শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১০ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ মে, ২০২১ ২২:৫৯

আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত রাজ্জাক

এস এম তরিকুল ইসলাম

আগরতলা মামলায় অভিযুক্ত রাজ্জাক
Google News

‘এতো রক্তের সাথে রক্তের টান স্বার্থের অনেক ঊর্ধ্বে, হঠাৎ অজানা ঝড়ে তোমায় হারালাম, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল/ বাবা কতদিন কতদিন দেখি না তোমায়/ কেউ বলে না তোমার মতো কোথায় খোকা ওরে বুকে আয়.../বাবা কতরাত কতরাত দেখিনা তোমায়...।’ প্রিন্স মাহমুদের লেখা ও সুর করা নগর বাউল জেমসের কণ্ঠে এ গানটি যতবার শুনেছি ততবারই আপ্লুত হয়েছি। চোখের সামনে ভেসে উঠেছে আমার লড়াকু বাবার নানা স্মৃতি। আমার বাবা সুবেদার আবদুর রাজ্জাক ছিলেন ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার চৌদ্দ নম্বর অভিযুক্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে এই একটি মামলাই বোধহয় আছে যে মামলায় অভিযুক্ত হওয়া গর্বের ও অহংকারের। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত। জাতির পিতার সঙ্গে ছিল বাবার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বয়সে বাবা বড় ছিলেন তিন বছরের। এ কারণে বাবাকে বঙ্গবন্ধু ‘রাজ্জাক ভাই’ বলে ডাকতেন। ১৯১৭ সালের ১০ মে জন্ম নেওয়া বাবা বেঁচে থাকলে আজ তার ১০৪ বছর পূর্ণ হতো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে একদল বিপথগামী। আর ২০০৪ সালের ওই ১৫ আগস্টই বাবা প্রয়াত হন। কতদিন হলো বাবার ডাক শুনি না, দরাজ কণ্ঠের শাসন কিংবা আদর পাই না। যুদ্ধের মাঠে মাঠেই বাবার জীবনের বড় একটা অংশ কেটে গেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরির ২৯ বছরের মধ্যে ছয় বছরেরও বেশি সময় তিনি যুদ্ধের ময়দানে কাটিয়েছেন। দেশ স্বাধীন করার জন্য বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় বেশ সময় কেটেছে জেলখানার প্রকোষ্ঠে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের পরপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং পাকিস্তানে পদায়ন থাকায় তিনি সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যরা ভারতের সঙ্গে মিলে পাকিস্তানের অখ-তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন- এমন অভিযোগ তুলে ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান গং মামলা’। আগরতলা মামলাকে কালিমালিপ্ত করার জন্য পাকিস্তানি শাসকেরা এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছিল ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি। কিন্তু এ মামলাই জোয়ার এনে দেয় বাঙালির মুক্তির বাসনায়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ এ মামলা পরবর্তীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবেই বেশি পরিচিত।

মামলা দায়ের করার আগে ১৯৬৭ সালের ৯ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী, রাজনৈতিক এবং সরকারি কর্মকর্তা মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে ৩৫ জনকে আসামি করে তাদের বিরুদ্ধে ১০০টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করে মামলা দায়ের করে তৎকালীন সরকার। শেখ মুজিবুর রহমানকে করা হয় ১ নম্বর আসামি। বাকি ৩৪ আসামির বেশির ভাগই সামরিক বাহিনীর সদস্য। আমার বাবা সুবেদার আবদুর রাজ্জাক ছিলেন এ মামলার চৌদ্দ নম্বর আসামি। মামলার অভিযোগে বলা হয়- ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি বাবাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। একই অভিযোগে আগে থেকেই জেলে আটক থাকা শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে ১৮ জানুয়ারি পুনরায় গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক হেফাজতে নিয়ে যাওয়া হয়। ‘ফাঁসির দড়িতে ঝুললেও সাক্ষী দেব না’ স্পষ্ট করেই পাকিস্তানি সেনাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন বাবা। নানা কৌশলে সে সময় বাবাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তারপরও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য আদায় করতে পারেনি পাকিস্তানিরা। সন্ধ্যা হলেই বাবার ওপর নেমে আসত নরকের যন্ত্রণা। দুই হাত প্রশস্ত করে রশি দিয়ে বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো। হাতের প্রতিটি আঙুলের ডগায় ইলেকট্রিক সুচ লাগানো থাকত। ঘুম এলে নড়াচড়ায় সুচগুলো বিঁধে যেত নখের ভিতরে। এ সময় মাগো, বাবাগো করে চিৎকার করতে থাকতেন বাবা। আর তখনই বুটজুতো পায়ে দৌড়ে এসে পাকিস্তানি সেনারা বলত- ‘বল, শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিবি কিনা?।’ বাবার স্রেফ জবাব ছিল- ‘না’। এভাবেই দিনের পর দিন পাকসেনারা নির্যাতন চালিয়েছে বাবার ওপর। শুধু বাবাকে নয়, এমন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন গ্রেফতার হওয়া প্রায় সবাই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেননি বাবা।

বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান অল ইন্ডিয়া আর্মি টিমে অগ্রভাগে বাবা ফুটবল খেলেছেন। একবার অল ইন্ডিয়া টিমের সদস্য হয়ে ইতালি খেলতে গেলেন। মাঠের মাঝখানে প্রতিপক্ষের আক্রমণে তার ডান পা হাঁটুর ওপর থেকে ভেঙে গেল। বিশেষ একটি বিমানে দ্রুত তাকে পাঠানো হলো ভারতের উত্তরাখ- অঙ্গরাজ্যের কুমায়ূন বিভাগের নানিতলা জেলার বিখ্যাত একটি হাসপাতালে। এক মাসের মধ্যেই ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন তিনি। শুধু ফুটবল খেলাই নয়, বাবা একজন বক্সারও ছিলেন। হেভিওয়েট বক্সার বাবার দুর্দান্ত আক্রমণে যশোর ক্যান্টনমেন্টে একবার তাঁর প্রতিপক্ষ এক পাঠান বক্সার মারাও গিয়েছিলেন। হর্সপলোতে তার বিকল্প ছিল না। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে বাবা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। যশোর এলাকায় কখনো যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি অংশগ্রহণ, কখনো আবার প্রশিক্ষক হিসেবে ভারতের ৮ নম্বর থিয়েটারে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে বহুবার গেছেন বাবা। নানা মিটিংয়েও অংশ নিয়েছেন। বাবা হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। আমরা পাঁচ বোন যাদের সবাইকেই তিনি লেখাপড়া করিয়ে যোগ্য পাত্রের কাছে বিয়ে দিয়েছেন। বাবা তাঁর পাঁচ মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নিয়মিত যেতেন। তাদের নিয়মিত চিঠি লিখতেন। তার সব কন্যার ঘরে জন্ম নেওয়া নাতি-নাতনি তিনি দেখেছেন। শুধু স্বপ্ন ছিল তাঁর একমাত্র পুত্রের ঘরে কোনো সন্তানের মুখ দেখা। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর। মৃত্যুর মাত্র পাঁচ মাস পর আমার মেয়ের জন্ম হয়। বংশধর দেখে যাওয়ার স্বপ্ন অধরা রেখেই তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। জাতির এ বীর সন্তান আমার বাবা সুবেদার আবদুর রাজ্জাককে তার ১০৪তম জন্মদিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি।

লেখক : জেলা প্রশাসক, গাজীপুর ও আগতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত সুবেদার আবদুর রাজ্জাকের পুত্র।