Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২১:৩৭

থাইল্যান্ডের রানী এসেছিলেন উদ্যোক্তা ঝর্ণা ইসলামের কাছে

আফজাল, টঙ্গী

থাইল্যান্ডের রানী এসেছিলেন উদ্যোক্তা ঝর্ণা ইসলামের কাছে

রাজধানী উত্তরখান শান্তিনিকেতন রোডে মুসলিম পরিবারের মেয়ে ঝর্ণা ইসলাম। বাবাকে হারান ছোটবেলায়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে গাজীপুরের টঙ্গী দত্তপাড়া হাজী মার্কেট এলাকায় প্রবাসী সামছুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয় ঝর্ণার। বিয়ের পর কিছুদিন ভালোই কাটছিল। স্বামী সামছুল ইসলাম দেশে আসার পর পারিবারিক অভাব অনটনে দিনকাটে ঝর্ণার। এরপর অভাবকে দূর করতে সংসারের হাল ধরতে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। হস্তশিল্পের কাজ জানা এই নারী ঘরোয়া পরিবেশে বিভিন্ন ডিজাইন, নকশা হাতে সেলাই করে  এলাকার আশপাশের লোকদের কাছে বিক্রি করতে লাগলেন। এতে সচ্ছলতা না আসলে ১৯৯৮ সালে ব্র্যাক এনজিও থেকে পাঁচ হাজার টাকা লোন নিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনে দর্জির কাজ করে ব্যাপক সাড়া পান। মেয়েদের কাপড়ে বিভিন্ন ধরনের সুন্দর সুন্দর নকশার কাজ করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেন। দিন যতই বাড়তে থাকে ঝর্ণার হাতের ও নকশার কাজের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। এরপর তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ঝর্ণা ফেব্রিক অ্যান্ড ফ্যাশন ডিজাইন। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে এগোতে শুরু করলেন তিনি। বাইতে শুরু করেন স্বপ্নের সিঁড়ি। ব্যবসাকে আরও গতিশীল করতে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নেন আরও কয়েক লাখ টাকা। ২০১৫ সালের জুলাইয়ে টঙ্গী সাতাইশ ভিয়েলাটেক্স পোশাক কারখানা কর্র্তৃক অয়োজিত এক সেমিনারে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নেওয়া ৩৫ জন নারীকে ডাকা হলো। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত গার্ডেন ডি জং। সেখানে ঋণগ্রহীতা ঝর্ণার কাছ থেকে শুনলেন তার কারখানায় তৈরি হওয়া পোশাকের কথা। ঝর্ণাও ব্র্যাক থেকে ঋণ নিয়ে কীভাবে সাফল্য হলেন সে কথাও বললেন। ডাচ্-রাষ্ট্রদূত ঝর্ণার কথা শুনে মুগ্ধ হন এবং ওই দিন বিকালে ঝর্ণার কারখানা পরিদর্শনে আসেন। পরে ঝর্ণার কারখানার ছবি ও তার সব কার্যক্রম প্রতিবেদন আকারে নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমার কাছে পাঠান। ওই বছর নভেম্বরে নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা জরিগুয়েতা সেরুতি বাংলাদেশ সফরে আসেন। ম্যাক্সিমা সফরে এসে টঙ্গী ভিয়েলাটেক্স কারখানা পরিদর্শন করে ওই দিন বিকালে ঝর্ণা ফেব্রিক অ্যান্ড ফ্যাশন ডিজাইন পরিদর্শন করেন। পরে ঝর্ণার ছোট্ট কারখানা পরিদর্শন করেন এবং ঝর্ণা ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে  স্বপ্নের সিঁড়িতে পা-রাখার গল্প শুনেন। ম্যাক্সিমাও মুগ্ধ হয়ে তাকে সহযোগিতা করার আশ^াস ব্যক্ত করেন। ম্যাক্সিমা চলে যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ৫ ডিসেম্বর ঝর্ণার কারখানায় ৭টি ইলেকট্রিক সেলাই মেশিন উপহার হিসেবে দেন। ওই মেশিন দিয়ে চলছে ঝর্ণার কারখানা। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো এ বছর গত ১০ জুলাই ফের ঝর্ণার কারখানা পরিদর্শনে আসেন নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা। এসে ঝর্ণার কারখানার খোঁজ খবর নেন এবং এখানে নারী শ্রমিকরা কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প শুনে আনন্দিত হন। এ ছাড়া একটি বড় ফ্লোর নিয়ে কারখানার শ্রমিক বাড়ানোর কথা বলেন।  রানী ম্যাক্সিমা বাংলাদেশ সফরে আসলে আবার ঝর্ণার কারখানা দেখতে আশার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ঝর্ণা কাপড়ের তৈরি কিছু শোপিস বানিয়ে ম্যাক্সিমাকে উপহার দেন।  কারখানায় বর্তমানে ১৬ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। কথা হয় নারী শ্রমিক জায়েদা বেগমের সঙ্গে তিনি বলেন, ২০ বছর ধরে এই কারখানার মালিক ঝর্ণা আপার সঙ্গে কাজ করছি, তিনি আমাদের শ্রমিক হিসেবে দেখেন না। আমাদের সব সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন। আমরা একদিকে সংসারের কাজও করছি অপরদিকে পার্টটাইম কাজ করে অর্থ উপার্জন করছি। অপর এক শ্রমিক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আমি মার্কেটিং বিভাগে অনার্স পড়ছি, পাশাপাশি এই কারখানায় কাজও করছি। মাস শেষে কাজের মজুরি নিয়ে প্রয়োজন মেটাচ্ছি। দত্তপাড়া এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা কবির হোসেন বলেন, মানুষ চেষ্টা করলে সবই সম্ভব, পরিশ্রম সোভাগ্যের চাবিকাঠি, তার উদাহরণ এই ঝর্ণা। তিনি পরিশ্রম করে আজ সফল হয়েছেন, তাকে দেখতে নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমাসহ দেশি বিদেশি মানুষ আসছেন। এটাই তার কষ্টের ফসল। তার এই অক্লান্ত শ্রম অব্যাহত থাকলে এগিয়ে যাবেন তিনি। এ ব্যাপারে ঝর্ণা ফেব্রিক অ্যান্ড ফ্যাশন ডিজাইন ফ্যাশন কারখানার  মালিক ঝর্ণা ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি যখন ৮ম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমার বাবা মারা যায়, পরে আমার বিয়ে হয়, শ^শুর বাড়িতে আসার কিছুদিন ভালোই ছিলাম পরে অভাব অনটন দেখা দিলে,পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হস্তশিল্প ও নকশার কাজ করার উদ্যোগ নেই। প্রথমে বিভিন্ন জামায় হাতের কাজ ও নকশার কাজ করে দোকানে ও আশপাশের মানুষের কাছে বিক্রি করতাম এরপর ব্র্যাক এনজিও থেকে লোন নিয়ে মেশিন ক্রয় করে ড্রেস বানিয়ে বিক্রি করতাম। এমনি করে আগাতে শুরু করলাম। পরে ২০১৫ সালে টঙ্গী সাতাইশ ভিয়েলাটেক্স পোশাক কারখানা কর্র্তৃক আয়োজিত এক সেমিনারে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নেওয়া ৩৫ জন নারীকে ডাকা হলো। সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত গার্ডেন ডি জং। ওইখানে তার সঙ্গে আমার কথা হয় এবং আমার কারখানা দেখতে আসেন, পরে আমাকে ৭টি সেলাই মেশিন দেয়। তবে আমি বেশি সফল হয়েছি বলে মনে করছি নেদারল্যান্ডসের রানী ম্যাক্সিমা আমার বাড়িতে এসে আমার কারখানা পরিদর্শন করেছেন। আমার খোঁজখবর নিয়েছেন, এটাই আমার বড় স্বাথর্ক, এটাই আমার বড় সফলতা। বর্তমানে আমার কারখানায় ১৬ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। আমার কারখানায় তৈরি পোশাক টঙ্গী উত্তরাসহ বিভিন্ন স্টলে বিক্রি হচ্ছে। আমার কারখানায় তৈরি পোশাক বিদেশেও যাবে এমন কথা চলছে অনেক ব্যবসায়ীর সঙ্গে।

তিনি আরও বলেন, আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিয়ে একটি তিনতলা বাড়ি করেছি এ ছাড়া সাভারে এক খন্ড জমি ক্রয় করি। আমি ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে এখন অনেকটাই সফল। ঝর্ণা গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলমকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আমার বাড়ির রাস্তা অনেক খারাপ ছিল রানী আসার পূর্বে আমার বাড়ির দুই পাশের রাস্তা সংস্কার করে দিয়েছেন। এতে জনচলাচলে অনেকটাই সুবিধা হয়েছে। রানী যখন আমার কারখানায় আসেন তখন মেয়র নিজেও এসেছিলেন এবং রাস্তাঘাটের সমস্যা তিনি দেখবেন বলে জানান। গাজীপুর সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সফল নারী উদ্যোক্তা ঝর্ণার উদ্দেশে বলেন, মানুষ চেষ্টা করলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। আর কোনো কাজই ছোট নয়। বিশে^ যারা ধনী হয়েছেন কিংবা বড় হয়েছেন তারা কাজ করেই বড় হয়েছেন। আমরা এখন কাজ করতে চাই না। শুধু অর্ডার করতে চাই। যার ফলে আমরা দিন দিন পিছিয়ে যাচ্ছি। নারী উদ্যোক্তা ঝর্ণা মেধা বুদ্ধি আর শ্রম এগিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন।


আপনার মন্তব্য