ঐতিহ্য হারাচ্ছে নরসিংদীর সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলো। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জেলার বেসরকারি কলেজগুলো চোখ ধাঁধানো ফলাফল অর্জন করলেও নরসিংদীর সরকারি কলেজগুলোতে ফলাফল চরম বিপর্যয় ঘটেছে। আশংকাজনক হারে বেড়েছে অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। কমেছে জিপিএ-৫। এতে হতাশা হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শিক্ষকদের গাফিলতি, দায়িত্বহীনতা, নিয়মিত ক্লাস না নেয়া ও অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল অর্জন করতে পারেনি বলে অভিমত পোষণ করেছেন শিক্ষাবিদরা।
নরসিংদী জেলার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ নরসিংদী সরকারি কলেজ। শুধু জেলার নয় পাশ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার ২০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে কলেজটিতে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় কলেজটি থেকে ২ হাজার পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৬৭৫ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ২৪ জন। অথচ ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী এসএসসিতে জিপিএ ৫ নিয়ে ভর্তি হয়েছিল।
একই অবস্থা জেলার অন্য দু'টি সরকারি কলেজ নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ ও শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের। নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এক হাজার ১৪ জন শিক্ষার্থী পরীায় অংশ নিয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে ৫০১ জন। এবার এ প্রতিষ্ঠানটি থেকে কেউ জিপিএ ৫ পায়নি। আর শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ থেকে এক হাজার ৫২১ জন শিক্ষার্থী পরীায় অংশ নিয়ে অনুত্তীর্ণ হয়েছে এক হাজার ৯৭ জন। অর্থাৎ এ কলেজের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছে। সরকারি কলেজগুলোর এমন ফলাফল ধসে বিব্রত অধ্যায়ণরত শিক্ষার্থীরা। এজন্য তাঁরা নিয়মিত পাঠদান না হওয়া এবং শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহ ও অনুপস্থিতিকে দায়ী করেছেন।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যতগুলো পরীক্ষাই হয় প্রত্যেকটিই এই কলেজগুলোতে হয়ে থাকে। আর নরসিংদী সরকারি কলেজ হচ্ছে এর মধ্যে অন্যতম। নরসিংদী সরকারি কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত পরীক্ষাগুলো ছাড়াও এ কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের পি-টেস্ট, টেস্টসহ অন্যান্য পরীক্ষাগুলো এখানেই হয়ে থাকে। যার কারণে এই কলেজে শিক্ষার্থীদের তেমনভাবে পাঠদানের সুযোগ হয়ে উঠে না। আর নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের চিত্রও প্রায় একই রকম। কিন্তু নরসিংদী সরকারি কলেজের তুলনায় মহিলা কলেজে পরীক্ষার চাপ কম থাকলেও তেমন ভাবে পাঠদান হচ্ছে না নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজে। তবে শিবপুর সরকারি শহীদ আসাদ কলেজের চিত্র একটু ভিন্ন। সেই কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা না হলেও সঠিক ভাবে পাঠদান করছেন শিক্ষকরা।
নরসিংদী সরকারী কলেজের শিক্ষার্থী রকিবুল ইসলাম বলেন, কলেজে নিয়মিত ক্লাস হয় না। ছাত্ররা আসে আর যায়। শিক্ষকরাও ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে আন্তরিক নয়। পাঠদানও ভালো হয় না। তাই অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে যায় না।
ফলাফল বিপর্যয়ের খবরে হতাশ দ্বাদশ শ্রেণির অভিবাকরা। অভিবাবক হারুন মিয়া বলেন, অতন্ত্য স্বনামধন্য ছিল এই কলেজটি। আমি পড়েছি, আমার বাবা-দাদারাও পড়েছে। এখন ছেলে মেয়েদের পড়তে পাঠিয়েছি। কিন্তু ফলাফল এমন হলে আমাদের সন্তানদের ভবিষৎ নষ্ট হয়ে যাবে।
নরসিংদী সরকারি কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা মিয়া বলেন, প্রকৃত শিক্ষাদান ও ভালো ফলাফল অর্জনে নরসিংদীর সরকারি কলেজগুলো পিছিয়ে পড়ছেন। এর প্রধান কারণ শিক্ষার্থীদের ক্লাস বিমুখ হওয়া। নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়া। এ থেকে মুক্তি পেতে শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে ক্লাসমুখি করতে হবে। একই সাথে শিক্ষক-অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
ফলাফল বিপর্যয়ের কথা স্বীকার করে নরসিংদী সরকারি কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, অবকাঠামো, শিক্ষক স্বল্পতা ও বিভিন্ন পরীক্ষার কারণে পাঠদান ব্যাহত হওয়াই ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে।
তবে সরেজমিনে কলেজে গিয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। শ্রেণি কক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীদের স্থান সংকুলন না হওয়ার দাবি করলেও উল্টো চিত্র দেখা গেছে শ্রেণিকক্ষগুলোতে। সেখানে গিয়ে তেমন কোন শিক্ষার্থীই দেখা যায়নি শ্রেণি কক্ষগুলোতে।
বিডি প্রতিদিন/এ মজুমদার