শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ জুলাই, ২০১৯ ০০:০১

সার্কাস পুনরুদ্ধারে শিল্পকলার অ্যাক্রোবেটিক কার্যক্রম

মোস্তফা মতিহার

সার্কাস পুনরুদ্ধারে শিল্পকলার অ্যাক্রোবেটিক কার্যক্রম

প্রাচীন বিনোদন মাধ্যম হিসেবে সার্কাস এদেশের বিনোদনপ্রিয় মানুষের কাছে সমাদর অর্জন করেছে এর শৈল্পিকতায়। নিজেদের স্বপ্রতিভ উপস্থিতি ও শারীরিক কসরতের মধ্য দিয়ে সার্কাসের শিল্পীরা যুগের পর যুগ এদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ সব শ্রেণির মানুষকে নির্মল আনন্দ দিয়ে আসছিলেন। শারীরিক কসরত, মূকাভিনয়, রশির ওপর দিয়ে হাঁটা, পোষা প্রাণীদের দিয়ে চমক লাগানোর মতো নৈপুণ্য উপস্থাপন করে সার্কাসের শিল্পীরা বিনোদন দিয়ে আসছিলেন বিনোদনপিপাসু মানুষদের। আকাশ সংস্কৃতির উন্মত্ততা ও আধুনিকতার বাড়াবাড়িতে হারিয়ে যাওয়ার পথে ঐতিহ্যবাহী বিনোদনমাধ্যম ‘সার্কাস’। হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে পরিবর্তিত ‘অ্যাক্রোবেটিক’ নামে শিল্পকলা একাডেমি বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়। যদিও ‘সার্কাস’ ও ‘অ্যাক্রোবেটিক’ এক জিনিস নয় তবুও শিল্পকলা একাডেমির এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। ১৯৯৪ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ‘ফাইন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্ট প্রশিক্ষণ’ প্রকল্পের আওতায় শিল্পীদের প্রশিক্ষণ ও সংস্কৃতির উন্নয়নের জন্য রাজবাড়ীতে অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে একটি অ্যাক্রোবেটিক দল গঠন করে কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে ফাইন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্ট প্রশিক্ষণ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অর্থের অভাবে অ্যাক্রোবেটিক দলের শিল্পীদের শারীরিক কসরত প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। এরপর একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী ২০১১ সালে একান্ত প্রচেষ্টায় রাজবাড়ীর অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আওতায় নিয়ে আসেন এবং বড়দের একটি অ্যাক্রোবেটিক দল গঠন করেন। দলটির নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি অ্যাক্রোবেটিক দল’। ২০১২ সালে প্রথম পর্যায়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন’ কর্মসূচির আওতায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বড়দের ১০টি প্রদর্শনী এবং ছোটদের দুটি অ্যাক্রোবেটিক কর্মশালার আয়োজন করে। ৫০ জন শিশুকে নিয়ে প্রথমটি অনুষ্ঠিত হয় রাজবাড়ী জেলার অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। কারণ, রাজবাড়ী জেলায়ই অ্যাক্রোবেটিকের মূল স্থান হিসেবে সর্বজনবিদিত। এরপর ৭২ জন শিশুকে নিয়ে দ্বিতীয়টি অনুষ্ঠিত হয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায়। এরই ধারাবাহিকতায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় (২০১৩-২০১৪) অর্থবছরে দেশের ৬৪টি জেলায় এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মোট ৯৩টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করা হয় এবং ঢাকা ও কয়েকটি জেলায় পাঁচটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে রাজবাড়ীর অ্যাক্রোবেটিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়ায় আবারও অ্যাক্রোবেটিক দলের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। দলের শিল্পীদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তাদের মধ্যে অনেকে বাধ্য হয়ে এই পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। কিন্তু শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক দলটিকে ধরে রাখার জন্য কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। একাডেমির রাজস্ব খাত থেকে অর্থ বরাদ্দ করে তাদের দিয়ে বিভিন্ন জেলায় প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। এছাড়াও শিল্পীদের শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নিয়মিত কর্মশালা এবং প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রশিক্ষণ প্রদান এবং কর্মশালার জন্য তাদের সম্মানী প্রদান করা হয়। ফলে দলটি ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা পায়। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের ব্যবস্থাপনায় আবারও দেশজুড়ে অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। যেখানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি অ্যাক্রোবেটিক দলে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে নতুন ৭ জন শিল্পীকে সম্পৃক্ত করে। ফলে দলের পরিবেশনার নতুন মাত্রা যোগ হয় এবং সারা দেশে আরও জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সারা দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ৭৯টি প্রদর্শনী সম্পন্ন করা হয়। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও চীন সরকারের সহযোগিতায় এবং শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় ২০ জন অ্যাক্রোবেটিক শিল্পী এক বছরের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশে ফিরে প্রদর্শনী করছে এবং আরও ১০ জন শিল্পী এক বছরের প্রশিক্ষণে চীনে অবস্থান করছে। বর্তমানে একটি বড়দের দল এবং একটি ছোটদের দল সারা দেশে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আয়োজনে প্রদর্শনী করে থাকে।


আপনার মন্তব্য