মঙ্গলবার, ৩ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা
কাঁদো জাতি কাঁদো

হালের খন্দকার মোশতাকরা

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

হালের খন্দকার মোশতাকরা

আমি

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার লোক। অথচ যখন নেতার সামনে যাই, তিনি স্মৃতি হাতড়িয়ে খোঁজেন আমি যেন কার লোক ছিলাম? তবে যে হেলেনা-সাহেদদের পেলে নেতা কালবিলম্ব না করে বুকে টেনে নেন, সেলফি তোলেন। আর আমাকে দেখলে হিসাব করেন আমি কোন গ্রুপের, কার লোক? ২০ বছর দেশের বাইরে থেকেও আমি শরীর থেকে রাজনৈতিক গ্রুপিংয়ের ছাপটা মুছতে পারলাম না! কর্মীদের সঙ্গে গ্রুপিং আর হাইব্রিডদের সঙ্গে আলিঙ্গনকারী এসব নেতাকে দেখলে আমার কাছে তাদের হালের খন্দকার মোশতাক মনে হয়।

পরবর্তী বইয়ের জন্য ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে দেখলাম, গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকেই মুসলিম ছাত্রলীগ, মুসলিম লীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ সবখানেই খন্দকার মোশতাক আহমদ খুব নিবেদিত কর্মী এবং নেতা হিসেবে ছিলেন। কুমিল্লার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে সবার আগে তখন খন্দকার মোশতাকের নামই আসত। অথচ এ মোশতাকই একাত্তরে গোপনে গোপনে পাকিস্তানকে অখন্ডিত রাখার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তার সেই পাপ ও পাকিস্তানপ্রীতি পরবর্তীতে আমরা মনে রাখিনি। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘদিনের সহচর, আওয়ামী লীগ নেতা এ মোশতাকই আবার বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপতিও ঘোষণা করেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সূর্যসন্তান বলে আখ্যায়িত করেন।

জীবনের প্রতি হুমকি আছে জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কখনো ব্যাপারটাতে গুরুত্ব দেননি। বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংস্থা বহুবার সতর্ক করলেও বাংলার মানুষ তাঁকে হত্যা করতে পারে তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। জননেত্রী শেখ হাসিনা অন্তত এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। সর্বোচ্চ ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর নিরাপত্তাব্যবস্থার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি জানেন ঘাতকের বুলেট তাঁকে তাড়া করে ফিরছে সারাক্ষণ। গত এক যুগে সারা দেশটাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর এ দীর্ঘ ও সফল নেতৃত্বের পথচলায় তিনি নিজের মতো করে একটা কোর টিম গঠন করে নিয়েছেন। তবে সরকারপ্রধান হিসেবে তিনি সমমনা রাজনৈতিক দলসমূহ ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীদের কতটুকু সহায়তা পেয়েছেন তা বিশ্লেষণের সময় এসেছে।

এখন দিন বদলেছে, রাজনীতির ধারারও পরিবর্তন হয়েছে। আন্দোলন, জনমত গঠনের কৌশলগুলোও বদলেছে। রাজনীতি আর আগের মতো অত বেশি রাজপথ-মিছিল-সেøাগান নির্ভর নয়। প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের কাছে ভার্চুয়াল জগৎটাও এখন গুরুত্বপূর্ণ। অথচ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে যতটা আধুনিক হওয়া উচিত ছিল তা তারা পারেনি। তবে তাদের অনেকের দুর্নীতিপ্রীতি খুব চোখে লাগে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অতীতের সামরিক শাসকদের দুর্নীতিপ্রবণ রাজনীতির চর্চা পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক দলের অনেক নেতার ওপরই ভর করেছে।

বাংলাদেশে এ শতাব্দীর রাজনীতিতে নতুন সংযোজন ছিল টাকার বিনিময়ে রাজনীতির পদ বেচাকেনা। এই যে সাহেদ-পাপিয়া-হেলেনাদের কুকীর্তি উদ্ঘাটিত হলে আমরা কিছুদিন হইচই, হা-হুতাশ করি, তারপর থেমে যাই, অন্যান্য ইস্যুতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এসব কাউয়া-হাইব্রিড কীভাবে দলে ঢুকে এত দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠে? কে বা কারা তাদের দলে ঢোকার পথ করে দেয়? কাদের প্রশ্রয়ে এরা মাথায় ওঠে? সবকিছুর মূলেই রয়েছে টাকা এবং ক্ষেত্রবিশেষ নারীদেহের লেনদেন। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। আর সমস্যা সমাধানের অন্যতম শর্ত হলো সমস্যা চিহ্নিত করা, তার কার্যকারণ নির্ধারণ করা। যদি সমস্যার সমাধান চাই, সমস্যার স্বরূপ ও কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

পঁয়ত্রিশ বছরের বেশি হলো একটি রাজনৈতিক ধারার সঙ্গে জড়িত আছি। এ রাজনীতির অনেককেই তাই প্রত্যক্ষভাবে চিনি। অনেক নেতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। যেমন নিবেদন তেমন আত্মত্যাগ, দলের প্রতি কী ছিল না তাদের? দলের জন্য, দেশের জন্য, জনগণের জন্য, স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে কত নির্যাতনই না তারা সহ্য করেছেন। এসব নেতাকে দেশবাসীর পাশাপাশি আমরাও অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা করতাম।

আজ ক্ষমতাসীন দলের এসব নেতার অনেককেই খুব অচেনা লাগে। দূর থেকে তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে যা শুনতে পাই তাতে হিসাব মেলে না। আমি বলছি না যে রাজনীতি করলে দরিদ্র থাকতেই হবে। আমি বলছি না যে নিজের দলের সরকার ক্ষমতায় থাকলে কোনো সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। তবে তার তো একটা সীমা থাকবে। এক জীবনে একজন মানুষের কত অর্থের প্রয়োজন হয়? একসময়ের কর্মীবান্ধব এসব নেতার কাছে তৃণমূলের কর্মীরা এখন আর আগের মতো গুরুত্ব বহন করে না। দলের জন্য অন্তপ্রাণ কর্মীদের দূরে ঠেলে দিয়ে এরাই আজ হেলেন-পাপিয়া-সাহেদের গডফাদার হয়েছেন। আদর্শের বঙ্গবন্ধুকে ভুলে এরা আজ মেতেছেন ভোগের খেলায়। এদের কার্যকলাপ দেখে খন্দকার মোশতাকের কথা মনে পড়ে। মোশতাকও একসময় দলের জন্য নিবেদিত একজন কর্মী এবং নেতা ছিলেন। পঁচাত্তরে এ খোন্দকার মোশতাকরাই বঙ্গবন্ধুকে শারীরিকভাবে হত্যা করেছিলেন। আর আজকালকার খোন্দকার মোশতাকরা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে হত্যা করতে উদ্ধত।

লেখক : কবি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ায় স্বেচ্ছানির্বাসিত।

এই রকম আরও টপিক