Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:৩৪

৭০ বছর পর কলকাতায় এমভি ‘মধুমতি’

নিজামুল হক বিপুল

৭০ বছর পর কলকাতায় এমভি ‘মধুমতি’

আকাশ, সড়ক ও রেলপথে কলকাতা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কমবেশি সবার আছে। কিন্তু প্রমোদতরী বা বিশাল জাহাজে করে জলপথে কলকাতা যাওয়া? গেল সাত দশকে অমন অভিজ্ঞতা সম্ভবত খুব কম মানুষেরই হয়েছে। অভিজ্ঞতা হবেই বা কীভাবে! ঢাকা-কলকাতা জলপথে কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচলই তো করেনি সত্তরটি বছর।

নৌপথে ভ্রমণের সেই সুযোগটা এনে দিয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার। এরই অংশ হিসেবে ‘এমভি মধুমতি’ নামের জাহাজটি ২৯ মার্চ ঢাকা থেকে রওনা দেয় কলকাতায়। সেই জাহাজের যাত্রী হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল এই প্রতিবেদকের। ৬৫ ঘণ্টার সেই ভ্রমণের টুকিটাকি নিবেদন করছি এখানে।

আপনার যদি থাকে আগ্রহ আর ইচ্ছাশক্তি তাহলেই প্রমোদতরীতে ঢাকা থেকে কলকাতা যাবার আনন্দ ধরা দেবে ‘মম চিত্তে’। শুধু যে জাহাজে করে ছোট-বড় নদী পেরিয়ে হেলেদুলে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়া তা কিন্তু নয়, ভ্রমণের সময়ই উপভোগ করা যায় দৃষ্টিনন্দন সব প্রাকৃতিক দৃশ্য। দেখতে পাওয়া যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। জাহাজ থেকেই হয়তো চোখে পড়বে সুন্দরবনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ আর নানা প্রজাতির পাখি তো দেখা যাবেই।

 

যেভাবে যাত্রা

আগে থেকে কোনো প্রস্তুতিই ছিল না। ২৫ মার্চ শেষ বিকালে হঠাৎ করেই নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পেলাম ফোন। অনুরোধ করা হয়- আপনার পাসপোর্ট দ্রুত বিআইডব্লিউটিসিতে পৌঁছে দেন। সেখানে থেকে জানানো হলো দ্রুত ভিসার আবেদন করুন, বাকিটা আমরা দেখব। ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। অফিস-আদালত সবকিছু বন্ধ। ওই দিন সন্ধ্যায় পাড়ার একটি কম্পিউটার দোকানে বসে অনলাইনে ভিসা ফরম পূরণ করলাম। কিন্তু কোনোভাবেই ভারতীয় ভিসা সেন্টারে তা জমা করতে পারছিলাম না। রাত ১২টা পর্যন্ত বৃথা চেষ্টা করে বাসায় ফিরলাম। পরদিন ২৭ মার্চ সকাল ১১টা পর্যন্ত ফলাফল একই। সিদ্ধান্ত নিলাম আর আবেদন করব না। কিন্তু ১১টা ৩৫ মিনিটে হঠাৎ একটি ফোনকলে সিদ্ধান্তের পরিবর্তন। সার্ভার কাজ করছে। তড়িঘড়ি অনলাইনে আবেদন করে ভিসা সেন্টারে গিয়ে জমা দিলাম পাসপোর্ট ও আবেদনের কাগজপত্র। পরদিন ২৮ মার্চ বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা, পাক্কা ৬ ঘণ্টা পায়চারির পর হাতে পেলাম পাসপোর্ট। খুলে দেখলাম সিঙ্গেল অ্যান্ট্রি ভিসা। তাও ভালো।

 

মধুমতি যায় যায়রে

২৯ মার্চ বিকাল ৪টা। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পাগলায় মেরি অ্যান্ডারসন ঘাটে পৌঁছলাম। জাহাজ ছাড়বে সন্ধ্যা ৭টায়। তার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, নৌপরিবহন সচিব আবদুস সামাদ, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান প্রণয় বিশ্বাসসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এক সাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাজযাত্রার উদ্বোধন করা হলো। সঙ্গে সঙ্গে পাগলার আকাশ আলোকিত হলো মুহুর্মুহু আতশবাজিতে। রাত ৮টায় লাল-সবুজ পতাকাবাহী মধুমতি লাল-নীল-হলুদ আলোয় সেজে শুরু করল যাত্রা।

বুড়িগঙ্গার দম বন্ধ করা গন্ধকে সাঙ্গ করে মধুমতি ছুটে চলল নতুন গন্তব্য কলকাতার উদ্দেশে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরোহীরা হতে চললাম একটা ইতিহাসের অংশ। ৭০ বছর আগে এই ঢাকা-কলকাতা নৌরুটে সর্বশেষ জাহাজ চলেছিল। দুই দেশের ভ্রমণ পিপাসুদের কথা আর ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে শেখ হাসিনার সরকার  ও ভারত সরকার চিন্তা করে নতুন করে যাত্রীবাহী জাহাজ চালানোর। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ জাহাজ চলাচল নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সই হলো প্রটোকল। তারই ফল হিসেবে ২৯ মার্চ রাতে ‘মধুমতি’র যাত্রা। একই তারিখে সন্ধ্যায় কলকাতা থেকে ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করে ‘বেঙ্গল গঙ্গা’ নামের আরেকটি জাহাজ। 

 

গান আড্ডা হুল্লোড়

এমভি মধুমতির যাত্রী ধারণক্ষমতা ৭৫০ জন। জাহাজে আছে ৬০টি কেবিন। যার মধ্যে চারটি ভিআইপি কেবিন। দোতলার মধ্যখানে আছে বেশ বড় লবি। ডেক এবং তিন তলায় আছে বিশাল খোলা স্পেস। বিশাল এ জাহাজে আমরা ছিলাম মাত্র ১৩৮ জন। এর মধ্যে যাত্রী ছিলাম ৮০ জন। ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য খন্দকার মমতা হেনা লাভলী, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুভাষ সিংহ রায়, সাংবাদিক ও নাট্যব্যক্তিত্ব রাশিদুল হক পাশা, সাংবাদিক সুভাষ চন্দ্র বাদল, সুকান্ত গুপ্ত অলক, ছিলেন একাধিক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন সদস্য; যারা কিনা ভবিষ্যতে এ রুটে বে ক্রুজ চালানোর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চান। এর বাইরে ছিলেন বাউল শিল্পী, বিআইডব্লিউটিএ, বিআইডব্লিটিসির কর্মকর্তারা, অবসরে যাওয়া একাধিক সরকারি কর্মকর্তা, একাধিক টেলিভিশন ও পত্রিকার রিপোর্টারসহ ভ্রমণপিপাসু আরও অনেকে। এ যাত্রায় অংশ নেওয়া প্রায় সবাই ছিলেন বেশ এক্সাসাইটেড। পাগলা থেকে যাত্রা শুরুর পর আড্ডা, গান, আর হইহুল্লোড়ের মধ্যদিয়ে চলছিল আমাদের কলকাতা অভিযান।

 

কখন পৌঁছব!

অসংখ্য ছোট-বড় নদী, শহর-গ্রাম পেরিয়ে আমাদের জাহাজ ছুটে চলছে কলকাতার পথে। গভীর রাতে বরিশাল লঞ্চঘাট আর কীর্তনখোলার রাতের সৌন্দর্য ছিল উপভোগ্য। এরপর গাবখান চ্যানেল হয়ে আমরা যখন মোড়েলগঞ্জে পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে ১০টা কিংবা ১১টা। সেখানে রসদ কেনার জন্য প্রায় আধা ঘণ্টার বিরতি। অতপর মোংলার পথে। সেখানেও ঘণ্টা দেড়েকের প্রয়োজনীয় বিরতি। তারপর ঘষিয়াখালী চ্যানেল ধরে শিবসাহ নদী হয়ে জাহাজ প্রবেশ করল রয়েল বেঙ্গল টাইগার রাজ্য সুন্দরবনের ভিতরে। এবার যাত্রা কিছুটা ধীর গতিতে। তবে মাঝেমধ্যে জাহাজের হুইসেলের শব্দ কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করলেও ঘন সবুজ বন দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা ৬টায় পৌঁছে গেলাম আংটিহারা সেখ বাড়িয়া নদীতে। এটি হচ্ছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলায় অবস্থিত একেবারে সীমান্ত জনপদ। নোঙর ফেলল মধুমতি। রাত ৯টার মধ্যেই শেষ হলো আমাদের ইমিগ্রেশনের কাজ। প্রায় ১২ ঘণ্টার যাত্রাবিরতি শেষে ভোর ৬টায় আবারও যাত্রা শুরু। তবে কবে, কখন জাহাজ পৌঁছবে কলকাতা- এ নিয়ে সবার মনে ছিল প্রশ্ন। কেউ বলছিলেন, ৩১ তারিখ বিকালেই পৌঁছবে, কেউবা বলছিলেন গভীর রাত হবে আবার কারাও কারও বক্তব্য ছিল, ১ বা ২ এপ্রিলে পৌঁছানো যাবে কলকাতা। 

 

রায়মঙ্গলে অনেকক্ষণ

রায়মঙ্গল সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত একটি দীর্ঘ নদী। যার সম্পর্ক একেবারে বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে। এর একটি অংশ বাংলাদেশে আরেকটি ভারতে। আংটিহারা থেকে যাত্রা করে প্রায় চার ঘণ্টার জলপথ পাড়ি দিয়ে আমরা ভারতীয় অংশের হেমনগরে পৌঁছলাম প্রায় ১১টার দিকে। এখানেই আমাদের কাস্টমস হবে। এ কারণে মাঝনদীতেই নোঙর ফেলল মধুমতি। আমাদের অদূরেই নোঙর ফেলেছিল কলকাতা থেকে ছেড়ে আসা এমভি বেঙ্গল গঙ্গা। প্রায় ছয় ঘণ্টা লাগল কাস্টমসের কাজ শেষ হতে।

 

বিরতিহীন যাত্রা

বিকাল ৫টার কিছু পর ভারতীয় পতাকাবাহী দুটি ছোট জাহাজ এমভি দরকেশ্বর ও এমভি কোয়েল স্কট করে ধীর গতিতে নিয়ে যায় কলকাতার পথে। ৩১ মার্চ বিকাল ৫টা থেকে একটানা চলে এমভি মধুমতি ১ এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২টায় পৌঁছে কলকাতা ইনল্যান্ড পোর্টে। তারপর স্বল্প সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয় ইমিগ্রেশন। আর এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় আমাদের ৬৫ ঘণ্টার অসাধারণ এক জাহাজ যাত্রা। বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান প্রণয় কান্তি বিশ্বাস বলছিলেন, ১৯৪৭ এর ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর এই নৌরুটে আর কোনো যাত্রীবাহী জাহাজ চলেনি। এখন নতুন করে দুই দেশের সরকার জাহাজ চলাচলের উদ্যোগ নিয়েছে। আমরা এটি বর্ষা মৌসুম ছাড়া নিয়মিত চালানোর চেষ্টা করব। এক্ষেত্রে যেসব প্রাইভেট অপারেটরের বে-ক্রুজ রয়েছে তাদের আমরা উৎসাহিত করব।


আপনার মন্তব্য