Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ ২১:৪৪

নয়নাভিরাম ঝরনারানী

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

নয়নাভিরাম ঝরনারানী

পাহাড়ি দুর্গম পথে ঘণ্টাখানেকের খাড়া চড়াই পার হওয়া; গহিন বনে পাহাড়ি ছড়ার খলখল ধ্বনিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা; প্রায় ৭০ ফুট ওপর থেকে হিমশীতল পাহাড়ি ঝরনার পানি পড়ছে গা বেয়ে- এসব অনুভূতি পেতে চান? তাহলে সময় নিয়ে ঘুরে আসুন খৈয়াছড়া।

 

খৈয়াছড়া, বাংলাদেশের অপূর্ব সুন্দর এবং রোমাঞ্চকর দুর্গম এক দর্শনীয় স্থান। নয়নাভিরাম বিস্তৃত পরিসর। ঝুম ঝুম শব্দের ঝরনা। অদৃশ্য শব্দটি তৈরি করে ভালো লাগার আবেশ। আছড়ে পড়ছে প্রকৃতির খোলা রূপ। সবুজের আবহ ছড়িয়ে পড়ছে আগত দর্শনার্থী সবার মাঝে। অবিরত ঝরনার ফলগুধারার সতেজ বাতাস ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে হৃদয়। প্রকৃতির তুলিতে আঁকা সৌন্দর্যে মুগ্ধতার পরশ ছড়াচ্ছে। এমনই চিত্র প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ১২ নম্বর খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পার্শ্বে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪ দশমিক ২ কিলোমিটার পূর্বে ‘খৈয়াছড়া ঝরনার’। প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি খৈয়াছড়ায় আছে নয়টি ধাপ। এমন ব্যতিক্রম ও বৃহত্তম আকারের ঝরনা দেশে দ্বিতীয়টি অনুপস্থিত। তাই খৈয়াছড়াকে ‘ঝরনারানী’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।

 

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার পূর্বে খৈয়াছড়া ঝরনা। এর মধ্যে এক কিলোমিটার পথ গাড়িতে করে যাওয়া যায়। বাকি পথ যেতে হয় হেঁটে। খৈয়াছড়ায় আছে ঝরনার নয়টি ধাপ। এসবের আকার-আকৃতি ও গঠনশৈলীও চমৎকার। নয়টি ধাপ হলেও এগুলো পরস্পর বিচ্ছিন্ন। ছড়ার প্রথম ধাপটি চমৎকার। পাহাড়ের উঁচু থেকে আছড়ে পড়ছে ঝরনার শীতল পানি। এর পাশ দিয়েই খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয় ঝরনার নয়টি ধাপ। খাড়া পাহাড় বেয়ে ওঠার পরে সামান্য কিছু নিচে এর দ্বিতীয় ধাপ। এটা প্রথম ধাপ থেকে স্বাতন্ত্র্য। সরু জায়গা থেকে প্রবাহিত ঝরনাধারা, একটু নিচে এসেই বিস্তৃত হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপ থেকে তৃতীয় ধাপটি আরও ব্যতিক্রম। এখান থেকে ভালোভাবে তিনটি ধাপের ঝরনাধারা দেখা যায়। মনে হবে যেন পুকুরের জলাধার। আছে গোসল করার মতো জায়গাও। এখানকার ঝরনার পাশ দিয়ে খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয় চতুর্থ ধাপে। এই চতুর্থ ধাপ থেকে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম  ধাপের উচ্চতা তুলনামূলক কম। তবে অষ্টম ধাপটি একটু উঁচুতে এবং তা বেশ বিস্তৃত। এখান থেকে কিছুটা খাড়া পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলেই নবম ধাপ।  এখানেও জলপ্রপাতটির ঠিক নিচে মাঝারি আকারের একটি গর্ত। নবম এই ধাপটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট ওপরে। এখান থেকে পাহাড় বেয়ে আরও কিছুটা ওপরে ওঠা যায়। তবে তা খুবই কষ্টসাধ্য। উঠতে পারলেই  পাহাড়ের চূড়া থেকে মিলবে দূরের সমুদ্র দর্শন। এ ছড়ায় সব সময় জ্বলে এমন একটি পাহাড় আছে। অনেকে রাতের চাঁদের আলোয় ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করেন।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রায় ৫০ বছর আগে থেকেই প্রবাহিত হচ্ছে খৈয়াছড়া  ঝরনাটি। এতদিন পাহাড়ি এলাকা এবং ঝোপঝাড়ের কারণে লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিল। ২০১০ সালে সরকার বারৈয়াঢালা ব্লক থেকে বড়তাকিয়া ব্লকের ২৯৩৩ দশমিক ৬১ হেক্টর পাহাড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে খৈয়াছড়া ঝরনাটিও জাতীয় উদ্যানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এখন পর্যায়ক্রমে  প্রতিদিনই পর্যটকের পদভারে মুখর হচ্ছে। ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকরা সবুজের সমারোহ পাহাড় আর ঝরনা দেখতে এখানে ছুটে আসেন।

 

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে যে কোনো বাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই পৌরবাজার পার হয়ে বড়তাকিয়া বাজারের আগে খৈয়াছড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে নামতে হয়। এখান থেকে পূর্ব দিকের গ্রামের রাস্তা দিয়ে দশ মিনিট হাঁটলেই রেললাইন, একটু সামনে একটি ঝিরি। সেখান থেকে খৈয়াছড়া ঝরনার মূল ট্র্যাকিং শুরু। এখানে গাইডও মিলে। ঝরনায় যাওয়ার রাস্তা একটিই। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরে প্রায় দেড় ঘণ্টা হাঁটলে দেখা যায় ঝরনা। ঝরনায় যাওয়ার পথে দেখা মিলবে স্থানীয় হোটেল। ট্রেনে গেলে লোকাল বা মেইলে করে নামতে হবে বড়তাকিয়া স্টেশনে।  সেখান থেকে অল্প টাকায় সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া করে পাহাড়ের কাছে চলে যাওয়া যায়। ঝরনার জন্য যাত্রা করার সবচেয়ে ভয়াল সময় সকাল ১০টার দিকে। উড্ডয়নে প্রায় দেড়ঘণ্টার মতো লাগতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে ঝরনার উদ্দেশ্যে আরোহণ শুরু করুন।

 

থাকার জায়গা

বড়তাকিয়া বাজারে থাকার হোটেল নেই। তবে চেয়ারম্যান বাংলোতে থাকা যায়। মিরসরাই বা সীতাকুন্ডে থাকার স্থানীয় হোটেল আছে। তবে থাকার জন্য চট্টগ্রাম কিংবা ফেনীর হোটেলই ভালো।  

মনে রাখা জরুরি : এটি দেশের সম্পদ। তাই অপচনশীল দ্রব্য এখানে ফেলা উচিত নয়। পথে থাকতে পারে জোঁক, তাই প্রয়োজনে সঙ্গে লবণ রাখা ভালো। ঝরনায় যাওয়ার রাস্তা বেশ দুর্গম। ফলে শিশু, বয়স্ক বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে না যাওয়াই উত্তম। মারাত্মক কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ওই দুর্গম পথ মাড়িয়ে ফিরে আসা কষ্টসাধ্য। সাবধান, পা ফসকে নিচে পড়লে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কাজেই সব সময় সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। 

 

তো, সময় করে ঘুরে আসুন খৈয়াছড়া। আমাদের ভালো  লেগেছে; আপনারও ভালো লাগবে নিশ্চয়তা দিচ্ছি। আর হ্যাঁ, সঙ্গে করে বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার এবং প্ল­াস্টিক ব্যাগ এবং এই ভ্রমণের সবচাইতে উপকারী বন্ধু বাঁশ সঙ্গে নিতে ভুলবেন না যেন।


আপনার মন্তব্য