শিরোনাম
রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

অভিভাবকশূন্যতায় ভুগছে নাট্য জগৎ

অভিভাবকশূন্যতায় ভুগছে নাট্য জগৎ

একে একে নাট্য জগৎ থেকে গুণী অভিনয়শিল্পীরা মহাপ্রস্থানে পাড়ি জমাচ্ছেন। ইন্ডাস্ট্র্রিতে সৃষ্টি হচ্ছে শূন্যতা, হয়ে পড়ছে অভিভাবকহীন। এ অপূরণীয় ক্ষতি ইন্ডাস্ট্র্রির জন্য অশনিসংকেত। সময়ের পালাবদলে হারিয়ে ফেলা  সেসব গুণী ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লিখেছেন  - পান্থ আফজাল

এ দেশের টিভি নাটকের রয়েছে সুন্দর সোনালি অতীত। তখনকার নাটক মানেই তুমুল জনপ্রিয়তা। নাটকের জন্য রাজপথে মিছিল পর্যন্ত হয়েছিল। কী সুন্দর সব নামের, গল্পের, সংলাপের ও অভিনয়ের নাটক! সোনালি সময় থেকে নব্বই-পরবর্তী সময়ও অসংখ্য সুন্দর নামের নাটক নির্মিত হয়েছে। বিটিভি চ্যানেলেই দর্শক খুঁজে ফিরেছে তাদের হাসি, কান্নাভরা মুহূর্ত। নাটক ছিল মানসম্মত। একক ও ধারাবাহিক নাটক ছিল অমর সৃষ্টি। এসব নাটকে তখন ছিল তারকার সমাবেশ। কে ছিলেন না! ছিল একটির পর একটি মন ভোলানো নাটক। পঁচাত্তর থেকে পঁচাশি নাটকের স্ক্রিপ্ট ছিল খুবই শক্তিশালী। অভিনয় ছিল মানসম্মত। নাটক তৈরি হতো কম। কিন্তু নাটক হতো মনে রাখার মতো অভিনয়শৈলীসম্পন্ন। একটা ঘণ্টা মনেই হয় না যেন কোনো নাটক দেখছি। মনে হয় যেন নিজের জীবনে নিজেদের পরিবারে এই ঘটনাপ্রবাহ ঘটে চলেছে। চৌদ্দ বা চব্বিশ ইঞ্চি সাদা-কালো অথবা রঙিন টিভির সামনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসে থাকা হতো। নাটক শেষ হলেও মনে তার রেশ রয়ে যেত। মানুষ মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখত নাটক ও তাদের প্রিয় অভিনয়শিল্পীদের। সে সময় নাটকে যারাই অভিনয় করেছিলেন, পেয়েছিলেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। আশির দশকে হুমায়ূন আহমেদের নাটকগুলো নাট্য জগতে এক বিপ্লব আনে। নাটকগুলোর মধ্য দিয়ে প্রচুর দর্শক তৈরি হয়। প্যাকেজ নাটক প্রচার শুরু হওয়ার পর এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেল আসার পরও কিছু কিছু ধারাবাহিক নাটক বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। একটি নাটকের চরিত্র দর্শকদের কাছে কতটা আপন হতে পারে তা ‘আজ রবিবার’ নাটকে আবুল খায়ের অথবা আলী যাকেরের অভিনয় প্রমাণ করে। এ দুই নাট্যজন আজ নেই। চলে গেছেন সব মায়া সাঙ্গ করে। অন্যদিকে আশি-নব্বই দশকে বিটিভির কালজয়ী ধারাবাহিক ‘সংশপ্তক’-এ বড় মালু চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিলেন ধ্রুপদী যোদ্ধা মুজিবুর রহমান দিলু। তিনিও গত বছর মহাপ্রস্থানে পাড়ি জমিয়েছেন। এ মাসের ১১ তারিখে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা-নাট্যকার নাট্যজন ড. ইনামুল হক। অন্যদিকে ‘কোথাও কেউ নেই’র বাকের ভাইয়ের সঙ্গী বদি চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করা আবদুল কাদের-শূন্য এই নাটক ইন্ডাস্ট্রি। আজ নাট্যাঙ্গনে সেই দীপ্ত পদচারণা নেই গোলাম মুস্তাফা, আবদুল্লাহ আল মামুন, সৈয়দ আলী আহসান সিডনী, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, এস এম মহসীন, কে এস ফিরোজ, চ্যালেঞ্জার, সালেহ আহমেদ, মাহমুদা খাতুন, খালেদ খান, মোজাম্মেল হক, রওশন জামিল, নাজমা আনোয়ার, হুমায়ুন ফরীদি, মিনু মমতাজ, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, এ টি এম শামসুজ্জামানের মতো সব্যসাচী গুণী অভিনেতাদের। তাঁরা অভিনয়ে মুগ্ধতা ছড়াতেন।  শোবিজে তাঁদের ক্রেজ ছিল সর্বদা তুঙ্গে। আবার এই সময়ের অনেক অভিনেতা যেমন সেলিম আহমেদ, হুমায়ুন সাধুরাও নেই। একটা সময় নাটকে সদর্পে অভিনয় করেছেন ফেরদৌসী মজুমদার, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আমিরুল হক চৌধুরী, দিলারা জামান, নিমা রহমান, আবুল হায়াত, সারা যাকের, মামুনুর রশীদ, লাকী ইনাম, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডলি জহুর, মাসুম আজিজ, তারিক আনাম খান, আফরোজা বানু, লুৎফুর রহমান লতা, নায়লা আজাদ নূপুর, আফজাল হোসেন, সুবর্ণা মুস্তাফা, শর্মিলী আহমেদ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, মাসুম বাশার, হাসান ইমাম, লায়লা হাসান, গাজী রাকায়েত, চিত্রলেখা গুহ, নরেশ ভূইয়া প্রমুখরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখনো অভিনয় করে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের মূল্যায়ন খুবই কম এই ইন্ডাস্ট্র্রিতে। ইদানীং করোনাভাইরাসে প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছেন শোবিজ অঙ্গনের অনেকেই। অনেকে আবার সুস্থ হয়ে ফিরেছেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে নবীন অভিনয়শিল্পীদের থেকে প্রবীণরাই বেশি বিপৎসীমার মধ্যে রয়েছেন। এদিকে উত্তরসূরিদের পথ ধরে যারা নাটকে এসেছেন, এখনো তাঁদের নিয়ে দর্শকের মাঝে অন্যরকম আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তাদের পরবর্তী সময়ে কালে কালে অনেক অভিনয়শিল্পীই মিডিয়ায় এসেছেন। কাজ করেছেন বা করছেন। কিন্তু এসব প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে আগ্রহ বা তাঁদের পরিচিতি নিয়ে দর্শকদের মাঝে আগ্রহ খুবই কম। এখন তো নাটকের ভিউ বা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য নাটকের যাচ্ছেতাই নাম রাখা হচ্ছে। দর্শক দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। নিম্নমানের গল্প, উদ্ভট ও অশ্লীল সংলাপ, নতুনদের বিরক্তিকর অপেশাদারি অভিনয়, নির্মাতাদের আনাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি ইদানীং যোগ হয়েছে নাটকের উদ্ভট সব নাম! আবার ভিউ ধরতে ব্যবহৃত হচ্ছে অসামঞ্জস্য ইংরেজি নাম, উদ্ভট পোস্টার। সেই অর্থে  নাটকের মানের দিকে কোনো খেয়াল নেই  কারও। তবে অভিভাবকশূন্যতার দরুন যে দুর্দশায় নাটক ইন্ডাস্ট্রি, তা অপূরণীয় ক্ষতি। এভাবে  চললে নাট্য জগৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ   নিয়ে কে ভাববে!

সর্বশেষ খবর