শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ মার্চ, ২০২০ ২৩:২৪

স্বপ্নিল অভিষেক বসুন্ধরা কিংসের

রাশেদুর রহমান

স্বপ্নিল অভিষেক বসুন্ধরা কিংসের
ছবি : রোহেত রাজীব

তিনি দুরন্ত। ডি বক্সের আশপাশে বল পায়ে পেলেই গোল করতে বেশ পটু। ল্যাটিন আমেরিকান ডিফেন্স বারবার পরাজিত হয়েছে তার পায়ের জাদুকরী স্পর্শে। উপমহাদেশের ফুটবলীয় অস্ত্রে তাকে রুখে দেওয়া দুঃসাধ্য। এসব তো জানা কথাই ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শকদের কাছে দিনের আলোয় যা ঘটে গেল তা গভীর রাতের স্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে মেসির পাশে খেলা হারনান বারকোসের একেকটা আক্রমণে তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়ল টিসি স্পোর্টসের ডিফেন্স লাইন। প্রবল বন্যার সামনে কি আর বালির বাঁধ দিয়ে স্রোত বন্ধ করা যায়! সে আপন গতিতে ছুটতে থাকে। নিজের পথ নিজেই করে নেয়। বারকোস সত্যিই বহমান স্রোতের ধারার মতোই বয়ে গেলেন। একে একে ৪টি গোল করলেন। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বসুন্ধরা কিংসকে স্বপ্নের অভিষেক উপহার দিলেন। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে গতকাল মালদ্বীপের ক্লাব টিসি স্পোর্টসকে ৫-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরা কিংস।

একেকটি গোল করছেন বারকোস আর কিংস ফুটবলাররা সম্মিলিতভাবে ‘পাইরেট সাইন’ দিয়ে উদ্যাপন করছেন। বারকোস সাধারণত নিজের গোল এভাবেই উদ্যাপন করেন। এবার তার কাছ থেকে বিদ্যাটা শিখে নিলেন কিংসের অন্যরাও। এমনকি কোচ অস্কার ব্রুজোনও। এক চোখ এক হাতে বন্ধ রেখে মুষ্টিবদ্ধ অন্য হাত উঁচিয়ে ধরা। বেশ কয়েকবারই কিংস ফুটবলাররা এমন অভিনব কায়দায় উদ্যাপন করলেন হারনান বারকোসের সৌজন্যে। মাঠে নেমে আড়ষ্টতা কাটাতে কিছুটা সময় লাগল হারনান বারকোসের। ওই সময়টুকুই যা খেলল টিসি স্পোর্টস। তারপর কেবল দর্শকের মতো চেয়ে চেয়ে দেখল বারকোসের দৃষ্টিনন্দন গোলগুলো। ম্যাচের ১৮ মিনিটে কলিনড্রেসের পাসে বল পেয়ে নিচু করা হেডে গোল করেন বারকোস। এএফসি কাপে কিংসকে প্রথম গোলটা উপহার দিলেন বারকোসই। তবে ২ মিনিটের মধ্যেই পেনাল্টিতে গোল করে সমতায় চলে আসে টিসি স্পোর্টস। জিকো অবশ্য পেনাল্টি শটটা ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরতি বলে গোল করে টিসি স্পোর্টসকে সমতায় ফেরান ইসা ইসমাইল। মনে হচ্ছিল, ম্যাচটা বুঝি বেশ উত্তেজনা ছড়াবে। উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঠিকই। তবে তা হারনান বারকোসের গোল আর রেফারির বাজে এক পেনাল্টির সিদ্ধান্তে। ম্যাচের ২৬ মিনিটে বারকোসের গোলে এগিয়ে যায় কিংস। দ্বিতীয়ার্ধে ৫৩ মিনিটে এক বিতর্কিত পেনাল্টি দেন রেফারি। দেলমন্তের গায়ে জড়িয়ে টিসির এক ফুটবলার ডি বক্সে পড়ে গেলে পেনাল্টির বাঁশি বেজে ওঠে। এখানেই নাটক জমে ওঠে। প্রথমবার সেভ করার পর লাইনসম্যানের ইশারায় দ্বিতীয়বার পেনাল্টি শট নেওয়ার নির্দেশ দেন রেফারি ইভান্স। দুবারই পেনাল্টি সেভ করেন কিংস গোলরক্ষক জিকো। এ পেনাল্টি নিয়ে ব্রুজোন বললেন, পেনাল্টিটা ছিল না। কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে কঠোর কোনো সমালোচনা করা থেকেও বিরত থাকলেন তিনি। তবে তিনবার পেনাল্টি শট রুখে দেওয়া জিকোর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন ব্রুজোন। বারকোস হ্যাটট্রিক পূরণ করেন ৬৮ মিনিটে, পেনাল্টি গোলে। কিংসের ৪ নম্বর গোলটা করেন অধিনায়ক ড্যানিয়েল কলিনড্রেস (৭৬)। বিশ্বনাথের পাসে বল পেয়ে হেডে গোলটা করেন তিনি। এরপর ম্যাচের যোগ করা সময়ে বারকোস নিজের চতুর্থ ও কিংসের পঞ্চম গোলটি করেন। কলিনড্রেসের গোলমুখী শট ফিরিয়ে দেন মালদ্বীপের গোলরক্ষক। কিন্তু ফিরে আসা বল পেয়ে আলতো করে শটে গোল করেন বারকোস। কিছুক্ষণ পরই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজান রেফারি। প্রবল উল্লাসে ফেটে পড়ে দর্শকরা। কিংস ফুটবলারদের ‘স্ট্যান্ডিং ওভিশন’ দেয় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের কয়েক হাজার সমর্থক।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সবুজ চত্বরে লিওনেল মেসির পদচারণ আছে। এ মাঠে মেসির সতীর্থদের অনেকেই ছিলেন তখন। কিন্তু সে ছিল ভিন্ন আঙ্গিকের এক ম্যাচ। মেসির সতীর্থদের কেউ বাংলাদেশের ক্লাবের জার্সিতে বাংলাদেশের ফুটবলারদের পাশে থেকে খেলবেন, এ তো স্বপ্নের মতোই। গতকাল বিপলুর সঙ্গে বারকোসের জুটি বাংলাদেশের ফুটবলেরই এক উজ্জ্বল দিক যেন তুলে ধরল। যেখানে অন্ধকার কেটে গিয়ে কেবল আলোর ঝলকানি দেখা গেল। কোচ অস্কার ব্রুজোন যেমনটা বলে গেলেন, ‘বারকোস আমাদের সেরা তারকা নিঃসন্দেহে। কিন্তু তাকে ঘিরে থাকা দলটাকেও কম ভাববেন না। কলিনড্রেস, বিপলু, বখতিয়ারদের দেখুন কি অসাধারণ ফুটবল খেলছে।’ সত্যিই। বসুন্ধরা কিংস বাংলাদেশের ফুটবল-অঙ্গনে এক উত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে; যা অন্য ক্লাবগুলো অনায়াসে অনুসরণ করতে পারে। হয়তো কাক্সিক্ষত গন্তব্য খুব শিগগিরই চোখের সামনে ভেসে উঠবে।


আপনার মন্তব্য