শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২২:২৬

বৃত্তের বাইরে

মালিহার স্পিকিং অ্যানিমেল

সাইফ ইমন

মালিহার স্পিকিং অ্যানিমেল

‘খাবার নষ্ট না করে ক্ষুধার্ত প্রাণীকে খেতে দিন। যা আপনার প্রয়োজনের বেশি, তাতে সবার অধিকার আছে। আপনার আশপাশে যা কিছু আঘাতপ্রাপ্ত- মানুষ, প্রাণী কিংবা উদ্ভিদ, তাকে রক্ষা করুন...’ কথাগুলো বলছিলেন মালিহা। স্কলার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন শহীদ আনোয়ার ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। এইচএসসি পাসের পর বর্তমানে মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফ্রন্ডল্যান্ডে প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন মালিহা।

 

মালিহা তানজিম। ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের জন্য তার অনেক মমতা। নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন রাস্তায় অসহায় নানা প্রাণীর জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি ছোট থেকে প্রাণীদের জন্য কিছু করার চাইতাম। আমার মনে হতো পৃথিবীর মানুষ মানুষের জন্য নয়, মানুষ প্রতিটা প্রাণীর জন্য। আমি ১৮ বছর বয়স থেকেই আমার স্পিকিং অ্যানিমেল অর্গানাইজেশন শুরু করি।’ প্রাণীদের জন্য কাজ করার ফলে পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হয়নি মালিহার। স্কলার স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন শহীদ আনোয়ার ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। সেখান থেকে ২০১৯ সালে এইচএসসি পাসের পর বর্তমানে কানাডা ‘মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফ্রন্ডল্যান্ডে প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন মালিহা। পরিবার প্রসঙ্গে মালিহা বলেন, ‘আমার বাবা, মা এবং ছোট ভাই। আমার মা মিসেস আফরোজা আকতার ডেজি সবসময় আমার কাজে আমাকে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটা কাজের লিফলেট বানানো থেকে শুরু করে অন্যান্য সব কাজে আমার মা আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। মার প্রথমে ভয় ছিল, আমি কীভাবে একজন মেয়ে হয়ে এই কাজগুলো করব। কেননা এসব কাজ বেশি বসে করা যায় না। একটু ভয় থাকার পরও আমার মা-ই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সাপোর্টিভ।’ প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা এর শুরুটা কীভাবে হলো? আমার ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা কাজ করত। আমি রাস্তায় কোনো কুকুর দেখলে দৌড়ে যাই তাকে আদর করার জন্য। আশপাশে দোকান থেকে খাবার নিয়ে এসে তাদের খাওয়াই। এ থেকে যে তৃপ্তি পাওয়া যায় তা পৃথিবীতে কোনো কাজে পাওয়া যায় না। অনেকে অবাক দৃষ্টিতে থাকিয়ে থাকে আবার অনেকে আজেবাজে মন্তব্যও করে। অনেকের চোখে রাস্তার প্রাণীদের খাওয়ানো বা আদর করা দৃষ্টিকটু কিন্তু এটাই কি আমাদের কাছে স্বাভাবিক কিছু হওয়া উচিত নয়? ... উল্টো প্রশ্ন করেন মালিহা। স্পিকিং অ্যানিমেলস নামে অর্গানাইজেশনের মাধ্যমে প্রাণীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন মালিহা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ৪ জুলাই ২০১৯-এ আমার অর্গানাইজেশন স্পিকিং অ্যানিমেলস শুরু করি এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে কোনো প্রাণী না খেয়ে ঘুমাবে না। পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষ হবে প্রাণীদের প্রতি দয়ালু,  পৃথিবীতে সব আঘাতের সামনে সে দেয়াল হয়ে দাঁড়াবে। সবাই নিজের বাচ্চাকে প্রাণ এবং প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতে শিখাবে। কেউ নিজের ডিপ্রেশন রাস্তায় হেঁটে বেড়ানো নিরীহ প্রাণীর ওপর ঝাড়বে না। কাউকে আঘাত করে আনন্দ পাওয়া মানুষের বৈশিষ্ট্য নয়।’ এসব প্রাণীর জন্য প্রায়ই নানা ক্যাম্পেইনের আয়োজন করা হয়ে থাকে স্পিকিং অ্যানিমেলসের পক্ষ থেকে। মালিহা জানান, ‘আমাদের প্রথম ক্যাম্পেইন হয় ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেলস ডে ৪ অক্টোবর ২০১৯-এ। সেই ক্যাম্পেইনে আমরা রবীন্দ্র সরোবরে লিফলেট বিতরণ করি এবং পোস্টার লাগাই। আমরা বিভিন্ন সেমিনার করি অ্যানিমেল রাইটস নিয়ে। আমরা প্রতি মাসে একটা করে ক্যাম্পেইন করি। আমাদের এই ক্যাম্পেইনে যদি একটা প্রাণীর উপকার হয় এতেই স্পিকিং অ্যানিমেলসের সার্থকতা। জনগণের কাছ থেকে সাড়া কেমন পাচ্ছেন জানতে চাইলে মালিহা জানান, প্রথম দিকে মানুষ নেগেটিভ থাকলেও এখন মানুষের মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে। খুব ভালো লাগে যখন দেখতে পাই মানুষ এখন বাসায় বেঁচে যাওয়া খাবার ফেলে না দিয়ে রাস্তার অসহায় প্রাণীদের খেতে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়ে চলেছে। আমাদের আর্টিকেলগুলোয় আমরা অনেক বেশি পজেটিভ রিভিউ পাই। মানুষ খুব সুন্দরভাবে জিনিসগুলো গ্রহণ করেছে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে।’ প্রাণীদের জন্য কাজ করার ক্ষেত্রে বন্ধুদের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন মালিহা। বলেন, বন্ধুদের সহযোগিতা ছাড়া এতদূর আসা সম্ভব হতো না। আমি প্রাণীদের প্রতিটি কাজে আমার বন্ধুদের পাশে পেয়েছি। আমার সংগঠনের শুরু থেকে পাশে ছিল আমার বন্ধু আবরার, মাইশা, সাবা, শুপ্ত এবং তরণ। এই ভালো মানুষগুলো ছাড়া হয়তো কখনো সংগঠন এতদূর এগোতো না।

মালিহার অনুপ্রেরণা ছিল তার শুরুর গল্পটা। মালিহা বলেন, ‘কলেজ থেকে আসার পথে আমি এবং আমার আরও দু-একজন বান্ধবী একটি কুকুরকে দেখি। কুকুরটিকে কেউ ইচ্ছা করে বিষ দিয়েছিল। কুকুরটি মৃতপ্রায় অবস্থায় ছিল কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কুকুরটির চোখ বলছিল তার সেই দুঃখের কথা। আমি এবং আমার আরও দু-একজন বান্ধবী মিলে চেষ্টা করি কুকুরটিকে বাঁচানোর। আমরা আশপাশে সবাইকে সাহায্যের জন্য ডাকতে থাকি কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। অনেকে আজেবাজে মন্তব্য করে হেসে উড়িয়ে দেয়। সেদিন অনুভব করি মানুষের চিন্তা প্রাণীদের প্রতি চেঞ্জ করা কত জরুরি। কুকুরটির সেই কষ্টই ছিল আমার অনুপ্রেরণা। আমি সেদিন বাসায় এসে আমার আরও দুজন বন্ধু নিয়ে শুরু করি সংগঠন। বর্তমানে ৪২ জন মিলে কাজ করছি।’ ভবিষ্যতে মালিহাদের বিশ্বব্যাপী প্রাণীদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে।


আপনার মন্তব্য