Bangladesh Pratidin

ঢাকা, শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০১৬

প্রকাশ : শনিবার, ১৮ জুন, ২০১৬ ০০:০০ টা আপডেট : ১৭ জুন, ২০১৬ ২৩:২৮
প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ন্ত্রণ

প্রতিশোধস্পৃহা থেকে বাড়াবাড়ি ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। কেউ অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রশ্ন আসে। কিন্তু এই প্রতিশোধ প্রহণের ক্ষেত্রে সাম্যের সীমা লঙ্ঘিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণও অত্যাচারে পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিশোধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘিত হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে বাধ্য এবং যা সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সূরা আশ শুরার ৪০-৪৩ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে যা ইরশাদ হয়েছে তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য : ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ এবং যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না। তবে অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিবিধান করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না। কেবল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করে বেড়ায়, তাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি। অবশ্য, যে ধৈর্যধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, তা হবে দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।’ তাফসিরে মাআরেফুল কোরআনের ভাষ্যমতে, ‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দই’ অর্থাৎ তোমার যতটুকু আর্থিক অথবা শারীরিক ক্ষতি কেউ করে, তুমি ঠিক ততটুকু ক্ষতি তার করতে পার (যা প্রতিবিধান হিসেবে হওয়া সমীচীন বিবেচিত হতে পারে) তবে শর্ত এই যে, তোমার মন্দ কাজটি যেন পাপকর্ম না হয়। উদাহরণত কেউ তোমাকে জোরপূর্বক মদ পান করিয়ে দিলে তোমার জন্য তাকেও বলপূর্বক মদ পান করিয়ে দেওয়া জায়েজ হবে না। আয়াতে যদিও সমান সমান প্রতিশোধ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পরে এ কথাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, যে ব্যক্তি ক্ষমা করে এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর দায়িত্বে রয়েছে। এতে নির্দেশ রয়েছে যে, ক্ষমা করাই উত্তম। বয়ানুল কোরআনে বলা হয়েছে : আল্লাহতায়ালা আলোচ্য দুই আয়াতে খাঁটি মুমিন ও সৎকর্মীদের দুটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। ‘হুম ইউগফিরুনা’— এ বাক্যাংশে বলা হয়েছে : তারা ক্রোধের সময় নিজেদের হারিয়ে ফেলে না; বরং তখনো ক্ষমা ও অনুকম্পা তাদের মধ্যে প্রবল থাকে। ফলে ক্ষমা করে দেয়। পক্ষান্তরে ‘হুম ইউনতাসিরুনা’— এ বাক্যাংশে বলা হয়েছে যে, কোনো সময় অত্যাচারের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রেরণা তাদের মধ্যে জাগ্রত হলেও তারা তাতে ন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন করে না, যদিও ক্ষমা করে দেওয়াই উত্তম। প্রতিশোধ ততটুকু যতটুকু জুলুম করা হয়েছে। সীমালঙ্ঘিত হলে তা আবার অত্যাচারে পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিশোধের মাত্রা অতিশয় আপেক্ষিক, সীমা লঙ্ঘনের সম্ভাবনা ও সমস্যা থেকেই যায়, তাই ক্ষমা ও আপস-মীমাংসার মাধ্যমে প্রতিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা শ্রেয়। তবে যে ক্ষেত্রে ক্ষমা করার ফলে অত্যাচারীর ধৃষ্টতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, সে ক্ষেত্রে প্রতিশোধ-প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য হয়ে দাঁড়ায়। কাজী আবুবকর ইবনে আরাবি এবং কুরতুবি আলোচ্য আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, ক্ষমা ও প্রতিশোধ দুটিই অবস্থাভেদে উত্তম। যে ব্যক্তি অনাচার করার পর লজ্জিত হয়, তাকে ক্ষমা করা উত্তম এবং যে ব্যক্তি স্বীয় জেদেও অত্যাচারে অটল থাকে, তার ক্ষেত্রে প্রতিশোধ নেওয়াই উত্তম। ওপরে উদ্ধৃত ৪৩ নম্বর আয়াতে অর্থাৎ পরিশেষে ধৈর্যধারণ এবং ক্ষমা করে দেওয়াকেই ‘দৃঢ় সংকল্পের কাজ’ বলা হয়েছে। আয়াতটির ব্যাখ্যায় আল্লামা ইউসুফ আলী যথার্থই বলেছেন, এটা বাস্তবিকই কঠিন যে, সব ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ ও ক্ষমা করা, যেমনটি রসুলুল্লাহ (সা.) আজীবন অবলম্বন করেছিলেন। দোষীকে শাস্তি-উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার মানসিকতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন, এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণও কঠিন। কিন্তু ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধের পন্থাকে-স্পৃহাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে সময়ে তার সুফল বয়ে আনে। গৌতম বুদ্ধের বাণীও তাই : ‘প্রতিশোধের স্পৃহা পুষে রাখতে নেই, ক্ষমা করে দেওয়া বা বিলম্ব করাই প্রতিশোধের উত্তম উপায়। [Do not search for (resentment) a long time : resentment can not be satisfied by resentment, it can only be removed by forgiveness]. বিপদে, অত্যাচারের মুখে, অন্যায়ের সামনে ধৈর্যধারণ কঠিন, প্রতিশোধস্পৃহাকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রয়োগও তেমন কঠিন। এর বিপরীতে অবস্থান নেওয়া নিঃসন্দেহে তাই দৃঢ় সংকল্পের কাজ। ব্যক্তি-সমাজ-দেশ ও দুনিয়ায় হানাহানির সর্বনাশা থেকে পরিত্রাণ লাভার্থেই এই the noblest form of courge and resolution-এর প্রয়োজন। সিয়াম সাধনায় এ চেতনা জাগ্রত হোক।

লেখক : সরকারের সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান।




এই পাতার আরো খবর
up-arrow