শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ২২:৫৭

পথ মসৃণ ছিল না, বাংলাদেশ এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত : প্রধানমন্ত্রী

সাফল্য দেখে কোরিয়াকে মনে পড়ছে : বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক

পথ মসৃণ ছিল না, বাংলাদেশ এখন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত : প্রধানমন্ত্রী
ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের অনুষ্ঠানে গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম —বাসস

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থার কাছ থেকে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের উদ্ভাবনী উদ্যোগের প্রশংসা দেশ থেকে গরিবি হটানোর চেষ্টাকে আরও এগিয়ে নেবে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের সাফল্যে বিশ্বব্যাংকের স্বীকৃতি বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনকে আরও বেগবান করবে। বিশ্বব্যাংককে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা আমাদের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিদ্যমান অংশীদারিত্ব ভবিষ্যতে  আরও শক্তিশালী হবে। বিশ্বব্যাংক আমাদের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের এ প্রয়াসে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে প্রত্যাশা করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘রূপকল্প ২০২১’ ও ‘রূপকল্প ২০৪১’ জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা এবং বঞ্চনামুক্ত ‘সোনার বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত।’ গতকাল বিকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। অর্থ মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ও বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে এর আয়োজন করে। একই স্থানে সন্ধ্যায় দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের প্যানেল ডিসকাশন পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার, অ্যাকশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবীর, মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হক অংশ নেন। এ সময় দর্শক সারিতে উপবিষ্ট বিশ্বব্যাংক-প্রধান বলেন, ‘বাংলাদেশ খুব দ্রুত উন্নয়নের পথে হাঁটছে। বাংলাদেশে এসে এ দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দেখে আমার দক্ষিণ কোরিয়ার কথা মনে পড়ছে। আশা করা যায় বাংলাদেশ খুব দ্রুতই তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে।’ মূল অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্ব পরিমণ্ডলে তুলে ধরার জন্য বিশ্বব্যাংককে ধন্যবাদ জানাই। তাদের এ স্বীকৃতি আমাদের লক্ষ্য অর্জনকে আরও সহজ করবে। আমরা টেকসই উন্নয়নের দিকে যাচ্ছি। পথচলা কখনই মসৃণ ছিল না। তবে আমরা প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি, যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।’ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার, সংস্থাটির এশীয় অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ প্রধান চিমিয়াও ফান। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা সবরকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অসামান্য সাফল্য অর্জন করেছি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশ আজ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। আমি আশা করি, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা দরিদ্র্যের হার নামিয়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশে নিয়ে আসব।’ এ সময় শেখ হাসিনা গত ৪৫ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনগুলো তুলে ধরেন এবং বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণের অঙ্গীকার ভুলে যাবে না। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের একটি দেশে পরিণত হবে। রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়।

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেন, মাত্র এক বছরের মধ্যে পৃথিবীতে ১০ কোটি মানুষকে অতিদারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে ‘চমৎকার’ হিসেবে বর্ণনা করে কিম বলেন, এ অভিজ্ঞতা অন্য দেশের মধ্যেও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য উদ্ভাবনী ধারণা প্রবর্তন যে খুবই জরুরি, তা বাংলাদেশ খুব দ্রুতই অনুধাবন করতে পেরেছে। তার মতে, জনগণের পেছনে বিনিয়োগ করা ঠিক ততটাই জরুরি যতটা প্রয়োজন অবকাঠামো খাতের বিনিয়োগ। কিম তার বক্তব্যে নারীর ক্ষমতায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ ও শ্রমের পরিবেশ উন্নত করার পরামর্শ দেন তিনি। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার। আরও বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের সাউথ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সন। এতে সংগীত পরিবেশন করেন সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন অনুষ্ঠান শেষে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়বে : এর আগে সকালে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক করেন বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কিম বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে তাদের ঋণসহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়াবে। এ ছাড়া শিশুর অপুষ্টি দূর করতে চলমান প্রকল্পে আরও প্রায় ১০০ কোটি ডলার দেবে।

পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের ঋণচুক্তি বাতিল হওয়া সত্ত্বেও সেতুর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে— এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কিম বলেন, ‘আমরা সেটা সাধুবাদ জানাই। এত বড় একটা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সেটা তো অবশ্যই বড় কাজ।’ তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়নের সঙ্গেই আছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।

এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে যে জটিলতা ছিল, তা কেটে গেছে। তাদের (বিশ্বব্যাংক) কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। আশা করছি তারা সে প্রত্যাশা পূরণ করবে।’ এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বাংলাদেশের যোগাযোগসহ সব খাতেই সংস্থাটি সহায়তা দেয়। পদ্মা সেতুতে যে তহবিল বিশ্বব্যাংকের দেওয়ার কথা ছিল, তারা অন্যান্য প্রকল্পে তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু অর্থ দিয়েছেও। এর মাধ্যমে বিষয়টির সমন্বয় হয়েছে।’ বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ ও ইআরডির সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।

আজ বরিশাল যাচ্ছেন কিম : নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল জানান, বরিশালের বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউনিয়নের দক্ষিণ রাকুদিয়া গ্রামের বকুল আক্তার চরম দারিদ্র্যে নিমজ্জিত ছিলেন। দিনমজুর স্বামীর আয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকাই তার দায় ছিল। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াও করাতে পারতেন না। চার বছর আগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এসডিএফ) থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাভী কেনেন। গাভীর আয় থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরবর্তীতে মাছ এবং সবজি চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। মাত্র চার বছরেই স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন তিনি। তার মতো ওই গ্রামের শিউলী বেগম, কহিনুর বেগম, নাসিমা বেগম, ফিরোজা বেগম, মমতাজ বেগম, সোনিয়া বেগম ও শান্তা বেগমসহ অর্ধ শতাধিক নারী এভাবে এসডিএফ থেকে ঋণ নিয়ে এখন দারিদ্র্যের কশাঘাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এখন তারা গরু পালন এবং পোলট্রি, মাছ ও সবজি চাষ করে ভাগ্যোন্নয়নের মাধ্যমে দিনবদলের স্বপ্ন দেখছেন। এসডিএফ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এজিএম শাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, চার বছর আগে ইস্পাওয়ারমেন্ট অ্যান্ড লাইভলি হুড ইমপ্রুভমেন্ট ‘নতুন জীবন’ প্রকল্পটি গ্রহণের আগে এই গ্রামের অর্ধেকের বেশি পরিবার ছিল দারিদ্র্যসীমার নিচে। কিন্তু নতুন জীবন প্রকল্পের করা নারীরা সবাই এখন স্বাবলম্বী। এসডিএফের চেয়ারম্যান এম আই চৌধুরী জানিয়েছেন, আগামীকাল (আজ) মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট ইয়ং কিম বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে পৌঁছবেন। সেখানে বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট ‘দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি’-সহ বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করবেন তিনি। কথা বলবেন সুবিধাভোগীদের সঙ্গে।

পরে তিনি উজিরপুর উপজেলার ভরসাকাঠী যাবেন সাইক্লোন সেল্টার পরিদর্শনে। দারিদ্র্য বিমোচনে বরিশালের সাফল্য দেখে দেখে তিনি খুশি হবেন বলে আশা তার। এই প্রকল্পের ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাংক আগামীতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংকের সাহায্যপুষ্ট এসডিএফ কাজ শুরু করে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার রাকুদিয়া গ্রামে। টেকসই সংগঠন তৈরির মাধ্যমে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়ন অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে এই প্রতিষ্ঠানটি। পশু পালন, মৎস্য চাষসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে এই প্রতিষ্ঠান। এরপর প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা সংগঠন তৈরি ও ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়নে কাজ করেন। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বরিশালের ছয় উপজেলায় নারীদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করছে এসডিএফ।

বরিশালের পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান বলেন, বরিশালে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টকে ভিভিআইপি মর্যদার নিরাপত্তা দেওয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুলিশের পাশাপাশি, র‌্যাব, এসএসএফ, এনএসআই-সহ পোশাকধারী এবং সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আড়াইশ সদস্য বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে।


আপনার মন্তব্য