধান কারণ। 

শারীরিক কারণসমূহ: 
চামড়ার প্রদাহ (Skin infections), এলার্জি (আমাদের ব্যবহৃত এয়ার ফ্রেসনার, বডি-স্প্রে, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ধোঁয়া এমনকি রান্নার ধোয়া থেকে পাখির অ্যালার্জি হতে পারে), প্যারাসাইট ( Bird fleas, Feather lice, Feather mites ইত্যাদি), হরমোনজনিত সমস্যা, টিউমার/ক্যান্সার, আদ্রতা (পর্যাপ্ত আদ্রতার অভাবে চামড়া শুষ্ক হয়ে চুলকানি তৈরি হওয়া)। 

মানষিক কারণসমূহ: 
স্ট্রেস, একাকিত্ব, পর্যাপ্ত জায়গা এবং খেলনা না পাওয়া, রাতে ঠিকঠাক ঘুমাতে না দেয়া বা সময় মেনে না চলা, পর্যাপ্ত আলোবাতাস না পাওয়া, সেক্সুয়াল ফ্রাস্ট্রেশন (সময়মতো সঙ্গী না পাওয়া) ইত্যাদি।

এছাড়া হেভি মেটাল পয়েজনিং থেকেও পাখির মধ্যে এ সমস্যা হতে পারে যেমন, খাচায় ব্যবহৃত সীসা অথবা জিংক এর গ্যালভানাইজিং কামড়ে খেয়ে! কিছু কিছু ক্ষেত্রে এভিয়ান ডায়াগনোসিস-এ দেখা গিয়েছে মেটাল পয়েজনিং ট্রিটমেন্টের পরে ফেদার প্লাকিং-এর অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে গেছে।

আমাদের দেশে এভিয়ান সেক্টরে ডাক্তার পাওয়াই মুশকিল সেখানে এভিয়ান ডায়াগনস্টিক সুবিধাসম্পন্ন হসপিটালের শুধু স্বপ্নই দেখতে পারি আমরা। তাই নিজের পাখির রোগ এবং কারণ নির্ণয়ে আমরা যেন আরও সতর্কতা অবলম্বন করি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করে একে অন্যের পাশে থাকি। তাহলেই ধীরে ধীরে সঠিকভাবে এগিয়ে যাবে আমাদের এভিয়ান ইন্ডাস্ট্রি। সুস্থ থাকুক সবার শখের পাখি।

লেখক: সৌখিন পাখি পালক।


বিডি প্রতিদিন/হিমেল


আপনার মন্তব্য