শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১০ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ জুলাই, ২০১৮ ২৩:৩১

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা

মো. শফিকুল আলম

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা

১০ জুলাই ২০০১ সালে  হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে সন্ধ্যায় আমি তাকে দেখতে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর রোডের বাড়িতে যাই। তিনি তখন ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেড রেস্টে। আমি এসেছি জেনেই আমাকে ভিতরের রুমে ডেকে পাঠান। সেদিন তাকে কিছুটা ক্লান্ত ও বিমর্ষ দেখালেও চেহারার ঔজ্জ্বল্য এতটুকু ম্লান হয়নি। আমি ইচ্ছা করেই সংক্ষিপ্ত আলাপচারিতা ও কুশলাদি বিনিময়ের পর বাসায় চলে আসি। সেদিন ঘূর্ণাক্ষরেও কল্পনা করিনি এটাই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা। এ অবিনশ্বর পৃথিবী থেকে কালের অমোঘ বিধানে আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা মরে গিয়েও তাদের কর্মের মধ্যে বেঁচে থাকেন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তারই একজন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা-বিরোধী পরাজিত শক্তি জাতির জনককে নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করার সময় প্রবাসে থাকায় তার আদুরের দুই কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। হতে পারে বাবার সারা জীবনের স্বপ্ন দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর পথ সুগম করার জন্য পরম করুণাময় তাদের ঘাতকের নির্মম বুলেট থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই দুঃসময়ে জার্মানিতে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতির জনকের দুই কন্যাকে আশ্রয় দিয়ে শুধু মানবিক দায়িত্বই পালন করেননি, তিনি সেদিন বাঙালি জাতির মুখও রক্ষা করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, স্বাধীনতাপ্রিয় বাঙালি তাকে এই বিশেষ কারণেও চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। ঘটনাক্রমে ১৯৯১ সালের শেষ দিকে এই মহান মানুষটির সঙ্গে আমার শুধু পরিচয়ই নয়, আমৃত্যু আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এজন্য আমি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। আমার সঙ্গে তার পরিচয়, অবশেষে আওয়ামী লীগে যোগদান, সে অনেক কথা, অনেক স্মৃতি, যা এই স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়।

কুমিল্লার হোমনা-দাউদকান্দির যে নিভৃত এলাকায় আমার জন্ম, রাজধানী ঢাকার অতি নিকটবর্তী হলেও এ ভূখণ্ডটি ছিল চারদিক থেকে নদীদ্বারা বিচ্ছিন্ন একটি দুর্গম চরাঞ্চল। জনমদুঃখী মানুষগুলোর করুণ চিত্র সেই শৈশব-কৈশোরে চোখের সামনে দেখেছি। প্রায় সারা বছরই হাঁটু কিংবা কোমরপানি ভেঙে মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে চলাফেরা করতে হতো। প্রসব বেদনায় কাতর কোনো মা কিংবা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে খাটিয়ায় করে চিকিৎসার জন্য কোথাও নিতে পথিমধ্যেই মৃত্যুবরণ করেছেন— এমন অসংখ্য বেদনার স্মৃতি এখনো মনকে নাড়া দেয়। প্রান্তিক ক্ষুদ্র চাষি ও হতদরিদ্ররা পরিবার-পরিজন নিয়ে কর্মসংস্থানের অভাবে সারা বছর অনাহারে-অর্ধাহারে কাটাত। ছিল না ন্যূনতম রাস্তাঘাট, যোগাযোগব্যবস্থা, ছিল না শিক্ষা-দীক্ষার তেমন কোনো সুযোগ। এরূপ বাস্তবতায় মুক্তির পথ হিসেবে একটি প্রশাসনিক থানা গঠনের দাবি এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। কত মন্ত্রী-এমপি-নেতা যান-আসেন, কিন্তু ওদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ছাত্রজীবন থেকেই অনেকটা মনের অজান্তে এলাকাবাসীর এ দুঃখ দূর করার স্বপ্ন আমার বুকে বাসা বাঁধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদ আমার মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ ২৩ বছর পর হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে জাতির জনকের কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬-এর সংসদ নির্বাচনে জনতার রায় নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আমার নেত্রী প্রধানমন্ত্রী ও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। শুরু হয় আমার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। একদল তরুণ ও রতন শিকদারের মতো কিছু বিশ্বস্ত সহকর্মী সঙ্গে নিয়ে দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন একটি প্রশাসনিক থানা গঠনের বার্তা নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়াই। এরই ধারাবাহিকতায় আমাকে সভাপতি ও রতন শিকদারকে সদস্যসচিব করে গঠিত হয় ‘মেঘনা উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটি’।

সেই কমিটির আমন্ত্রণে স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৯৭-এর ১৭ মে রামপুর বাজারের চরাঞ্চলে এসে আমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে ‘মেঘনা’ নামে একটি উপজেলা গঠনের আশ্বাস দেন।

অবশেষে ১৯৯৮ সালের ২৬ আগস্ট নিকাবের ৮৩তম সভায় প্রিয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেঘনা উপজেলা গঠনের প্রস্তাব সদয় অনুমোদন করেন। সেই থেকে বাংলার মানচিত্রে আরেকটি উপজেলার মানচিত্র অঙ্কিত হয়। পূরণ হয় আমার আজীবনের স্বপ্নসাধ। ২০০৯ সালে আমি এ উপজেলার প্রথম প্রতিষ্ঠাতা উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হই। রাস্তাঘাট, পুল, কালভার্ট, অফিস-আদালত, ব্যাংক, হাসপাতাল, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ইত্যাদি উন্নয়নের মধ্য দিয়ে মেঘনা উপজেলা যেন এগিয়ে চলেছে দুর্বার গতিতে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সড়কপথে যোগাযোগ স্থাপন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দোকানপাট, হাজার হাজার বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থান, দৃষ্টিনন্দন দালান-কোঠা নির্মাণ ইতিমধ্যেই এক অবিশ্বাস্য ও বিস্ময়কর পরিবর্তন সাধিত হয়েছে; যা কল্পনাকেও হার মানায়। শুধু অবকাঠামোগত ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই নয়, সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব বিকাশের। মেঘনার বর্তমান প্রজন্মের চোখেমুখে আমি দেখতে পাই আগামী দিনের সোনালি স্বপ্ন। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে মেঘনা উপজেলার প্রতিষ্ঠা। আমিও একদিন থাকব না! মেঘনা উপজেলা থাকবে। প্রিয় নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মহানুভবতার কথা মেঘনাবাসী কোনো দিন ভুলবে না, কোনো দিন ভুলবে না হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর অবদান ও তার অমর স্মৃতি।

লেখক :  সাবেক চেয়ারম্যান  মেঘনা উপজেলা, কুমিল্লা।


আপনার মন্তব্য