সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলে অরাজকতা

কয়েক মাসের ব্যবধানে করোনার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলে মূল্যবৃদ্ধি

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি

অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলে অরাজকতা

করোনাভাইরাসের হটস্পটখ্যাত কুষ্টিয়া জেলায় মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল ব্যবসা নিয়ে কিছুদিন ধরে চরম নৈরাজ্য চলে আসছে। কুষ্টিয়ার এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে ইচ্ছে মতো গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলার একমাত্র অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলকারী মনির অক্সিজেন প্ল্যান্ট নামের এই প্রতিষ্ঠানটির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে কুষ্টিয়া করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এমন কি খুচরা ব্যবসায়ী ও গ্রাহকরা। অভিযোগ রয়েছে গত কয়েক মাসের ব্যবধানে এই প্রতিষ্ঠানটি করোনা মহামারীর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিলে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ ভাগ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্য কোনো উপায় না থাকায় জীবন বাঁচাতে মানুষকে চড়া দাম দিয়েই সিলিন্ডার রিফিল করতে হচ্ছে। আবার এখান থেকে রিফিলকৃত অক্সিজেন সিলিন্ডারের প্রেসার (চাপ) কম পাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। করোনা মহামারীকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে জিম্মি করে অক্সিজেন রিফিল ব্যবসায় দিনের পর দিন চরম অরাজকতা চালিয়ে আসলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই।  সূত্রে জানা যায়, বিগত প্রায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে খুলনা বিভাগের অন্যতম করোনা হটস্পট জেলা হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে কুষ্টিয়া জেলা। করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জেলায় হু হু করে বাড়ছে শনাক্তের সংখ্যাও। কুষ্টিয়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে জেলায় চলতি বছরের জুন মাসে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৭৪৮ জন। শুধুমাত্র করোনায় আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়া হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জুন মাসে মৃত্যু হয়েছে ৯৭ জনের। আর জুলাই মাসে জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৬ হাজার ২২৯ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ৩৩৫ জন। এছাড়াও করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন আরও প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন। জেলায় গতকাল পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৬৯ জনে। চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কুষ্টিয়া করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালেই প্রতিদিন প্রায় ৫০০’র বেশি সিলিন্ডার ব্যবহার হয়ে থাকে। বাকি ৫টি উপজেলা এবং ব্যক্তি পর্যায় সব মিলিয়ে জেলায় বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১ হাজারেরও বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে। অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান না থাকায় কুষ্টিয়ায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে মনির অক্সিজেন প্ল্যান্ট নামক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অক্সিজেন রিফিল করতে হচ্ছে। জানা যায়, কুষ্টিয়া-রাজবাড়ী মহাসড়কের পাশে ঢাকা রোডে কয়েক বছর আগে বেসরকারি পর্যায়ে মনিরুল ইসলাম মনির নামের স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল প্রতিষ্ঠান মনির অক্সিজেন প্ল্যান্ট স্থাপন করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি ভারত থেকে যারা লিকুইড অক্সিজেন আমদানি করে থাকেন। তাদের কাছ থেকে অক্সিজেন সরবরাহ নিয়ে শিল্প কলকারাখানার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল শুরু করে। পরবর্তীতে গত কয়েক মাস যাবত প্রতিষ্ঠানটি এর পাশাপাশি মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডারও রিফিল করে আসছে। সংশ্লিষ্ট ব্যসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলায় বর্তমানে ৩ দশমিক ৪ কিউবিক মিটার, ৬ দশমিক ৮০ এবং ৯ দশমিক ৮০ কিউবিক মিটার মেডিকেল অক্সিজেন সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, বিগত ৩-৪ মাস আগেও মনির আয়রন প্ল্যান্ট থেকে ৩ দশমিক ৪ কিউবিক মিটার  বেড সাইজ অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করতে ২০০ টাকা, ৬ দশমিক ৮ সিলিন্ডার রিফিল করতে ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকা এবং ৯ দশমিক ৮০ কিউবিক মিটার অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লাগত।

কিন্তু জেলায় করোনার অতি প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় গত প্রায় দুই-তিন মাস ধরে ৩ দশমিক ৪ অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করতে নেওয়া হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। আর ৬ দশমিক ৮০ সিলিন্ডার রিফিল নিচ্ছে  ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় এবং ৯ দশমিক ৮০ কিউবিক মিটার অক্সিজেন সিলিন্ডার নেওয়া হচ্ছে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায়। এদিকে কুষ্টিয়া করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালটিও বিগত প্রায় ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে মনির অক্সিজেন প্ল্যান্ট নামক প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে অক্সিজেন রিফিল করছে বলে জানা গেছে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল (বর্তমানে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের) তত্ত্বাবধায়ক ডা. এম এ মোমেন জানান, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০০’র বেশি অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করার প্রয়োজন হয়। বেশ কিছুদিন ধরে কুষ্টিয়া হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত রোগীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিদিন দুবার করে খালি হয়ে যাওয়া অক্সিজেন সিলিন্ডারগুলো রিফিল করতে গাড়ি ভাড়া করে যশোর জেলায় পাঠাতে হয়। একবার যশোর থেকে রিফিল করে নিয়ে আসতে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে। তিনি বলেন, যশোর জেলায় অক্সিজেন রিফিলের রেট কুষ্টিয়ার মনির আয়রন প্ল্যান্ট’র চেয়ে অর্ধেকেরও কম এবং তাদের প্রেসারও সঠিক। কিন্তু মনির আয়রন প্ল্যান্ট’র অক্সিজেন রিফিলের দামও বেশি আবার যশোরের চেয়ে প্রেসারও কম। নিয়মানুযায়ী অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাপ থাকার কথা কমপক্ষে ২ হাজার পিএসআই। সেখানে মনির আয়রন প্ল্যান্ট থেকে রিফিল করা অক্সিজেন সিলিন্ডারে প্রেসার পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৫০০  থেকে ১৬০০ পিএসআই। ডা. এম এ মোমেন জানান, মনির আয়রন হাসপাতালের কাছ থেকে ৬ দশমিক ৮০ সিলিন্ডার রিফিল করতে প্রায় ৯৯০ টাকা এবং বড় ৯ দশমিক ৮০ কিউবিক মিটার অক্সিজেন সিলিন্ডার রিফিল করতে প্রায় ১১৯০ টাকা করে নিচ্ছে। যশোরের চেয়ে দাম অনেক বেশি এবং কাক্সিক্ষত মাত্রার প্রেসার (চাপ) না পাওয়া গেলেও সময় বাঁচানো এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের জীবন রক্ষার্থে এক প্রকার বাধ্য হয়েই মনির আয়রন প্ল্যান্ট’র কাছ থেকে তাঁরা অক্সিজেন রিফিল করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন। জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলায় প্রায় ৮-১০ জন খুচরা অক্সিজেন ব্যবসায়ী রয়েছে। কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলা ছাড়াও পাশর্^বর্তী চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহসহ আশেপাশের জেলার ব্যবসায়ীরা মনির আয়রন প্ল্যান্ট’র কাছ থেকে অক্সিজেন রিফিল করে থাকেন। দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মনির অক্সিজেন প্ল্যান্ট’র মালিক মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, অক্সিজেন ভারত থেকে আমদানি করা হয়। অক্সিজেনের বাজার প্রতিনিয়ত ওঠা-নামা করে। যখন যে দামে আমদানি করা হচ্ছে সেই অনুযায়ী বিক্রি করা হচ্ছে। অক্সিজেনের প্রেসার (চাপ) কম পাওয়া যাচ্ছে এমন অভিযোগের বিষয়ে মনির বলেন, কুষ্টিয়া হাসপাতালের বেশকিছু অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে যেগুলো অনেক দিনের পুরাতন হয়ে গেছে। এগুলোতে সঠিক প্রেসার দিতে গেলে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। যে কারণে ওই সিলিন্ডারগুলোতে বেশি প্রসার দেওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। অক্সিজেন রিফিল নিয়ে নৈরাজ্যের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, অক্সিজেন রিফিল করতে দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে এমন অভিযোগ এখন পর্যন্ত কেউ করেনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অনিয়ম পেলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।