শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ এপ্রিল, ২০১৮ ২৩:২৪

সাকিব কি আজীবন খেলবেন

মেজবাহ্-উল-হক

সাকিব কি আজীবন খেলবেন
Google News

সাকিব আল হাসানের তুলনা কেবল সাকিব নিজেই! বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রীড়াবিদ। সবচেয়ে জনপ্রিয়ও। দেশ স্বাধীনের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার ছিলেন কাজী সালাউদ্দীন। বাংলাদেশের একমাত্র ফুটবলার যিনি ১৯৭৬ সালে ব্রিটিশ শাসিত হংকংয়ের জাঁকজমক পেশাদার লিগে খেলেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সারা ফেলেছিলেন। কিন্তু সাকিব সাফল্য এবং জনপ্রিয়তায় ছাপিয়ে গেছেন সালাউদ্দীনকেও! বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশকে চেনে সাকিবের নামেই! আর কেনই-বা চিনবে না? সাকিব যে ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার যিনি আইসিসির অলরাউন্ডার র‌্যাঙ্কিংয়ে এক সঙ্গে টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-২০—তিন ফরম্যাটেই শীর্ষে উঠেছেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে অধিনায়ক রেকর্ডই সাকিবের দখলে! টেস্ট ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ স্কোরের  মালিক তিনি। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে খেলেছিলেন ২১৭ রানের স্কোর। ওই ম্যাচে মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে ৩৫৯ রানের একটি পার্টনারশিপ গড়েছিলেন। এখন পর্যন্ত টেস্টে সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপ।

ওয়ানডে ক্রিকেটেও সর্বোচ্চ রানের জুটিতে রয়েছেন সাকিব। শেষ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যুক্তরাজ্যের কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের সঙ্গে গড়েছিলেন ২২৪ রানের ঐতিহাসিক এক জুটি। শুধু বাংলাদেশেই নয়, পঞ্চম উইকেট জুটিতে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ইতিহাসেই সর্বোচ্চ রানের জুটি। শ্রীলঙ্কার মুত্তিয়া মুরালিধরন, রঙ্গনা হেরাথ ও দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার ডেল স্টেইনের পর ক্রিকেট ইতিহাসের চতুর্থ ক্রিকেটার হিসেবে বিশ্বের প্রত্যেক টেস্ট খেলুড়ে দেশের বিরুদ্ধে (আফগানিস্তান ব্যতীত) এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকারের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সাকিব। তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে এক টেস্টে ১০০ উইকেট শিকার এবং সেঞ্চুরির রেকর্ডও করেছেন। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার টেস্টে ৬ বার ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন। ম্যান অব দ্য সিরিজও হয়েছেন ৪ বার। টেস্টে ১০টি করে উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব রয়েছে দুবার। ওয়ানডেতে সাকিব ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ এর পুরস্কার জিতেছেন মোট ১৮বার। ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ হয়েছেন ৫বার।  টি-২০ ক্রিকেটে তিনবার ম্যাচসেরা এবং একবার সিরিজ সেরা। —এসব তো সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিসংখ্যান। কিন্তু সাকিব তো এখন বিশ্বের সেলিব্রেটি টি-২০ লিগগুলোও মাতিয়ে বেড়াচ্ছেন। চলতি মৌসুমে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের জার্সিতে আইপিএল মাতাচ্ছেন। একদিন আগেই সব ধরনের টি-২০ ক্রিকেট মিলে ৩০০ উইকেট শিকারের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ৪ হাজারের উপরে রানও করেছেন। সাকিব কখনো ভারতীয় প্রিমিয়ার লিগ, কখনো অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশে, কখনো ইংল্যান্ডের কাউন্টি, কখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্যারিবীয় ক্রিকেট লিগে আবার কখনো পাকিস্তান সুপার লিগে খেলছেন। সব লিগেই তার দ্যূতি ছড়াচ্ছেন। বাংলাদেশের জার্সি গায়ে এখন পর্যন্ত ৫১ টেস্টে ৪০.৩৮ গড়ে করেছেন ৩ হাজার ৫৯৪ রান। ৫টি সেঞ্চুরি সঙ্গে ২২টি হাফ সেঞ্চুরি। উইকেট নিয়েছেন ১৮৮টি। ওয়ানডেতে ১৮৫ ম্যাচ খেলে করেছেন ৫ হাজার ২৪৩ রান। ৭টি সেঞ্চুরির সঙ্গে ৩৭টি হাফ সেঞ্চুরি। উইকেট নিয়েছেন ২৩৫টি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সত্যিকারের সুপারস্টার সাকিব। সব্যসাচী এক ক্রিকেটার। টাইগারদের অধিকাংশ জয়েই বড় ভূমিকা তার। সাকিব একাধারে দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান এবং অন্যতম সেরা বোলার। ২০০৭ সালে অভিষেকের পর থেকে রেকর্ডের পর রেকর্ড গড়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। বাংলাদেশ দল এখন অতিমাত্রায় সাকিবনির্ভর হয়ে পড়েছে! তাই তো দেখা যায়, ঘরের মাঠে সব শেষ সিরিজে সাকিব ইনজুরিতে পড়ার পর লঙ্কানদের কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে যায় বাংলাদেশ। বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডারের অভাব পূরণ করতে পারেননি কোনো ক্রিকেটার। সাম্প্রতিক বাংলাদেশ দলের চিত্র অনেকটা এমন— সাকিব থাকলে দল যত বেশি উজ্জীবিত হয়, না থাকলে অনেক বেশি ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু সাকিব তো আর সারা জীবন খেলবেন না! ৩২ বছরে পা দিয়েছেন। হয়তো আরও বেশ কিছু বছর খেলবেন। কিন্তু সাকিবের অবসরের পর তার অভাবটা পূরণ করবে কে? ব্যাটিং জিনিয়াস শচীন টেন্ডুলকার অবসর নেওয়ার আগেই বিরাট কোহলিকে খুঁজে বের করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড। মাইকেল ক্লার্কের বিদায়ের আগেই স্টিভেন স্মিথকে নিয়ে এসেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। তাই টেন্ডুলকার ও ক্লার্কের বিদায়ের পর তাদের অভাব বোধ করেনি ভারত-অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সাকিবের বদলি হিসেবে কাকে ভাবছে? বিসিবির চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারদের মধ্যে স্পিনিং অলরাউন্ডার হিসেবে রয়েছেন মেহেদী হাসান মিরাজ। যিনি বল হাতে ক্যারিশমা দেখালেও ব্যাট হাতে নিজেকে চেনাতে পারেননি। মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে ‘নতুন সাকিব’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। কিন্তু এই অলরাউন্ডার তো নিয়মিত দলেই সুযোগ পান না। সাম্প্রতিক কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ দিয়ে মোসাদ্দেকের আত্মবিশ্বাসে আরও আঘাত করেছে বিসিবি। এমন অবস্থায় সাকিবের ‘রিপ্লেসমেন্ট’ নিয়ে কি আদৌ কোনো কিছু ভাবছে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা-বিসিবি? নাকি কর্তা বাবুরা ভাবছেন সাকিব আজীবন খেলে যাবেন, আর তারা কেবল সাফল্য উদযাপন করবেন! বিসিবি-কে মরমী সাধক লালন শাহ-এর গানটি শোনাবে কে—  ‘সময় গেলে সাধন হবে না!’