Bangladesh Pratidin

প্রকাশ : শনিবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০ টা প্রিন্ট ভার্সন আপলোড : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৬ ২৩:৪২
কমরেড জসিম মণ্ডলের দিনকাল
এস এ আসাদ, পাবনা
কমরেড জসিম মণ্ডলের দিনকাল

একসময়ের তুখোড় শ্রমিক ও কমিউনিস্ট নেতা কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডলের এখন সময় কাটে স্বজনদের সঙ্গে গল্প করে আর বই ও পত্রিকা পড়ে। সারা দিন তিনি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা সদরের পশ্চিম টেংরী বাবুপাড়ার নিজ বাড়িতেই ছোট মেয়ের সঙ্গে বসবাস করছেন। বুধবার নিজ বাড়িতে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে এ কথা জানান।

কমরেড জসিম উদ্দিন মণ্ডল ১৯২২ সালে তত্কালীন নদীয়া জেলার দৌলতপুর থানার কালিদাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মরহুম হাউস উদ্দিন মণ্ডল রেলওয়েতে চাকরি করার সুবাদে ওই সময় বাংলাদেশ-ভারতসহ বিভিন্ন এলাকায় শৈশব-কৈশোর কেটেছে। ব্যক্তিজীবনে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ের বাবা তিনি। ছেলে বছর দেড়েক আগে মারা গেছেন। পাঁচ মেয়ের মধ্যে তিনজনের স্বামীই মৃত। ছোট মেয়ে আলো মণ্ডল কুষ্টিয়ায় বিয়ের বছর দেড়েক পর ১৯৮৬ সালে স্বামী মারা গেলে বাবার বাড়িতেই বসবাস করতেন। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি জসিম মণ্ডলের স্ত্রী জাহানারা খাতুন মারা যান। বাবার চাকরির সুবাদে ঈশ্বরদীর একটি বিদ্যালয়ে স্কুলজীবন শুরু হয় জসিম মণ্ডলের। ঈশ্বরদীর সাড়া মারোয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় বাবা হাউস উদ্দিন মণ্ডল বদলি হন শিয়ালদহে। শিয়ালদহে গিয়ে আর পড়ালেখা হয়নি তার। সেখানকার নারিকেলডাঙ্গা রেল কলোনিতে বসবাসের সময় মিছিল-মিটিং দেখতে দেখতেই রাজনৈতিক দীক্ষা গ্রহণ করেন। মাত্র ১৩-১৪ বছর বয়সে কয়েক বন্ধু মিলে আড্ডা দেওয়ার সময় ট্রামশ্রমিকদের মিছিলে যাওয়ার ডাক পান তিনি। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে একদিন ব্যানার ধরে মনুমেন্ট দেখতে যান জসিম উদ্দিন। সেখানে গিয়ে অনেক কথার মধ্যে তার ভালো লাগে গরিবের পক্ষে ও ধনীদের বিরুদ্ধে বলা কথা। তখন মুসলিম লীগের মিছিল ভালো না লাগায় তিনি লাল ঝাণ্ডার মিছিলে যেতেন প্রায়ই। একদিন ওই মনুমেন্টে শুনলেন ব্রিটিশদের এ দেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ভালো লাগে তার। মিছিলের বড় ভাইয়েরা কিছু হ্যান্ডবিল হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন গোপনে বিলি করতে। এভাবেই শুরু হলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। রাজনৈতিক জীবনে তার মা জহুরা খাতুন ও সহধর্মিণী জাহানারা খাতুন নানাভাবে উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। মাঝেমধ্যে ওই সময়ে লালবাজার থানার লোকজন ধরে নিয়ে সারা দিন-রাত থানায় বসিয়ে পরদিন ছেড়ে দিত। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করার ফলে আর বার বার এভাবে ধরা পড়ায় পরে ১৫-২০ দিন করে থানায় আটক থাকতে হতো। মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন তিনি। তার পরপরই রেলওয়ের চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত চাকরির পাশাপাশি কমিউনিস্ট পার্টির স্কুলে ক্লাস করতেন। চাকরি জীবনে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন তিনি। একদিন তার মা মনুমেন্টে বক্তব্য শুনে এসে তাকে বললেন, ‘বাবা জসিম! পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলন করিস না। পাকিস্তান হলে আমরা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে পারব।’ এ সময় তিনি তার মাকে বলেন, ‘মা! পাকিস্তান ধনী লোকের জন্য আমাদের জন্য না। আমি পাকিস্তানের পক্ষে থাকব না।’ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাবা ঈশ্বরদীতে আবার বদলি হয়ে চলে যান আর আমাকে কলকাতা থেকে পার্বতীপুর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওই সময়ে পাকিস্তান সরকার রেলশ্রমিকদের রেশনে খুদ (চালের ক্ষুদ্র অংশ) দিত। একদিন খুদ নিয়ে মাকে বললাম, তোমার পাকিস্তান সরকার খাবার জন্য এগুলো দিয়েছে। তখন আমি খুদ কী জিনিস জানতাম না বুঝতাম না।’ মাকে আরও বলেন, ‘এটাই পবিত্র চাল! মুসলমানদের চাল!’ তখন তার মা পাকিস্তানের পতাকা বাড়ি থেকে নামিয়ে ঝাঁটা দিয়ে পতাকার ওপর কয়েকটি বাড়ি দিয়ে আমাকে বললেন, ‘এই খুদের বিরুদ্ধে আন্দোলন কর।’ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ওই দিন আমি আর আমার মা পার্বতীপুরের রেল কলোনিতে যারা বসবাস করত তাদের নিয়ে আমরা সংগঠিত হতে থাকলাম। শুরু হলো খুদবিরোধী আন্দোলন। একদিন তত্কালীন রেল রোড ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি বীরেন দাশগুপ্ত ও সাধারণ সম্পাদক জ্যোতি বসু এলেন। আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করলেন তারা। আন্দোলন যখন তুঙ্গে ঠিক সেই সময়ে আমাকে ঈশ্বরদীতে বদলি করে দেয় রেল বিভাগ। এরই মধ্যে ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে আমার বাবা মারা যান।’ জসিম উদ্দিন মণ্ডল বলেন, ‘ঈশ্বরদীতে এসেও আন্দোলন চলিয়ে গেলাম। একদিন আমরাই প্রথম ঈশ্বরদীতে রেলের লাইন উপড়ে ফেলে দিলাম। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ঈশ্বরদীতে থেমে যায় অনেক ট্রেন। বন্ধ হয়ে যায় পুরো যোগাযোগব্যবস্থা। পুলিশ আমাদের খুঁজতে থাকলে আমরা কয়েকজন পালিয়ে যাই। ওই দিন বিকালেই ট্রাকযোগে চাল এনে রেল কর্তৃপক্ষ ঈশ্বরদীতে শ্রমিকদের মধ্যে খুদের পরিবর্তে চাল দেয়। সফল হয় আমাদের আন্দোলন। আমার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ও হুলিয়া জারি হলে নয় মাস কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে আবার ফিরে আসি ঈশ্বরদীতে। পরে আকবর নাম ধারণ করলেও পুলিশ আমাকে চিনে ফেলে, গ্রেফতার করে নিয়ে পাবনা কারাগারে পাঠিয়ে দেয়। সেদিন ছিল ১৯৪৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। রেল স্ট্রাইক, রাষ্ট্রদ্রোহসহ বিভিন্ন মামলা দেওয়া হয় আমার নামে। জেলখানায় নিম্নমানের খাবার নিয়েও আন্দোলন শুরু করি। কারাগারে দেখা হয় পাবনার বিশিষ্ট বাম আন্দোলনের নেতা আমিনুল ইসলাম বাদশা, রণেশ মৈত্র, প্রসাদ রায়সহ কয়েকজনের সঙ্গে। জেলখানায় আন্দোলনের ফলে এক মাস ঘানি টানার শাস্তি দেয় জেল কর্তৃপক্ষ। ঘানি টারার বিরুদ্ধে কথা বলা ও জেল কর্তৃপক্ষের বকাবকির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালে আমাকে উলঙ্গ করে মাঘের শীতে ঠাণ্ডা পানির মধ্যে ডুবিয়ে রাখা হয়। খবর পেয়ে আমার স্ত্রী তত্কালীন জেলা প্রশাসককে অবহিত করলে তিনি জেল পরিদর্শনে এসে আমাকে উলঙ্গ দেখতে পান। এ সময় তিনি পোকাওয়ালা সিদ্ধ ছোলা খাবার দেওয়া, ঘানি টানাসহ সব বন্ধ করে দেন। ওই সময় থেকে আজ পর্যন্ত পাবনা কারাগারে আর কখনো ঘানি টানানো হয়নি কয়েদিদের দিয়ে। আমার আন্দোলন সফল হয়। এরপরই আমাকে পাবনা কারাগার থেকে রাজশাহীতে বদলি করা হয়। এভাবে সাত বছর কারাবরণ শেষে বের হয়ে চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য রেল কর্তৃপক্ষের কাছে গেলে তারা আমাকে লিখিত দিতে বললে আমি অস্বীকার করলে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। তখন আমার স্ত্রীর পক্ষে এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে নিয়ে সংসার পরিচালনা করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে পড়ে।’ এ সময় রেল শ্রমিক ও নারী নেত্রী সেলিনা বানু, রাজশাহীর মাদার বক্সের মেয়ে মনোয়ারা বেগম, উল্লাপাড়ার অমূল্য লাহিড়ীসহ বিভিন্ন লোকের সাহায্য-সহযোগিতায় জীবন চলত বলেও জানান সর্বহারা শ্রমিক কমরেড জসিম উদ্দিন। রাজনৈতিক জীবনে ব্রিটিশ আমলে দুই বছর, পাকিস্তান আমলে ১৩ বছর, বাংলাদেশে জিয়া সরকারের আমলে দুই বছর— এই ১৭ বছর কারাগারে ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কমিউনিস্টরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সব সময়ই আমরা লড়াই করেছি, এমনকি কখনো পাকিস্তানকে মেনেই নিইনি আমরা। আর বর্তমান সরকার আমাদের বলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করিনি, এটা ভুল। আমরা ভারতের কলকাতা, দিল্লি, আগ্রা, শিয়ালদহসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্থ, খাবার, পোশাকসহ বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছি। এ সময় আমার সঙ্গে ইন্দ্রজিত্ দত্ত ছিলেন।’ বর্তমানে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বই-পত্রিকা পড়া আর বাড়ির পাশে নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দিনযাপন করেন। মাঝেমধ্যে কোথাও কোনো অনুষ্ঠানে অতিথি করা হলে সেখানে যান।

এই পাতার আরো খবর
up-arrow