Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:১৮

পুরনো থেকে বেরিয়ে নতুন পথে বাফুফে!

কথায় কথায় কোচ বদল

ক্রীড়া প্রতিবেদক

পুরনো থেকে বেরিয়ে নতুন পথে বাফুফে!

পুরনো অভ্যাস বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের। আপাতত দৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে। বর্তমান কোচ জেমি ডে হতে পারে এর বড় উদাহরণ। ১৯৭৩ সাল থেকেই ফুটবলে জাতীয় দল গঠন হয়। মারদেকা কাপ দিয়েই আন্তর্জাতিক আসরে অভিষেক বাংলাদেশের। ৪৫ বছরে বাফুফে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে কম কোচ নিয়োগ দেয়নি। কিন্তু কোনো কোচের স্থায়িত্ব বেশিদিনের নয়। টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হলেই কোচ বিদায় বা কেউ স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছে। ৪৫ বছরে বিদেশি কোচের সংখ্যাই বেশি। অবশ্য যতটুকু সাফল্য এসেছে সেখানে বিদেশি কোচেরই প্রাধান্য বেশি। পরবর্তীতে সেই বিদেশি কোচদের বিদায় হয়েছে করুণভাবে।

অটো ফিস্টার, সামির সাকির, জর্জ কোটান ও জোয়ান জর্জভিচের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। এই চারজন বিদেশি কোচই বাংলাদেশকে শিরোপা উপহার দিয়েছেন। আসলে একটা দলকে দাঁড় করাতে যে সময়টা দরকার তা কোনো কোচকেই দেওয়া হয়নি। সময় দেবে না, অথচ এক টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হলেই কোচ চাকরিচ্যুত! তা যেন বাফুফের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। ফুটবল মানের উন্নতি না ঘটুক ৪৫ বছরে কথায় কথায় কোচ রদবদলে বাফুফে যেন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ফেলেছে। মান সম্পন্ন কোচদের দায়িত্ব দেওয়ার পরও এক টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন না হওয়ায় কতজনকে অপমান করে বরখাস্ত করা হয়েছে তার হিসাব মেলানো মুশকিল।

তবে বেশ কজনার নাম উল্লেখ করার মতো। নাসের হেজাজি ১৯৭৮ বিশ্বকাপে ইরানের গোলরক্ষক ছিলেন। ১৯৮৭ সালে তাকে খেলোয়াড় হিসেবেই ভারত থেকে উড়িয়ে আনে ঢাকা মোহামেডান। আসার পর তাকে দলের কোচেরও দায়িত্ব দেওয়া হয়। মোহামেডানের কোচ হওয়ার পর ফুটবলারদের মধ্যে অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ১৯৮৭ সালে দল অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হলে পরের মৌসুমেও মোহামেডান তাকে রেখে দেয়। তারই প্রশিক্ষণে এশিয়ান ক্লাব কাপ বাছাই পর্বে ইরান চ্যাম্পিয়ন পিরুজিকে হারিয়ে আলোড়ন তুলে মোহামেডান। সেই থেকে হেজাজি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ফুটবলে মধ্যমণি।

১৯৮৯ সালে তাকে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব নেওয়ার আগে হেজাজি বাফুফের কর্মকর্তাদের বলেন, বাংলাদেশকে এশিয়ার সেরা দলে পরিণত করা সম্ভব। এ জন্য তিনি মাত্র দুই বছর সময় চান। বাফুফে রাজিও হয়ে যায়। কিন্তু ইসলামাবাদ সাফ গেমসে ফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারার পরই হেজাজিকে বিদায় জানানো হয়। শুধু তাই নয়, তাকে মোহামেডানের চর বলে অপমানিত করা হয়েছিল।

জার্মানির অটো ফিস্টার। অনেকটা বিনা বেতনেই তিনি ১৯৯৪ সালে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। জার্মানির সঙ্গে সাংস্কৃতিক-ক্রীড়া চুক্তির বিনিময়ে ফিস্টারকে পাওয়া যায়। ১৯৯৫ সালে তারই প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ বিদেশে প্রথম ট্রফি জিতে। মিয়ানমার চ্যালেঞ্জ কাপে ফাইনালে মিয়ানমারকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। সে বছরই মাদ্রাজ সাফ গেমসে তার প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ রুপা জিতে। ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যায়। ব্যস্ এতেই চাকরিচ্যুত।

অটো ফিস্টারকে অযোগ্য কোচ বলে তাড়ানো হয়। অথচ তিনি যে কতটা যোগ্য তার প্রমাণ মিলে বিশ্বকাপে বিভিন্ন দেশের দায়িত্ব পালনে। সামির সাকিরের ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইরাকের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার মাঠে আবাহনীর পক্ষে খেলেন। ১৯৯৯ সালে নেপাল সাফ গেমসে তাকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রথমবারের মতো লাল সবুজের দল সোনার পদক জিতে তারই প্রশিক্ষণে।

এমন সাফল্য আসার পরও সামিরের কপাল পুড়ে। একই বছরে গোয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে ভারতের কাছে হারলে বিদায়। আভিযোগ রয়েছে যাওয়ার সময় সামিরের বকেয়াও ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। অবশ্য ওই সময়ে বাফুফে থেকে বলা হয়েছিল স্বেচ্ছায় জাতীয় দলের দায়িত্ব ছাড়েন সামির। জজ কোর্টান, অস্ট্রিয়ান কোচ। ২০০৩ সালে তারই প্রশিক্ষণে ভুটানে আমন্ত্রণমূলক ফুটবল ও ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়। কোটান দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশের ফুটবলে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। খেলোয়াড়দের ভাষ্য ছিল অনেক দিন পর যোগ্য গুরু খুঁজে পেয়েছি আমরা। কোটানও বাংলাদেশের ফুটবল বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাফুফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথায় বনিবনা না হওয়ায় কোটানকে বরখাস্ত করা হয়। ২০১০ সালে সার্বিয়ান কোচ জোয়ান জর্জভিচের প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল এস এ গেমসে সোনা জিতে। তাকে অবশ্য বরখাস্ত নয়, বাফুফের কর্মকর্তাদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে নিজেই চলে যান।

ফুটবলে বার বার কোচ বদলের কালচারটা নতুন নয় অনেক আগে থেকেই। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন শুধু জাতীয় দলে খেলেননি, প্রশিক্ষকেরও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তারই প্রশিক্ষণে ঢাকায় সাফ গেমসে বাংলাদেশ রানার্স আপ হয়। নব্বই দশকেও পুনরায় দায়িত্ব পান। কিন্তু সাফল্য না পাওয়ায় তিনিও টিকতে পারেননি। যে নেদারল্যান্ডসের লোড ডি ক্রুইফকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বাফুফে কোচের দায়িত্ব দেয়। তাকে একবার নয় দুবার বহিষ্কার করা হয়।

কোচ তাড়ানোর হিসাব লিখে শেষ করে যাবে না। তবে এই অভ্যাস থেকে বাফুফে বের হয়ে আসছে। পুরনো থেকে বেরিয়ে নতুন পথে বাফুফে যেন হাঁটছে। যার বড় উদাহরণ হতে পারেন ইংলিশ কোচ জেমি ডে। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ টানা দুই টুর্নামেন্টে তার প্রশিক্ষণে ব্যর্থ বাংলাদেশ।

তাকে আপাতত ফিস্টারদের পথে হাঁটতে হয়নি। বাফুফে তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে রেখে দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কত দিন? গুঞ্জন উঠেছে জেমি নাকি কর্মকতাদের কাজে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। বিশেষ করে ফিফা উইন্ডোতে প্রীতি ম্যাচ খেলতে না যাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ। বিনা কাজে তিনি বসে থাকতে চান না। সুতরাং জেমি আবার স্বেচ্ছায় চলে যান কি না সেই প্রশ্নটাও থেকে যাচ্ছে।

 


আপনার মন্তব্য