Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ২৩:০৪

এত নিখোঁজ গেল কোথায়

তালিকায় যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন নাম, ১০ মাসে হদিস নেই ২৬২ জনের

মির্জা মেহেদী তমাল

এত নিখোঁজ গেল কোথায়

‘আমি নিবরাসের সঙ্গে যাচ্ছি’ চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডির বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এই ছিল তাওসিফ হোসেনের শেষ কথা। আর নিবরাসও একই দিনে তার উত্তরার বাসা থেকে বেরিয়ে যায় ছোট একটি ব্যাগ নিয়ে। তাদের আরেক বন্ধু শেহজাদ ওরফে অর্ক। সেও একই সময়ে ভাটারার বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে। এরপর থেকেই তারা নিখোঁজ। নিবরাস গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় অংশ নেয় এবং পরে  যৌথবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়। শেহজাদ নিহত হয় ২৬ জুলাই ঢাকার কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে। ওই অভিযানে মোট ৯ জঙ্গি নিহত হয়। নারায়ণগঞ্জে পুলিশের অভিযানে নিউ জেএমবির শীর্ষ নেতা তামিম চৌধুরীর সঙ্গে নিহত হয় তাওসিফ হোসেন।

বাড্ডার সাতারকুল এলাকার মেহেদী হাসান রাজ। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এই রাজ নিখোঁজ হয় গত বছরের ১৬ নভেম্বর। ফোনে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ হিসেবে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। ১৭ নভেম্বর এ বিষয়ে তার বাবা জসিম উদ্দিন বাড্ডা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি এবং পরবর্তীতে ২৩ নভেম্বর একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। অপহূত সেই মেহেদী হাসান রাজ এখনো নিখোঁজ।

নিখোঁজ তালিকায় নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। কারও খোঁজ মিলছে, কারও মিলছে না। নিখোঁজ অনেকেই আবার জঙ্গি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। পুলিশি অভিযানে এদের কারও কারও লাশ পড়ছে। আবার অনেকের কোনো হদিস নেই। অপহরণকারীরাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ সুযোগ নিচ্ছে। পূর্ব শত্রুতার জের ধরে যারা অপহূত হচ্ছে, তাদেরকেই জঙ্গি হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব মতে, গত ১০ মাসে সারা দেশে নিখোঁজ হয়েছে ২৬২ জন। এদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছে বলে তদন্তে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে। বাকি নিখোঁজদের কেউ কেউ আবার ফিরে এসেছে নিজ নিজ পরিবারে। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের বড় একটি অংশের এখনো কোনো খবর মেলেনি। এ অবস্থায় সর্ব মহলেই এখন প্রশ্ন—এত নিখোঁজ গেল কোথায়?

জানা যায়, গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার ঘটনায় সাত জঙ্গি নিহত হওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি সামনে চলে আসে। তাদের পরিবারের কাছ থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জানতে পারে এরা প্রত্যেকেই হঠাৎ নিখোঁজ হয়েছিল। নিহত হওয়ার পর পরিবার জানতে পারে, তাদের সন্তানরা কয়েক মাসের মধ্যেই ভয়ঙ্কর জঙ্গি হয়ে ওঠে। এরপরই পুলিশ ও গোয়েন্দারা নিখোঁজদের জঙ্গি হয়ে ওঠার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। পরবর্তীতে কল্যাণপুর, নারায়ণগঞ্জ, মিরপুরের রূপনগর ও আজিমপুরে নিহত ১৪ জনের মধ্যে ১১ জনই পরিবার থেকে নিখোঁজ ছিল। পুলিশের আইজি এ কে এম শহীদুল হক সম্প্রতি বলেছেন, নিখোঁজদের মধ্যে সন্দেহভাজন রয়েছে ৪০ জন। এরা উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, থানায় জিডির বাইরে আরও অনেকে নিখোঁজ থাকতে পারেন। অনেক পরিবারই জিডি করেনি। প্রেমঘটিত, ব্যবসায়িক, পারিবারিক সংকট, পূর্ব শত্রুতাসহ নানা কারণে মানুষ নিখোঁজ হয়। এরা যে জঙ্গি তত্পরতায় জড়িয়ে পড়েছে—তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। নিখোঁজ এই ব্যক্তিরা গেল কোথায়—এমন প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ঘর পালানো লাপাত্তা বনে যাওয়া সন্দেভাজন তরুণ-যুবকরা জঙ্গি সংগঠনগুলোতে যোগ দিয়েছে। এদের কেউ গেছে সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক আর মালয়েশিয়ায়। এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিভিন্ন দেশের নাগরিকের সরাসরি ইরাক বা সিরিয়ায় গিয়ে আইএস’র হয়ে লড়াই করার তথ্য গোয়েন্দারা পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। আবার কেউ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে ঝিনাইদহ আর গাইবান্ধায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলেও গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে। গোয়েন্দাদের কাছে খবর রয়েছে, দেশের একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনারের ছেলেসহ তিন তরুণ সিরিয়া যাওয়ার উদ্দেশে এখন তুরস্কে।

তবে অপহরণের শিকার কাউকে কাউকে জঙ্গি হিসেবে প্রচার চালানোর অভিযোগও রয়েছে। বাড্ডার সাতারকুল এলাকার জসিমউদ্দিনের একমাত্র সন্তান মেহেদী হাসান রাজ অপহরণ মামলার আসামিকে পুলিশ গ্রেফতার করে। মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণ মামলার আসামি উল্টো সেই অপহূত মেহেদী হাসানকেই জঙ্গি বলে প্রচার চালানোর সুযোগ নিচ্ছে। অপহূত মেহেদী হাসানের পারিবারিক সূত্র জানায়, মেহেদী হাসান রাজ নিখোঁজ হওয়ার আগে তাকে অপহরণ করা হবে বলে যারা হুমকি দিয়েছিল তারাই তাকে অপহরণ করেছে। সিআইডি এই মামলাটি তদন্ত করছে। কিন্তু ২০১৪ সালে মেহেদী হাসান নামে অপর এক যুবক সিরিয়া গিয়ে যুদ্ধে নিহত হয়েছে বলে যে খবর বেরিয়েছে, সেই মেহেদী হাসানকে আমাদের মেহেদী হাসান বলে মিথ্যা প্রচারণা চালাচ্ছে আসামিরা। তারা অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে এমন সুযোগ নিচ্ছে বলে জানান পরিবারের সদস্যরা। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের কর্মকাণ্ড নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা ঢাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে আইএসের কোনো কর্মকাণ্ড না থাকলেও বিদেশে গিয়ে বাংলাদেশিরা এই জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দিচ্ছে। এমনকি আইএসের যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাম জড়িয়ে মৃত্যুবরণ করেছে সাতজন। আইএসের অনলাইন ম্যাগাজিন ‘দাবিক’-এর সর্বশেষ সংস্করণের এক নিবন্ধে এক বাংলাদেশির যুদ্ধে নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। বাংলাদেশি এ তরুণের ছবি প্রকাশিত হয়েছে, তবে প্রকাশ হয়নি প্রকৃত নাম। নাম বলা হয়েছে আবু জান্দাল আল-বাঙালি। গোয়েন্দারা মনে করছেন, ঢাকা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে আবু জান্দাল রাখা হয়েছে এবং যেহেতু বাংলাদেশি তাই নামের শেষে আল-বাঙালি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এরপরই আরেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে আইএস। ওই বাংলাদেশির নাম আবু দোজানা আল-বাঙালি। তবে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নথি বলছে, তার প্রকৃত নাম মেহেদী হাসান। সিরিয়া যাওয়ার পর নামকরণ হয়েছে আবু দোজানা আল-বাঙালি। মেহেদী হাসান ছাড়াও মারা যান মামুনুর রশিদ, হামিদুর রহমান, মাসুদুর চৌধুরী ও আসাদুজ্জামান। এরা দেশ ছাড়ে ২০১৪ সালের দিকে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজদের অনেকেই উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত নিখোঁজ আশরাফ রাজধানীর মিরপুর ডিওএইচএসে বসবাসরত সাবেক এক ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তার মেধাবী সন্তান। বাসা থেকে যাওয়ার আগে বাবার উদ্দেশে চিরকুটে লিখে গেছে, ‘আমি নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যাচ্ছি।’ ঢাকার ইব্রাহিম হাসান খান ফেসবুকে ২০১৫ সালের ১৩ জুলাই কোরআনের আয়াত দিয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। একই সঙ্গে খোঁজ নেই তার ভাই জুনায়েদ হোসেন খানের। চার দিন আগে আইএসের পতাকা ও অস্ত্র নিয়ে একটি ছবি পোস্ট করেছিল তাদের ফেসবুকে। তবে কয়েক ঘণ্টা পর তা আবার উঠিয়ে নেওয়া হয়। গোয়েন্দারা নিশ্চিত এরা আইএসে যোগ দিয়েছে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর