শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ আগস্ট, ২০২০ ২৩:১৭

অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ এবং আমার ভাবনা

তসলিমা নাসরিন

অযোধ্যার মন্দির-মসজিদ এবং আমার ভাবনা

যেদিন অযোধ্যার রায় বেরোলো, ২০১৯-এর ৯ নভেম্বরে, সেদিনই লিখেছিলাম, “আমি যদি বিচারক হতাম, তাহলে ২.৭৭ একর জমি সরকারকে দিয়ে দিতাম আধুনিক বিজ্ঞান স্কুল বানানোর জন্য, যে স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা ফ্রি পড়তে পারবে। আর পাঁচ একর জমিও সরকারকে দিয়ে দিতাম আধুনিক হাসপাতাল বানানোর জন্য, যে হাসপাতালে রোগীরা বিনে পয়সায় চিকিৎসা পাবে।” আমার এই মতের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, আগামী ১০০০ বছরে সম্ভব নয় ধর্মীয় উপাসনালয়ের জায়গায় অন্য কিছু নির্মাণ করা। কেউ কেউ বলেছে, স্কুল, একাডেমি, গবেষণাগার, হাসপাতাল, ফুলের বাগান এগুলো বানানোর জায়গার কি অভাব পড়েছে? তা ঠিক, অভাব পড়েনি। তাই ২.৭৭ একর জমিতে মন্দির হতে যাচ্ছে, আর পাঁচ একর জমিতে হতে যাচ্ছে মসজিদ।

উত্তর ইউরোপের গির্জাগুলো দেখলে চমকিত হই। খালি পড়ে থাকে বছরভর। রোববার সকালে প্রার্থনায় যোগ দিতে হাতেগোনা কয়েকজন আসে তো আসে না। গির্জায় পর্যটকরাই ভিড় করে। ওরাই শিল্প স্থাপত্য দেখতে আসে। উপাসনালয়গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে জাদুঘরে। আমাদের অঞ্চলের উপাসনালয়গুলোয় ভিড় কমছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে। এই অবস্থায় আমি ভারতের হিন্দুদের অনুরোধ করি : ‘তোমাদের এত যে বিজ্ঞানমনস্ক করতে চেয়েছি, লাভ কিছু হয়নি। পূজা আচ্চা যখন করবেই করো, মন্দির বানাবেই যখন বানাও, এমনকী রাষ্ট্রকেও যদি হিন্দুরাষ্ট্র বানিয়েই ফেল, তাহলেও মুসলমানদের নির্যাতন করো না, লক্ষ রেখো নানান গোষ্ঠী-বর্ণ-জাত-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষ যেন শান্তিতে এবং নিরাপদে সেই রাষ্ট্রে বাস করতে পারে।’ ঠিক যেমন বাংলাদেশের মুসলমানদের অনুরোধ করি : ‘তোমাদের এত যে বিজ্ঞানমনস্ক করতে চেয়েছি, লাভ কিছু হয়নি। নামাজ-রোজা যখন করবেই করো, মসজিদ বানাবেই যখন বানাও, এমনকী রাষ্ট্রকেও যদি ইসলামিক রাষ্ট্র বানিয়েই ফেল, তাহলেও হিন্দুদের নির্যাতন করো না, লক্ষ রেখো নানান গোষ্ঠী-বর্ণ-জাত-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষ যেন শান্তিতে এবং নিরাপদে সেই রাষ্ট্রে বাস করতে পারে।’ দুর্ধর্ষ মৌলবাদীরা যেমন তক্কে তক্কে থাকে আমার স্খলন কিছু হলো কিনা দেখার জন্য, যেন খপ করে ধরে দামামা বাজিয়ে আমার আরও কিছু সর্বনাশ করতে পারে, তেমন সেক্যুলার নামধারী কিছু লোকও একই মতলব নিয়ে তক্কে তক্কে থাকে। তাদের এবারের ভাষ্য আমি কেন মন্দির মসজিদ বানাবার পক্ষে রায় দিয়েছি। যারা অভিযোগ করেছে মনে মনে ভাবি, তারা নিশ্চয়ই আমার চেয়েও বেশি সেক্যুলার, আমার চেয়েও বড় অসাম্প্রদায়িক, আমার চেয়েও বড় নাস্তিক, আমার চেয়েও বড় মানববাদি, মুক্তচিন্তক, আমার চেয়ে বেশি ভুগেছে নিজের মতবাদের জন্য, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আমার চেয়ে বেশি বই লিখেছে, আমার চেয়েও বেশি ফতোয়ার শিকার তারা, তাদের মাথার দাম আমার মাথার দামের চেয়ে বেশি, আমার চেয়েও বেশি তারা গৃহহীন, দেশহীন, আমার চেয়েও বেশি নিষিদ্ধ!!

আমি লক্ষ করেছি, মৌলবাদিরা আমার মাথার দাম ঘোষণা করলে এই সেক্যুলার নামধারীদের টিকিটি দেখা যায় না, সম্ভবত ওরা দূর থেকে সার্কাস দেখে, প্রতিবাদের একটি শব্দও কিন্তু উচ্চারণ করে না। যখন দেখে বিজেপি ক্ষমতায় এসে আমার এক বছরের ভিসার মেয়াদ কমিয়ে দু’মাস বা তিন মাস করে, তখন কি এরা নিন্দে করে বিজেপির তসলিমা-বিরোধিতার? না। যখন করভাচৌত, সিঁদুর খেলা, রাখি নিয়ে প্রশ্ন ক’রে, ভাইফোঁটার মতো বোনফোঁটা উৎযাপন করার কথা ব’লে, মনুসংহিতার সমালোচনা করে, সতীদাহের নিন্দে করে, যখন রামদেব, সত্য সাঁই বা বাবাদের নিয়ে সংশয় প্রকাশ ক’রে, অযোধ্যার রামমন্দিরের জায়গায় বিজ্ঞান স্কুলের এবং মসজিদের জায়গায় আধুনিক হাসপাতালের প্রস্তাব দিয়ে প্রচ- আক্রান্ত হই কট্টর হিন্দু দ্বারা, তখনও আমাদের ‘সেক্যুলার হিন্দু-মুসলমান’ চোখ নাচিয়ে সার্কাস দেখে।

হিন্দুদের মহাসমারোহে মন্দির বানানো, ধর্মান্ধ হওয়া, মুসলিম-বিরোধিতা সবই এই সময়ের বাস্তবতা। ভুলে গেলে চলবে না এই উপমহাদেশ হিন্দু মুসলমান পরস্পরকে কচুকাটা করে দেশভাগ করেছে। দশ লক্ষ মানুষের রক্তের ওপর বসানো হয়েছে বিভেদের কাঁটাতার। বাংলাদেশের মসজিদ, হিজাব, বোরখা এই সময়ের বাস্তবতা। এই বাস্তবতা তৈরিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা উপমহাদেশের স্বার্থান্বেষী দূরদৃষ্টিহীন রাজনীতিকদের। এই দুঃখজনক বাস্তবতার মধ্যে বর্বরতা আর হিংস্রতা যত কম হয়, সেই চেষ্টা করতে হয়।

মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যাল যখন ধর্ষণ করে, তখন বলি, মাদ্রাসায় যেন আর একটিও ধর্ষণ না হয়। আমি মাদ্রাসা বিলুপ্ত করার কথা না বলে ধর্ষণ বন্ধ করার কথা বলেছি, তার মানে এই নয় যে, আমি মাদ্রাসা সিস্টেমে বিশ্বাস করি। কোথাও নারী নির্যাতন হলে বলি নারী নির্যাতন বন্ধ করো। কমিউনিস্টরা যেমন বলে-‘নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার দরকার নেই, কমিউনিজম এলে নারী নির্যাতন এমনিতেই বন্ধ হবে’, তেমন করে বলি না ‘আগে পুরুষতন্ত্র বিলুপ্ত হোক, তখন নারী নির্যাতন এমনিতেই বন্ধ হবে’। পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলতে থাকলেও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আলাদা করে প্রতিবাদ করতে হয়।

মন্দির বানানো বন্ধ করো বললেই মন্দির বানানো বন্ধ হয় না, ঠিক যেমন মসজিদ বানানো বন্ধ করো বললেই মসজিদ বানানো বন্ধ হয় না কোথাও। ধর্ম বিলুপ্ত হোক বলে চেঁচালেও ধর্ম অদূর ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হবে না। তার চেয়ে ধর্মান্ধতায় ডোবা এই সমাজ থেকে যেন যুক্তিবাদি আর মুক্তচিন্তকের জন্ম হয়, সেই চেষ্টা করি। এই যুক্তিবাদিরাই একদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে, সমাজ বদলাবে- এই স্বপ্ন নিয়ে। ভারতে ধর্ম এবং কুসংস্কার প্রায় সবাই মানে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই। শনি-মঙ্গল-বৃহস্পতিবারে আমিষ খায় না, একশ রকম পুজো আচ্চায় উপোস করে, বারো মাসে তেরো নয়, তেরোশ পুজোর আয়োজন করে। গাছের গায়ে লাল দাগ দেখলেও নমস্কার করে। দোকানিরা দোকান খুলে টাকার পুজো আগে সেরে নেয়। বিজ্ঞানীরাও গাড়ি কিনে গাড়ির পুজো করে তারপর গাড়ি চালায়। এটাই বাস্তবতা। রাম মন্দির ঠিক সেরকমই বাস্তবতা। বাংলাদেশে পাড়ায় পাড়ায় একশ মসজিদ যেমন বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মানুষকে বিজ্ঞান মনস্ক করা দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম। আপাতত কী করতে হবে? যেন হিন্দু মুসলমান পরস্পরকে কচুকাটা না করে, কেউ কাউকে নির্যাতন না করে, যেন ভায়োলেন্স থেকে বিরত থাকে, যেন ঘৃণা দূর করে মন থেকে, যেন বিদ্বেষ বিদেয় করে। তুমি যখন ধর্ম মানবেই, মন্দির মসজিদ বানাবেই, সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নিয়ে রাষ্ট্রকে ধর্মভিত্তিকও যদি করে ফেলো, বিধর্মীদের নির্যাতন কোরোনা, পারলে সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক রেখো। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে দাবির প্রশ্ন অবান্তর, করজোড়ে শুধু অনুরোধ করা যায়।

কিছু নাস্তিক মনে করে আমি যেহেতু নাস্তিক, আমার দিন রাতের কাজ হলো আল্লাহ ঈশ্বর ভগবান বলতে যে কিছু নেই, ধর্মগ্রন্থগুলো যে বিজ্ঞান-বিরোধী, যুক্তিহীন,- তা নিয়ে লেখা, তা নিয়ে বলা, তা নিয়ে মেতে থাকা। আমি সেটা কদাচিৎ করি। নাস্তিকতা প্রচার আমার মূল উদ্দেশ্য নয়। আমার মূল উদ্দেশ্য নারীর সমানাধিকারের জন্য, মানবাধিকারের জন্য, মানবতার জন্য, মতপ্রকাশের অধিকারের জন্য, রাষ্ট্র আর ধর্মের পৃথকীকরণের জন্য, মানুষকে কুসংস্কারমুক্ত করার জন্য, বিজ্ঞানমনস্ক করার জন্য, নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে আইন তৈরির জন্য, যারাই নিপীড়িত তাদের অধিকারের জন্য, নিচুজাত-আদিবাসি-উপজাতি ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে যাদের অত্যাচার করা হয় তাদের অধিকারের জন্য, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য, সমতার সমাজ নির্মাণের জন্য সরব হওয়া। এর ফলে কিছু মানুষও যদি সচেতন হয়, তাহলেই আমি সার্থক।

                লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।


আপনার মন্তব্য