Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১২:২৭ অনলাইন ভার্সন
নগর কেন্দ্রে বস্তির ঝুঁকি
জয়শ্রী ভাদুড়ী

নগর কেন্দ্রে বস্তির ঝুঁকি
অভিজাত গুলশানের পাশে কড়াইল বস্তি মাদক ও সন্ত্রাসের আখড়া হিসেবে পরিচিত ছবি : জয়ীতা রায়
bd-pratidin

মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ১০৫ একর জায়গার ১০০ একর দখল করে গড়ে উঠেছে সাততলা বস্তি। বস্তির আবর্জনা আর ভাসমান মলমূত্রে হাসপাতাল এলাকা পরিণত হয়েছে ডাস্টবিনে। এদিকে রাজধানীর গুরুত্বপূূর্ণ এলাকা গুলশানের পাশেই গড়ে উঠেছে কড়াইল বস্তি। মাদক আর ভোটের রাজনীতির টানাপড়েনে বস্তির ঝুঁকিতে রয়েছে নগর কেন্দ্র।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ‘বস্তিশুমারি ও ভাসমান লোক গণনা-২০১৪’ জরিপের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলে ৩ হাজার ৩৯৯টি বস্তি রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ২ হাজার ২০৮টি, কুমিল্লায় ৪১টি, গাজীপুরে ১ হাজার ২৮৭টি, খুলনায় ১ হাজার ১৪৩টি, রাজশাহীতে ১০৩টি, রংপুরে ৪৯টি, সিলেটে ৬৬৭টি এবং বরিশালে ১৩৭টি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বস্তিতে আসার কারণ হিসেবে অর্ধ শতাধিক পরিবার বলেছে, কাজের সন্ধানে তারা বস্তিতে এসেছে। ২৯ শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা দারিদ্র্যের কারণে শহরে এসেছে। এক শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা নদীভাঙনসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নিঃস্ব হয়ে বস্তিতে বাস করছে। এক শতাংশ মহিলা বলেছে, ডিভোর্স হয়ে যাওয়ায় অসহায় হয়ে তারা বস্তিতে বসবাস করছে। দুই শতাংশ পরিবার বলেছে, তারা নিরাপত্তাহীনতার কারণে ভিটেমাটি ও গ্রাম ছেড়েছে, এখন বস্তিতে বসবাস করছে। দেশের ২২ লাখ ৩২ হাজার মানুষ বস্তিতে বাস করে। তাদের মধ্যে ১১ লাখ ৪৩ হাজার পুরুষ ও নারীর সংখ্যা ১০ লাখ ৮৬ হাজার। এসব মানুষের বেশির ভাগই কাজের সন্ধানে ঘরছাড়া হয়ে শহরের বস্তিতে বসবাস করছে। আগের জরিপটি করা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। তখন দেশে বস্তির সংখ্যা ছিল তিন হাজার। এ হিসাবে দেশে গত ১৭ বছরে বস্তির সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে চার গুণ। এসব বস্তি খুবই নিম্নমানের ও ছোট ছোট ঘরবাড়ি নিয়ে গড়ে উঠেছে। বস্তি মূলত ঝুপড়ি, টং, ছই, টিনের ঘর, আধা-পাকা ভবন এবং জরাজীর্ণ দালান। এখানে অপরিষ্কার পানি সরবরাহ এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকছে মানুষ। একটি টয়লেট ব্যবহার করে ১৫ জনের বেশি মানুষ।

বিবিএস বলছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিত্যক্ত ভবনে, পাহাড়ের ঢাল, সড়ক বা রেললাইনের ধারে, সরকারি, আধা-সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন খালি জমিতে গড়ে উঠেছে শহরের বস্তিগুলো। এ সংখ্যা প্রায় ১৪ হাজার। সরেজমিন কড়াইল বস্তিতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ছোট ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকছে মানুষ। একটি ছোট ঘরে ১২ জন মানুষের দুটি পরিবার থাকে। কোথা থেকে এসেছেন জানতে চাইলে মরিয়ম বিবি নামে ওই ঘরের বাসিন্দা জানান, তারা এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। তার স্বামী ভাড়ায় রিকশা চালান আর তিনি বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে তাদের ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে ময়মনসিংহ থেকে আসা আরেকটি পরিবার থাকে। ঘরের ভাড়া কত জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ঘরের ভাড়া ২ হাজার ৮০০ টাকা। পাশের দোচালা ঘর দেখিয়ে বলেন, আমাদের ঘরের তুলনায় ওই ঘর দুই হাত বড় হওয়ায় ওই ঘরের ভাড়া ৩ হাজার টাকা। এ ঘর ভাড়া পেতে সিরিয়াল দিয়ে রাখতে হয় বলে জানান তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব ঘরের মালিকানা রয়েছে বিভিন্ন দলের নেতাদের হাতে। ঘরের মালিকরা রাজধানীর অট্টালিকায় থাকেন আর মাসে মাসে ভাড়া তোলেন বস্তি থেকে। সাততলা বস্তির অবস্থাও একই। হাসপাতালের কিছু কর্মচারী আর স্থানীয় রাজনীতিকদের হাতে রয়েছে বস্তির ঘরগুলো। ঘরে অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ। অবৈধভাবে এসব লাইন থেকে নিয়মিত চার্জ দেওয়া হয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোতে। যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যেতে পারে পুরো এলাকা। এসব বস্তি ঘিরে গড়ে উঠেছে মাদকের অভয়ারণ্য। মাদক একদিন রাখলে ২০০ টাকা পান বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাততলা বস্তির বাসিন্দা এক নারী জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নারী বলেন, বস্তিতে ওঠার পর আশপাশের ঘরে দেখতাম রাতের বেলা এসে ওষুধের কার্টনে ভরে কিছু রেখে যেতে। পরে জানলাম এগুলো ফেনসিডিল। এরপর আমাদের ঘরে টাকার বিনিময়ে রাখতে আসত কিন্তু আমরা রাখতাম না। পুলিশের হাঙ্গামায় অনেকেই এগুলো রাখতে ভয় পায়। আর যারা রাখে তারা নিয়মিতই মোটা অঙ্কের টাকা উপার্জন করে। তবে তিন বছরে তাদের একবারও পুলিশে ধরেনি। খুব অল্প বয়সেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এসব বস্তির শিশুরা।

এ ব্যাপারে নগরবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, সরকারের জায়গা দখল করে বস্তি নামের ভোটব্যাংক গড়ে তুলছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যারা ফুটপাথ দখল করে ভাড়া তোলে তারা যেমন ফুটপাথে দোকান করে না, ঠিক একইভাবে যারা বস্তি দখল করে তারা বস্তিতে বাস করে না। আর বস্তির মানুষের পুনর্বাসনে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল তা তো এখন ধনীদের পুনর্বাসনে ব্যবহার হচ্ছে। এ জন্য পরিকল্পনা মাফিক শহর গড়া এবং শিল্প খাত বিকেন্দ্রীভূত করার পরামর্শ দেন এ নগর বিশেষজ্ঞ।

আপনার মন্তব্য

up-arrow