শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ১২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ মার্চ, ২০২১ ২২:০৯

বিশ্বজুড়ে ইসলামী জাদুঘর

আবদুল কাদের

বিশ্বজুড়ে ইসলামী জাদুঘর
ইসলামের ইতিহাসের সমৃদ্ধ অধ্যায়গুলো তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামী জাদুঘর। যেখানে প্রদর্শিত হয়ে থাকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান, সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং ইতিহাস। সমকালে দাঁড়িয়ে ইসলামের স্বর্ণালি অতীত জানার সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো এসব জাদুঘর। রইল বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি ইসলামিক জাদুঘরের বিস্তারিত...

 

কাতারের উপদ্বীপে নির্মিত সর্বাধুনিক ইসলামী সংগ্রহশালা

পানির মাঝে অনন্য শিল্পকর্ম ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’। মধ্যপ্রাচ্যের ছোট্ট দেশ কাতারের দোহায় অবস্থিত ইসলামী জাদুঘরটি। ইসলামী শিল্প, সভ্যতা, সংস্কৃতি সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ইতিহাস ও মূল্যবান তৈজসপত্রে সমৃদ্ধ জাদুঘরটি। ২০০৮ সালে কৃত্রিম উপদ্বীপে নির্মিত জাদুঘরটি বিশ্বব্যাপী পর্যটকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর ৫ লাখ মানুষ জাদুঘরটি পরিদর্শন করে। স্থাপনাটির নকশা করেছেন চীনা বংশোদ্ভূত মার্কিন স্থপতি আই এম পাই। স্থাপনাটি তার সৌন্দর্যের জন্য বেশ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। পাঁচতলা জাদুঘরের ভিতরের অংশগুলো অদ্ভুতভাবে কাচ দিয়ে সাজানো। যার এক পাশ থেকে আরেক পাশে যেতে হয় কাচের তৈরি সিঁড়ি দিয়ে। মাঝখানে রয়েছে ১৬৪ ফুট উঁচু গম্বুজ। ৪৫ হাজার বর্গমিটারের বিশাল ভবনে আছে বহু মূল্যবান হাতে লেখা কাপড়, পাথর, দলিলপত্র, শিলালিপি, তৈজসপত্র, গয়না, অস্ত্র এবং চমৎকার সব পান্ডুলিপি। প্রাচীন পুরনো সোনা-রুপা ও ব্রোঞ্জের তৈরি বিভিন্ন আমলের মুদ্রা সমাহার। প্রাক-ইসলামিক ও সাসানীদ যুগের বেশ কিছু শিল্পকর্মও সংরক্ষিত রয়েছে এখানে। জাদুঘরটিতে ৫ হাজার ৪০০টিরও বেশি ইসলামিক শিল্প সংরক্ষিত রয়েছে। যুগ অনুযায়ী ইসলামী শিল্প-সংস্কৃতিগুলো আলাদা গ্যালারিতে প্রদর্শন করা হয়। ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাস, মধ্য এশিয়া ও ইরানের ইসলামী স্থাপত্যশিল্প এবং মিসর ও সিরিয়ার ইসলামী যুগের তথ্য-উপাত্ত ও স্থাপত্যশিল্পের আলাদা গ্যালারি। জাদুঘর ভবনেই রয়েছে এক্সিবিশন হল, আরবি ও ইংরেজি ভাষাভাষীদের গবেষণা সেন্টার এবং সমৃদ্ধশালী একটি গ্রন্থাগার। যেখানে আছে আরবি ও ইংরেজি ভাষার দেড় লাখের বেশি বই। প্রায় ২০০ বিরল বই রয়েছে, যা আর কোথাও পাওয়া যাবে না।

 

জেরুজালেমের শতবর্ষী ইসলামী জাদুঘর

জেরুজালেমের প্রথম জাদুঘর ‘জেরুজালেম ইসলামী জাদুঘর’। স্থাপনাটি ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদের সন্নিকটে অবস্থিত। ১৯২২ সালে জেরুজালেমের হায়ার ইসলামিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পবিত্র আল-আকসা মসজিদে সংরক্ষিত প্রাচীন নিদর্শনাবলি নিয়েই যাত্রা শুরু হয়েছিল সংগ্রহশালাটির। পরবর্তীকালে জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনের ইতিহাস, শিল্প- সংস্কৃতিসহ অসংখ্য নিদর্শন ও স্মারক উপহার হিসেবে পায় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। যার মধ্যে রয়েছে পবিত্র কোরআনের প্রাচীন পান্ডুলিপি, আকসায় ব্যবহৃত আসবাব, অত্র অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তির স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন মুদ্রা ও তৈজসপত্র। জাদুঘরের প্রধান কক্ষ দুটি, যার একটি মামলুক শাসনামলে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মসজিদ হিসেবে নির্মাণ করা হয়। ৫৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ মিটার প্রস্থ ভবনটি ১৩০৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করেন শেখ ওমর ইবনে আবদুন নবী আল মাগরিবি আল মাসউদি। তবে এর প্রবেশপথটি উসমানীয় শাসনামলে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে সংস্কার করা হয়। দ্বিতীয় কক্ষটির দৈর্ঘ্য ১৭ মিটার এবং প্রস্থ ৩৫ মিটার। এটি ফাতেমীয় শাসনামলে মহিলাদের নামাজের জন্য নির্মাণ করা হয়। ইসলামী স্বর্ণযুগের দুর্লভ ও হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে এখানে। উত্তর আফ্রিকা, মিসর, সিরিয়া, তুরস্ক, ইরান, পূর্ব এশিয়ার একাধিক দেশ থেকে এসব নিদর্শন ও স্মারক সংগ্রহ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে উমাইয়া আমলের কাঠের সেট, ১৯৬৯ সালে ইসরায়েলের দেওয়া আগুনে পুড়ে যাওয়া নূর আলদিন মিম্বরের ধ্বংসাবশেষ, মামলুক আমলের মূল্যবান নথিপত্র, ধাতব, মার্বেল ও টাইলস। এ ছাড়া রয়েছে কুফি, নকশি ও থোলথ আরবিলিপির একাধিক ক্যালিওগ্রাফি।

 

দ্বীপরাষ্ট্র বাহরাইনে নির্মিতবাইত আল কোরআন

পৃথিবীর প্রসিদ্ধতম ইসলামী জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘আল হায়াত মিউজিয়াম’। ‘বাইত আল কোরআন’ নামে জাদুঘরটি সর্বাধিক পরিচিত। বাহরাইনের হুরায় ১৯৯০ সালে স্থাপনাটি প্রতিষ্ঠা করেন কোরআন গবেষক ড. আবদুল লতিফ জাসিম। বলা যায়, এটা তাঁর ব্যক্তিগত জাদুঘর। দীর্ঘদিনের চেষ্টা ও সাধনায় তিনি পবিত্র কোরআনের বিরল ও মূল্যবান বহু রকমের কপি সংগ্রহ করেছেন। দ্বিতল ভবনবিশিষ্ট জাদুঘরটিতে ১০টি হল রয়েছে। এসব হলে হিজরি প্রথম শতাব্দী থেকে শুরু করে বিভিন্ন যুগে লিখিত কোরআনের পান্ডুলিপি রক্ষিত রয়েছে। মক্কা, মদিনা, দামেস্ক, বাগদাদ থেকে সংগৃহীত কাগজের পান্ডুলিপি এখানে রক্ষিত রয়েছে। হাতে লেখা অনেক প্রাচীন পান্ডুলিপিও রয়েছে এখানে। হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর যুগে সংকলিত প্রথম কোরআনের মূল্যবান কপিটি এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ক্যালিওগ্রাফি, ইসলামী বইয়ের প্রাচীন পান্ডুলিপি ও ইসলামিক আর্টের বিরল সংগ্রহ জাদুঘরটিকে সমৃদ্ধ করেছে। এর মাধ্যমে হিজরি প্রথম শতাব্দী থেকে ইসলামী স্বর্ণযুগসহ বর্তমান অবধি ক্যালিওগ্রাফি শৈলীর অগ্রগতি বোঝা যায়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হলেও তাতে অংশগ্রহণ রয়েছে সাধারণ মানুষেরও। বাহরাইনের সর্বশ্রেণির মানুষ জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করে। তাই জাদুঘর কর্তৃপক্ষও সেবার বিপরীতে মানুষের কাছ থেকে কোনো মূল্য গ্রহণ করে না। ১২ শতকের মসজিদের আদলে গড়ে তোলা ‘বাইত আল কোরআন’ স্থাপনাতে জাদুঘর ছাড়াও রয়েছে মসজিদ, ইসলামী স্কুল, পাঠাগার ও সভাকক্ষ। পাঠাগারে আরবি, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় রচিত প্রায় ৫০ হাজার বই রয়েছে।

 

বার্লিনে ইউরোপের বৃহত্তম ইসলামী জাদুঘর

‘মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’, ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ জাদুঘর। বিশ্বের ইসলামী শিল্পকলা ও চিত্রকর্মের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় সর্বপ্রাচীন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর এটি। অর্থাৎ কায়রো জাদুঘরের পর এটাই পৃথিবীর প্রাচীনতম জাদুঘর। জাদুঘরটি আইসল্যান্ডের পেরগামোন মিউজিয়ামে অবস্থিত। প্রায় ৯৩ হাজার স্মারক রয়েছে এখানে। এই জাদুঘরের ইসলাম ও মুসলিম-সংশ্লিষ্ট অংশকে পৃথক করে ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নতুন জাদুঘর ‘দ্য মিউজিয়াম অব ইসলামিক আর্ট’। তবে সম্পূর্ণ পৃথক হয় ১৯৫০ সালে। যেখানে ইসলাম-পূর্ব সময় থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক নিদর্শন রয়েছে। যেমন-উমাইয়া যুগে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, যা আরব ও চীনের মিশ্র শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। প্রথম শতকের কোরআন, তরবারি, বর্ম ইত্যাদি। পাশাপাশি ইসলামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণীও লেখা আছে জাদুঘরের দেয়ালে। ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা.) থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সবকিছুই এখানে স্থান পেয়েছে। বার্লিনে অবস্থিত ইসলামিক জাদুঘরে স্পেনের বিখ্যাত আল হামরা প্রাসাদসহ মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার প্রতিলিপি স্থান পেয়েছে। ইসলামিক জাদুঘরে রয়েছে একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। যেখানে ইসলামী শিল্পকলা ও প্রতœতত্ত্ববিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। মাঝে-মধ্যে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ইসলামী চিত্রকলার প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ইসলামী ইতিহাসের ধারাক্রমানুসারে স্মারকগুলো সাজানো হয়েছে। যেন সহজেই দর্শনার্থীরা ধারণা পেতে পারেন। জাদুঘরটিতে ইসলামী শিল্পকর্ম ছাড়াও খ্রিস্টান ও ইহুদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কিছু সংগৃহীত হয়েছে।

 

পবিত্র মক্কায় একাধিক ইসলামী জাদুঘর

‘দ্য সৌদি কমিশন ফর ট্যুরিজম অ্যান্ড ন্যাশনাল হেরিটেজ’-এর তালিকায় মক্কা নগরীর বেশ কয়েকটি জাদুঘরের নাম রয়েছে। প্রতি বছর হজ ও ওমরাহ পালন করতে আসা লাখ লাখ হাজী এসব জাদুঘর পরিদর্শন করেন। এসব জাদুঘরে সৌদি আরবের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের বেশি কিছু নেই বললেই চলে। যা আছে, তার সবই কাবাকেন্দ্রিক। তবে সৌদি আরবের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরিচ্ছদ, আসবাব, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদির কিছু নমুনা এখানে আছে। মক্কায় অবস্থিত আল হারামাইন জাদুঘর রয়েছে দর্শনার্থীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে। সাতটি হলরুমের বিশাল এই জাদুঘরে রয়েছে কাবার প্রাচীন দরজাগুলো, হাতে আঁকা কোরআন, দুষ্প্রাপ্য ছবি, ইসলামী স্থাপত্যের নমুনা ইত্যাদি। এ ছাড়া আছে প্রতœতাত্ত্বিক সাইট, প্রাচীন শিলালিপি, প্রাসাদ ও হজের যাত্রাপথের ছবি। মক্কা জাদুঘরে আঞ্চলিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, এই অঞ্চলে মানববসতি স্থাপনের ইতিহাস, আরবি ভাষা, সাহিত্য, হস্তলিপির বিকাশ সম্পর্কেও ধারণা দেওয়া হয়েছে দর্শনার্থীদের। মক্কা জাদুঘরের অদূরেই রয়েছে জেদ্দা জাদুঘর। ইসলামী ইতিহাসের প্রায় একই রকম স্মারক ও নির্দেশনাবলি এখানে প্রদর্শন করা হয়। মক্কা, তায়েফ ও জেদ্দায় বেশ কিছু পারিবারিক জাদুঘরও রয়েছে। যেগুলো মালিক তাঁর পছন্দ অনুযায়ী সাজিয়েছেন। যেমন, মুদ্রা জাদুঘর। যেখানে প্রাচীন ও আধুনিককালের দুর্লভ মুদ্রা সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইভাবে গৃহস্থালি, কৃষি, খাবার, কাপড় ও ব্যবহার্য জিনিসপত্রের একাধিক পারিবারিক জাদুঘর রয়েছে এই অঞ্চলে। তবে জেদ্দার সবচেয়ে জনপ্রিয় ইসলামী জাদুঘর ‘আবদুর রউফ খলিল মিউজিয়াম’। জাদুঘর, প্রাসাদ ও মসজিদের সমন্বয়ে গড়ে তোলা এই স্থাপনায় তুলে ধরা হয়েছে আরব জাতির হাজার বছরের ইতিহাস।

 

মালয়েশিয়ায় দৃষ্টিনন্দনদ্য ইসলামিক আর্টস মিউজিয়াম

‘দ্য ইসলামিক আর্টস মিউজিয়াম’, দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ইসলামী জাদুঘর। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে সবুজের সমারোহ পারদানা বোটানিক্যাল গার্ডেন ঘেঁষা, পাখির উদ্যান এবং জাতীয় মসজিদের ঠিক বিপরীতে সংগ্রহশালাটি অবস্থিত। ১৯৯৮ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় জাদুঘরটি। অল্প দিনেই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে জাদুঘরটি। স্থাপনাটির ১২টি বিশাল প্রদর্শনকক্ষে প্রায় ৭ হাজার স্মারক ও নিদর্শন রয়েছে। যার মধ্যে হাতে লেখা কোরআন, ইসলামী স্থাপত্যের প্রতিরূপ, গয়না, চীনা মাটি, কাচের পাত্র, বস্ত্র, অস্ত্র, বর্ম ইত্যাদি। মুসলিম বিশ্বের অসংখ্য শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য এখানে রয়েছে আলাদা আলাদা গ্যালারি। সময়কাল ও বিষয় হিসেবে গ্যালারিগুলো ভাগ করা হয়েছে। স্থায়ীভাবে প্রদর্শনের জন্য উনবিংশ শতাব্দী পূর্ব রোমের ‘অটোমান সাম্রাজ্যে’র ধ্বংসাবশেষের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। জাদুঘরে চীন, ভারত ও মালয় মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন রয়েছে। এ ছাড়া জাদুঘর ভবনটিতে রয়েছে গবেষণা কেন্দ্র, আলোচনা কক্ষ, শিশু ও গবেষকদের জন্য পৃথক পাঠাগার, বিক্রয় কেন্দ্র ও রেস্টুরেন্ট। ৩০ হাজার স্কয়ার ফিটের সুবিশাল এই ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ ফ্লোরকে জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। তৃতীয় ফ্লোরে রয়েছে কোরআন ও পান্ডুলিপি, ইসলামী স্থাপত্য, ভারতীয়, চীনা ও মালয় গ্যালারি। চতুর্থ ফ্লোরে রয়েছে গয়না, অস্ত্র, বর্ম ও সিরামিকস গ্যালারি। প্রাচীনকালের কাচের জিনিসপত্র সংগ্রহের জন্যও জাদুঘরটি বেশ প্রসিদ্ধ। জাদুঘরের বাইরের অংশটি একবিংশ শতাব্দীর নির্মাণ কৌশলে নির্মিত, তবুও কিছু ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপত্যের বিবরণে স্থাপনাটির প্রাচীন ঐতিহ্য ফুটে উঠেছে।

 

যৌথ উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়ায় প্রথম ইসলামী জাদুঘর

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত ইসলামী জাদুঘর ‘দ্য ইসলামিক মিউজিয়াম অব অস্ট্রেলিয়া’। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইসলামী সংগ্রহশালা। দেশটিতে আগত দর্শনার্থীদের কাছে ইসলামের ইতিহাস, জীবন-যাত্রা ও মুসলিম সভ্যতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরার জন্য জাদুঘরটি নির্মাণ করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইসলামিক জাদুঘরটি সরকারের অনুমতিক্রমে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্যোক্তা ফাহুর পরিবার। জাদুঘর নির্মাণে অর্থ সরবরাহ করেছে যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়ান সরকার ও অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম ব্যবসায়ী মুস্তাফা ফাহউর। ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ইসলামী জাদুঘরের ডিজাইন করেছে বিখ্যাত ডিজাইন হাউস ডসাইফার। ফাহুর পরিবার জাদুঘর নির্মাণে চার মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। জাদুঘরটি দর্শনার্থীদের কাছে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, মুসলিম সভ্যতা ও পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। স্থানীয় মুসলিম সংস্কৃতি তুলে ধরার পাশাপাশি দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের মুসলিম শিল্পীদের সহযোগিতা করা জাদুঘরের অন্যতম লক্ষ্য। মুসলিম শিল্পীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য জাদুঘরে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী গ্যালারি। জাদুঘরের স্থায়ী গ্যালারিতে রয়েছে মূল্যবান ও চমৎকার সব শিল্পকর্ম। এর গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে মালয়-ফিলিপাইন জেলে ও ভারতীয়দের কথা, যাদের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামের আগমন ও প্রচার-প্রসার হয়েছিল। স্থাপনাটিতে আরবি ক্যালিওগ্রাফি, শিল্প, চিত্রকলা ও হস্তশিল্পসহ সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় সন্নিবেশিত হয়েছে। ৫০ হাজার লোক একসঙ্গে এখানে পরিদর্শন করতে পারে।

 

প্রাচীন মিসরের সর্ববৃহৎ ইসলামী জাদুঘর

প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসর। এই মিসরেই রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন, বৃহত্তম ইসলামী জাদুঘর। প্রাচীন জাদুঘরটি রাজধানী কায়রোর প্রসিদ্ধ এলাকা আল খালক স্কয়ারে অবস্থিত। ১৮৮০ সালে মুইজ স্ট্রিটে অবস্থিত আল হাকিম মসজিদের পাশে অল্প কিছু সংগ্রহ কয়েকটি মসজিদের মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রদর্শন করা হয়। ১৯০৩ সালে মিসরের রাজধানী কায়রোতে জাদুঘরের নিজস্ব ভবন তৈরি করা হয়। ২০১৪ সালে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৬ সালে নতুন করে কিছু অংশ পুনর্র্নির্মাণ করে আবার চালু করা হয়। এখানে অন্তত ১ লাখের ওপরে গত প্রায় ১২ শতাব্দী প্রাচীন ইসলামের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও দুষ্প্রাপ্য মহামূল্যবান জিনিসপত্র সংরক্ষিত আছে। মিসর ও আরব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র, শিলালিপি, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং বিচিত্র সব নিদর্শনে সমৃদ্ধ জাদুঘরটি। জাদুঘর ভবনটির বেজমেন্টে রয়েছে স্টোর এরিয়া। দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলায় রয়েছে প্রদর্শনী কক্ষ। প্রদর্শিত স্মারকের মধ্যে ধাতব বস্তু, কারুশিল্প সামগ্রী, কার্পেট, পাথর, সিরামিক পণ্য, কোরআনের দুর্লভ পান্ডুলিপি, মুদ্রা, জুয়েলারি, অস্ত্র, মসজিদের  মেহরাব প্রভৃতি অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে দুর্লভ পান্ডুলিপি, বইয়ের কপি, চিত্রকলা, ধাতু ও চীনা মাটির তৈজসপত্র, গয়না, অস্ত্র, হাতির দাঁতের জিনিস। বর্তমানে জাদুঘরের সংগ্রহে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ মূল্যবান সম্পদ। রয়েছে ২৫টি জাদুঘরের হল। বিশাল জাদুঘরটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রবেশদ্বার পেরোলেই চোখে পড়বে ইসলামী খেলাফতের প্রতিটি যুগের গল্প। অপর ভাগে রয়েছে ইসলামী বিশ্বের ব্যবহৃত উপকরণ যেমন- বস্ত্র, কার্পেট, জানালা-দরজার ফ্রেম, সিরামিকের টুকরা, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম।


আপনার মন্তব্য