শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১১ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মে, ২০১৯ ২৩:১৪

তখন ছিল আমাদের এক আলমারি সংসার

তখন ছিল আমাদের এক আলমারি সংসার
নজরুল সংগীত শিল্পী, সংগঠক ও গবেষক সুজিত মোস্তফা এবং দেশীয় নৃত্যাঙ্গনের এক অনন্য নাম মুনমুন আহমেদ। নজরুলের গানকে গণমানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছেন বাবা আবু হেনা মোস্তফা কামালের যোগ্য সন্তান সুজিত মোস্তফা। শুধু তাই নয়, নজরুল সংগীতের শুদ্ধচর্চা, বিকাশ ও নজরুলের সুরেরধারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রজ্বলন করতে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। অন্যদিকে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারিণী মুনমুন আহমেদ দেশীয় নৃত্যের প্রসারে অসামান্য ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সপ্রতিভ নাট্য ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে। এ দুই তারকারই প্রিয়মুখ একমাত্র মেয়ে অপরাজিতা। এবারের বাংলাদেশ প্রতিদিনের শোবিজ বিভাগের আড্ডা আয়োজনের অতিথি এ দুই শিল্প সারথি। প্রাণবন্ত আড্ডা পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন- পান্থ আফজাল, ছবি : রাফিয়া আহমেদ

 

ভূতের গলির নর্থ রোডের ৬৫ নম্বর বাড়ি! গেটে দায়িত্বরত দারোয়ানের অনুমতি সাপেক্ষে ভিতরে প্রবেশ করলাম। সিঁড়ি মাড়িয়ে দরজার সামনে এসেই দেখলাম শোবিজ ফটোগ্রাফার আগেভাগেই হাজির! কুশলাদি বিনিময় শেষে ফটোসেশনের পাঠ চুকাতে দুজন আমাদের নিয়ে গেলেন বাড়ির ছাদে। মুনমুন আহমেদের কিছুটা তাড়া ছিল, তাই ফটোসেশন শেষে দেরি না করে আমরা তাদের সঙ্গে আড্ডায় বসে গেলাম। শিল্পী সুজিত মোস্তফা যে ঘরে রেওয়াজ করেন, সে ঘরেই বসান তার আড্ডা। আড্ডাপ্রিয় মানুষ তিনি। সংগীতাঙ্গনের মানুষ থেকে শুরু করে আড্ডাপ্রিয় প্রায় মানুষই আসেন তার আড্ডায়। এবার আমাদের পালা বলা যায়!        সুজিত মোস্তফার মতে, ‘জীবনটাই তো সুর। আর আড্ডা তার প্রাণ।’ জানা গেল, তিনি ভালোবাসেন ঘুরতে, রান্না করতে আর আড্ডা দিতে। তাই তার রেওয়াজের ঘরে দেখা গেল একদিকে তানপুরা, হারমোনিয়াম আর অন্যদিকে অ্যাপল ম্যাক কম্পিউটার।

হাল প্রযুক্তির যন্ত্রের প্রতি রয়েছে তার প্রবল আগ্রহ। নিজেকে ‘গ্যাজেটফ্রিক’ বলে জানান। বোঝা গেল, পেশা আর মনে-প্রাণে সংগীতের সাধক হলেও আধুনিকতায় সব সময় হালনাগাদ থাকতে পছন্দ করেন তিনি। ‘প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি অনেক আগ্রহ রয়েছে আমার। নিত্যনতুন প্রযুক্তির মুঠোফোন আর ল্যাপটপ কেনার বাতিক আছে।’ এদিকে প্রতিদিন সকালে উঠেই রেওয়াজের ঘরে চলে যান তিনি; সঙ্গে এক কাপ চা। তার চা বানানোর খ্যাতি রয়েছে! আর পরিবারের সবাই সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকলেও সন্ধ্যার পর সবাই এক হন। মেয়ে অপরাজিতার সঙ্গে বাবার দারুণ সখ্য। মেয়ের সঙ্গে সিনেমা দেখা, নানান গল্প করেই সময় কাটে তার। আড্ডার এক পযার্য়ে গুণী শিল্পী সুবীর নন্দীর সঙ্গে তার শেষ স্মৃতি প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করতেই তিনি কিছুটা সময় নিয়ে আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি করে বললেন, ‘সুবীর নন্দী চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে, সকালে উঠেই জানলাম। সম্ভবত দাদার শেষ টিভি অনুষ্ঠানটি ছিল আমার সঙ্গে। এনটিভিতে চলা গানের অন্তরালে’তে তিনি আমার চতুর্থ গেস্ট ছিলেন। আমার প্রোগ্রাম ছিল বলেই শত ব্যস্ততার মাঝেও বউদি ও সুবীরদা এসেছিলেন। তিনি এই অনুষ্ঠানে যেরকমভাবে পারফর্ম করলেন তা বলাই বাহুল্য। অসাধারণ! তখনো কিন্তু জানতাম না, এটি হবে সুবীরদার সঙ্গে আমার শেষ অনুষ্ঠান ও সাক্ষাৎ। আমি ইন্ডিয়ায় গান শিখতে যাওয়ার আগে থেকেই কিন্তু সুবীরদা আমাকে চিনতেন এবং খুবই এপ্রিসিয়েট করতেন। তিনি আমার গান খুবই পছন্দ করতেন। আমি বলব, বাংলা গানে তার লেভেলের আর্টিস্ট এপার-ওপারে তেমন নেই বললেই চলে। সুবীর নন্দীর কি আসলে মৃত্যু আছে, নেই। তবে তার শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।’ একজন স্বনামধন্য কবি, সুরকার ও গায়কের পুত্র আপনি। বাবার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কি?

‘আমি তো মানবেন্দ্রের খুবই ভক্ত ছিলাম। তার গানও হুবহু কপি করে গাইতে পারতাম। মানবেন্দ্রের কিছু গানও রেকর্ড করেছিলাম। আমার বাবা সেসময় শিল্পকলার ডিজি ছিলেন। গাড়িতে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে বাজছিল একটি গান। তিনি ড্রাইভারকে বললেন, দেখেছ কত সুন্দর গায় মানবেন্দ্র। ড্রাইভার বললেন, স্যার এটি তো আপনার ছেলের কণ্ঠ!

‘আব্বার ১২টি গান নিয়ে কিন্তু কলকাতা থেকে একটি অ্যালবাম বের করেছিলাম। তারপর তার জনপ্রিয় কিছু গান নিয়ে বেঙ্গল থেকেও একটি অ্যালবাম বের হয়েছিল। আমি তার আরও কিছু গান সুর করে রেখেছি। সামনে গানগুলো নিয়ে কিছু করব।’ পাশেই বসেছিলেন মুনমুন আহমেদ। তিনিও কিছুটা আবেগতাড়িত সুবীর নন্দী চলে যাওয়ায়।

এদিকে পোশাক পরিধানের দিক দিয়ে বরাবরই কিছুটা ব্যতিক্রম এই তারকা নৃত্যশিল্পী। স্টাইল আর ফ্যাশনে তার কাছে আজকের তারুণ্যও হার মানতে বাধ্য। চিরতারুণ্যে ভরপুর এই তারকা হাতে নকশা করা সাদা রঙের শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে পরেছেন খয়েরি ব্লাউজ। হাতে অলংকার; কপালে খয়েরি টিপ। মুনমুন আহমেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি নাচ শেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তার মায়ের কাছ থেকে। নৃত্য চর্চায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো-খারাপ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। নৃত্যশিল্পের যথাযথ সমৃদ্ধির জন্য আরও বেশি সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। যদিও বর্তমান সরকার সংস্কৃতিবান্ধব হওয়ায় আগের তুলনায় পৃষ্ঠপোষকতা কিছু বেড়েছে।’ নৃত্যশিল্পী তৈরি না হওয়ার কারণ কী বলে মনে হয়? ‘আমাদের আমলে লোকজনের একমাত্র বিনোদন ব্যবস্থা ছিল বিটিভি, যার মাধ্যমে উল্লেখিত নৃত্য শিল্পীদের দর্শকরা চিনেছেন জেনেছেন। এখনকার দিনেও অনেক নৃত্যশিল্পীরা বিভিন্ন চ্যানেলে অনুষ্ঠান করেন। তবে সেটা দায়সারাভাবে। যোগ্যরা সুযোগ পান না। মানসম্পন্ন নৃত্যানুষ্ঠান হয় না বললেই চলে। তাই এই নিয়ে আগ্রহী দর্শক অনেক কম।’ আপনি মূলত কোনো ধরনের নাচ করেন ও শেখান? তিনি বলে চললেন, ‘সব ধরনের নাচ করি। তবে শেখানোর ক্ষেত্রে বডি টিউনের গুরুত্ব বেশি দিয়ে থাকি। নাচের জ্যামিতিক ও স্পেস ব্যবহার সম্পর্কে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করি। মূলত কত্থক নৃত্যকে আমি তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাই। আমি তো মনে করি, শুদ্ধ নৃত্য চর্চা মানেই হলো দেশকে ভালোবাসা।’ আমাদের কথার ফাঁকে সুজিতদা মনোযোগ সহকারে তার আদুরে ল্যাপটপ চালাচ্ছিলেন। এবার তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, ‘প্রতি বছর নজরুলকে উৎসর্গ করে নজরুল মেলা করেন। কেমন সাড়া পান? ‘প্রতি বছরই এই অনুষ্ঠানটি করার পরিকল্পনা থাকে। অনেক সময় পারি, আবার অনেক সময় পারি না। কারণ স্পন্সর নেই।’ নজরুল সংগীত প্রসারে উদ্যোগের ঘাটতি আছে কি? ‘তা তো আছেই।’ তিনি কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই কথাটা বললেন। ‘এক্ষেত্রে কারণ কিন্তু অনেক। নজরুল গানের ওপর অনেকেই কিন্তু প্রতিষ্ঠিত। তবে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে পরিমাণ অর্গানাইজেশন আছে, নজরুলকে নিয়ে সে পরিমাণ নেই। আর নজরুল কর্পোরেট কালচারের কবি নন। রবীন্দ্রসংগীত বা অন্যান্য গান গাওয়াটা যেমন সহজ, নজরুল সংগীত গাওয়াটা তেমন সহজ নয়। ইদানীং তো খাতিরের লোকদের বেশি বেশি প্রোগ্রাম দেওয়া হয়। চ্যানেল মালিকরা তাদের পছন্দের লোকদের প্রোমোট করে থাকেন। এটা একটা ব্যাড সিগন্যাল! নজরুলই হোক, রবীন্দ্রনাথ বা অন্য কোনো সংগীত মাধ্যম-সর্বক্ষেত্রেই যথাযথ মূল্যায়ণ দরকার।’ নজরুলগীতির স্বরলিপি সংরক্ষণের গুরুত্ব কম কেন?

শোবিজ স্পেশাল আড্ডায়  সুজিত মোস্তফা ও মুনমুন আহমেদ

‘আসলে রবীন্দ্রনাথের গান স্বরলিপির মধ্যে আনা সহজ, কিন্তু নজরুলের সহজ নয়। নজরুলের স্বরলিপি সংরক্ষণে গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে; ব্যাকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আসলে স্বরলিপির মধ্যে কোনো গায়কী থাকে না। ভালোভাবে না শিখলে গায়কী বা নায়কী কিভাবে বোঝা যাবে! আর রেকর্ড থেকে হুবহু গান গাওয়ার শিল্পী তেমন নেই বললেই চলে। আমার কাছে নজরুল সংগীতের প্রায় ৯৫% শিক্ষার্থী মেয়ে। এখন অনেকেই গান শেখার প্রতি সিরিয়াস না। ঘরে বসেই কোনো রকমে গান বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়ে দিচ্ছে।’ এবার সিরিয়াস আলাপ ছেড়ে সুজিত মোস্তফার কাছে তাদের প্রেম-ভালোবাসার গল্প শোনার আবদার করলাম।

‘মুনমুনের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয় ঢাকায়। তখন প্রথম সার্ফ গেমস বাংলাদেশে চলছিল। সেখানে যে কালচারাল প্রোগ্রাম করেছিল সেখানে সে সার্চ করেছিল। আমি তখন গ্রুপ গানের মধ্যে ছিলাম। সেটা ৮৫ সালের কথা। আমি দেখলাম, একটা রোগা, পাতলা, লম্বা, সুন্দরী একটি মেয়ে। কিন্তু তখন আমি তার সঙ্গে ভাব-ভালোবাসায় যাইনি। এরপর মুনমুন-আমিসহ সাতজন দিল্লির শ্রীরাম ভারতীয় কলা কেন্দ্রে গেলাম নাচ-গান শিখতে। একসঙ্গে থাকার সুবাদে পরিচয়টা গাঢ় হয়। এরপর ভালোলাগা, ভালোবাসা।’ কে আগে ভালোবাসা প্রকাশ করে?

‘আমাদের দেশে মেয়েরা আগে ‘ভালোবাসি’ বলে না। মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। অতএব বলতে আমাকেই হয়েছিল। আমি খুবই জিদি মানুষ। জোর করেছি আমিই। তার জন্য গান বানিয়ে গানও গেয়েছি। একটি অনুষ্ঠানে মুনমুনকে ঘিরে একটি প্রজাপতি উড়ছিল। আমি ওইটা দেখতে দেখতে তৎক্ষণাৎ গান বেঁধে ফেললাম। গান শোনার পর তার চোখে তখন মুগ্ধতা দেখতে পেয়েছিলাম।’ তিনি কথার মাঝখানেই হারমোনিয়াম নিয়ে গানটি গেয়ে শোনালেন। ‘তোমার আশপাশে একটা প্রজাপতি উড়ছিল, তোমায় একটা ফুল ভেবে সে ঘুরছিল। কেউ বলেনি, তার সে ভাবনায় ভুলছিল...।’ তিনি গান শোনানোর পর বললেন, ‘এখন প্রেমের গভীরতা কমে গেছে। আগে তো ভালোবাসার কথা প্রকাশ করতে, বলার সাহস সঞ্চয় করতে দীর্ঘ সময় লেগে যেত।’ তবে মুনমুন আহমেদ এই ভালোবাসার প্রকাশ নিয়ে একটু অভিমান দেখালেন। তিনি বললেন, ‘কই, তিনি তো এখনো আমাকে ভালোবাসার কথাই প্রকাশ করেননি। ওরকম ইনডারেক্ট প্রপোজাল তিনি অনেক করেছেন। আমরা আসলে সেই সময়ে একসঙ্গে পড়াশোনার খাতিরে চা খেয়ে আড্ডা দিতাম, সিনেমা দেখতাম, গল্প করতাম। কেউ কাউকে সেভাবে ভালোবাসি বা প্রপোজাল দেওয়া সেভাবে হয়নি। আর প্রপোজাল দিলে তো বুঝতেই পারতাম।’ তার কথার মজাতে সবাই হাসতে লাগলেন। তবে সুজিতদা শোনালেন অন্য কথা।

‘আমি একটু ডোমিনেটিং টাইপের। আমি ওর সঙ্গে কোথাও না যেতে পারলে ওকেও যেতে দিতাম না। তার সঙ্গে কিন্তু আমার নবম প্রেম...হা হা হা।’

আপনাদের সংসার শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?

মুনমুন বললেন, ‘বাড়িভাড়া নিয়ে স্কুল করার চিন্তা ছিল। নাচ-গানের শিক্ষার্থী জোগাড়ের প্রয়াস ছিল।’  কথাকে কেড়ে নিয়ে সুজিতদা বললেন, ‘শুরুর গল্পটা প্রেথেটিক ছিল। ও নাচ শিখবে বলে একটি বিশাল বাড়ি ভাড়া নিয়েছি। ওর কাছে তখন অনেকে কমিট করেছিল, নাচ শিখবে। আমার কাছে গান শিখতে আসবে। সেজন্য এটি ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে, মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখে অপেক্ষা করেছি। পরে দেখা গেল, একটাও শিখতে আসেনি। কেউ কারও দিকে তখন তাকাতে পারছি না। ও চোখে পানি ফেলছে। যাই হোক, আমার এক মামাতো বোনকে কোনোরকম রাজি করিয়ে ও শুরু করল স্কুল।’ তিনি আবার বলা শুরু করলেন, ‘আমাদের বিয়েও হয়েছে গরিবী হালে। তাই তথাকথিত সেই যৌতুক আদান-প্রদানও হয়নি। অর্থাৎ ১৯৯৪ সালে আমি একদিন কলকাতায় গেছি প্রথম অ্যালবামের রেকডিং করব বলে। আমি যেদিন ফিরব সেদিন ওকে ফোন করে বললাম, এয়ারপোর্টে তোমার স্টুডেন্টকে বলো একটা গাড়ি নিয়ে আসতে রিসিভ করার জন্য। এয়ারপোর্টে এসে দেখলাম গাড়ি এসেছে কিন্তু সে আসেনি। পরে শুনলাম সে আনন্দমেলা নামে একটি অনুষ্ঠানে গেছে। আমার তো শুনে পিত্তি জ্বলে গেল। বাসায় এলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম। এদিকে আমার কাপড় চোপড় সবই এক আলমারিতে আটকানো। রাগ তো বেড়েই যাচ্ছে।’

কথার মাঝেই মুনমুন বলে উঠলেন, ‘তখন ছিল আমাদের এক আলমারি সংসার। চাবি আমার কাছে। ও তো সেদিন একটি ময়লা লুঙ্গি ও খালি গায়ে ঘুরছে। আমি রাত ১১টায় এলাম।’ তার কথার পিঠে আবারও সুজিতদা কথা যোগ করে বলতে লাগলেন,

‘যাই হোক। বাইরে হর্নের শব্দ। তাকিয়ে দেখি বাড়ির ভিতরে একটি ট্রাক ঢুকছে। ওই ট্রাকের ড্রাইভারের পাশে বসে আছে সে।’ ট্রাকের ভিতরে কেন? প্রশ্নটা করতেই মুনমুন আহমেদের উত্তর, ‘দর্শক হিসেবে সেদিন আনন্দধারার অনুষ্ঠানে কুপনে জিতেছিলাম তৃতীয় পুরষ্কার। মাইক্রো ওয়েভ ওভেন, ওয়াশিং মেশিন, ফ্রিজ, ইস্ত্রি, গ্যাস কুকারসহ একগাদা পুরস্কার নিতে ট্রাক লেগেছিল।’ তার কথা শেষ না হতেই সুজিতদা মজা করে বলে উঠলেন, ‘তিনি ট্রাক থেকে নেমে আমার সামনে এসে বললেন, নেন, বিয়েতে তো তেমন কিছু দিতে পারিনি, এই নিন যৌতুক।’

ট্রাককাহিনী তো শুনলাম, আপনি যে নিয়মিত সাইক্লিং করেন সে বিষয়ে জানতে চাই?

মুনমুন খোলাসা করেই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করলেন, ‘দেখুন সাইক্লিং করলে অনেক উপকার হয়। তিনটি কাজের জন্য সাইকেল চালাই। প্রথমত, টাকা বাঁচাই মানে রিকশা ভাড়া, দ্বিতীয়ত সময় বাঁচাই আর তৃতীয়ত শরীর বাঁচাই। একটি সাইক্লিং গ্রুপের সঙ্গেও বিভিন্ন র‌্যালি ও প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নেই।’ আর মুনমুন কিচেন রহস্য? ‘খাঁটি বাঙালি খাবার পরিবেশন করার জন্যই মূলত এই উদ্যোগ। ভালোই চলছে। মাঝে মাঝে সময় দেই।’ বয়সকে কী হিসেবে দেখেন?

মুনমুন বলেন, ‘বয়স সংখ্যা হিসাবের ব্যাপার বটে। আমি তারুণ্যে বিশ্বাসী। বয়স বাড়ছে, আমি অনুভব করি না। এখনো সাইকেল চালাই, সাঁতার কাটি।’

সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জাদু কী?

‘সমঝোতা ও বিশ্বস্ততা। দুজন দুজনকে বিশ্বাস করতেই হবে। বিশ্বাস ও বিশ্বস্ততা খুব জরুরি। সংসার জীবনে কথা-কাটাকাটি, ঝগড়াঝাটি বা মতের অমিল হবেই। তারপরও একটা বোঝাপড়ায় চলে আসতে হবে। আমাদের ভালোবাসাটা কিন্তু এখনো অটুট।’ সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করলেন সুজিত মোস্তফা।

মেয়ে অপরাজিতা কার মতো হয়েছে?

মুনমুন আহমেদের উত্তর, ‘সে আসলে তার মতো হয়েছে। সে যেমন নাচ শিখেছে আমার কাছ থেকে। সেটা সে তার সাবজেক্ট হিসেবে নিয়েছে। সে প্রচুর গান শোনে, গান নিয়ে তার লেখালেখি। কিন্তু গাইতে চায় না। তার ধারণা তার গলা তেমন মধুর নয়। আমাদের আইডলজি কিছুটা ধারণ করলেই, সে তার নিজস্ব জগৎ নিয়ে থাকে।’

হুমায়ূন আহমেদের ছবিতে অভিনয় করেছিলেন মুনমুন আহমেদ। তাকে হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন করতেই দীর্ঘঃশ্বাস নিয়ে উত্তর দিলেন, ‘তিনি ছিলেন অসাধারণ মানুষ! তার দুটি ছবিতে অভিনয় করেছিলাম-‘আমার আছে জল’ এবং ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’।

সুজিত মোস্তফা নামে পরিচিত হলেও আপনার ডাকনাম বিদ্যুৎ। নামটির রহস্য কী?

‘ছোটবেলায় খুব চঞ্চল ছিলাম। বিদ্যুৎগতিতে ঘরের সব কিছু ভেঙে ফেলতাম। চলাফেরায়ও...। তাই মা-বাবা আমার ডাকনাম রাখেন বিদ্যুৎ।’ হাসতে হাসতে বললেন সুজিত মোস্তফা। ঘড়ি পরার শখ সুজিতদার। ফসিল, রাডো ব্র্যান্ডের ঘড়ি নিয়মিত পরেন। উৎসবে-আনন্দে নানা অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবি পরার চেষ্টা করেন। স্ত্রী মুনমুনের কিনে দেওয়া যেকোনো পাঞ্জাবিতেই সাচ্ছন্দ্য তিনি। সাইকেল চালানোর শখও আছে তার। আড্ডা দিয়ে একটা বিষয়ে ধারণা হলো আমাদের-‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কখনই পুরনো হয় না। বর্ণিল আনন্দ ফিকে হয়ে আসে না দাম্পত্য জীবনের বহুদিন পেরিয়ে গেলেও।’ তারা দুজনেরই বিশ্বাস, সময় কখনো ভালো কখনো মন্দ। তবু জীবন বহমান। আমাদের প্রতিদিনের স্বপ্ন থাকে আসছে দিন হবে স্বস্তি, সুখ আর আনন্দের। সেরকম সরল সময় আসে কিনা জানি না, ভাবতে হবে আমি সুখী, এখনই আমার আনন্দের দিন। এটুকু বিশ্বাসই বাঁচিয়ে রাখে আমাদের।


আপনার মন্তব্য