Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ মার্চ, ২০১৭ ২২:৪৪

শুধুই সম্ভাবনার হাতছানি

ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পে নজিরবিহীন বিপ্লব, মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, বিশাল সম্ভাবনার খাত আউটসোর্সিং, স্বপ্নের দুয়ার খুলে দিয়েছে ওষুধশিল্প

সাঈদুর রহমান রিমন

শুধুই সম্ভাবনার হাতছানি

একসময়ের অচেনা বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিস্ময়। দেশে একে একে উন্মোচিত হচ্ছে সম্ভাবনার দ্বার। চার লেন মহাসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, পরিকল্পিত বহুমুখী বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলাসহ উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে দেশজুড়ে। পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরুর পর থেকেই একের পর এক মেগা প্রকল্প নিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে দেশ। এবার বাম্পার ফলন হয়েছে বোরোতে। মাথাপিছু জাতীয় আয় বাড়ছে। চাষাবাদের জমি দিন দিন কমলেও ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানির মতো বাড়তি ফসল উৎপাদন করছে এ দেশের কৃষক। সামাজিক উন্নয়নে ভারতকেও পেছনে ফেলে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। বিদ্যুৎ উৎপাদনে যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। উন্নতি হয়েছে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর। রপ্তানি ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি অপ্রচলিত পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে দেদার। চা, চামড়া, সিরামিক থেকে শুরু করে মাছ, শুঁটকি, সবজি, পেয়ারা, চাল, টুপি, নকশিকাঁথা, বাঁশ-বেত শিল্পের তৈরি পণ্য, মৃৎ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে বিভিন্ন দেশে। কয়েক বছর ধরে দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পও বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে। খুলনার শিপইয়ার্ডে এরই মধ্যে নির্মাণ হয়েছে যুদ্ধজাহাজ।

চারদিকে সুখবরের ছড়াছড়ি। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, খুলনাসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাগরের বুক চিরে জেগে উঠছে নতুন নতুন ভূখণ্ড। এর পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। ১৪৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সন্দ্বীপের তিন পাশেই গড়ে ওঠা নতুন ভূমির পরিমাণ মূল সন্দ্বীপের প্রায় দ্বিগুণ! আবার নিঝুম দ্বীপ ছাড়াও চরকবিরা, চরআলীম, সাগরিয়া, উচখালী, নিউ ডালচর, কেরিং চরের আশপাশে আরও প্রায় ৫ হাজার একরের জেগে ওঠা নতুন ভূমি স্থায়িত্ব পেতে চলেছে। নতুন এ ভূমি খুলে দিচ্ছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। অন্যদিকে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে বিশাল সমুদ্রসীমা লাভ করেছে বাংলাদেশ। এসব নিয়ে মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে নতুন এক বাংলাদেশ।

গড়ে উঠছে বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল : সমুদ্র উপকূলীয় ফেনীর সোনাগাজী ও চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে গড়ে উঠছে সম্ভাবনার বাংলাদেশ। সেখানে শুরু হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার একর আয়তনবিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল পূর্ণাঙ্গ রূপ নিলে কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হবে ১০ লাখেরও বেশি মানুষের। মিরসরাইয়ের অংশে ২ হাজার ১০০ ও সোনাগাজীর অংশে ৮ হাজার একর ভূমির ওপর শিল্পাঞ্চল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলেছে। ভূমি উন্নয়ন, সীমানাপ্রাচীর, সংযোগ সড়ক, পানি ও বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনসহ বেড়িবাঁধের কাজ শেষ হলেই ডিসেম্বরে আহ্বান করা হবে শিল্প প্লট বরাদ্দের আবেদন।

ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পে নজিরবিহীন বিপ্লব : সারা দেশেই আড়ালে-আবডালে ঘটে চলেছে এক অভাবনীয় বিপ্লব। দেশীয় প্রযুক্তির ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ উদ্ভাবন, উৎপাদন ও বাজারজাতে বদলে গেছে দৃশ্যপট। এই কদিন আগেও যেসব যন্ত্রপাতি শতভাগ আমদানিনির্ভর ছিল, আজ তা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। বাংলাদেশে প্রস্তুত মেশিনারিজ এখন চীন-ভারতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঠাঁই করে নিচ্ছে বিশ্ববাজারে। ব্যক্তিপর্যায়ের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের নিজ প্রচেষ্টায় অভাবনীয় এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্পে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত জিনজিরা। এখানকার ঝুপড়ি বস্তির অজস্র কারখানায় খুদে ‘ইঞ্জিনিয়ার’দের তৈরি হাজারো পণ্যসামগ্রীর কদর রয়েছে সর্বত্র। দেশ-বিদেশে ‘মেড ইন জিনজিরা’ হিসেবে এর ব্যাপক পরিচিতিও আছে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীর তীরঘেঁষা শুভাঢ্যা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে জিনজিরা শিল্পের অভাবনীয় বিস্তার। এখানে গড়ে উঠেছে ২ হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও হালকা শিল্প কারখানা। ১২ লাখ শ্রমিকের উদয়াস্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠছে সম্ভাবনার আরেক বাংলাদেশ। জিনজিরাকেন্দ্রিক খুদে কারখানাগুলো থেকে বছরে অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। উৎপাদিত অনেক পণ্যই দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশে। জিনজিরাকে অনুসরণ করে দেশজুড়ে গড়ে উঠেছে এমন ৪০ হাজারেরও বেশি শিল্প কারখানা।

ধোলাই খাল ব্র্যান্ড : ইঞ্জিন-যন্ত্রাংশ, গাড়ির ক্ষুদ্র পার্টসসহ ২০০ ধরনের মেশিনারিজ উৎপাদন ও বাজারজাতের বিরাট সম্ভাবনার খাত হয়ে উঠেছে ‘ধোলাই খাল ব্র্যান্ড’। ৫ লক্ষাধিক লোকের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এ শিল্প থেকে। ধোলাই খাল ব্র্যান্ডের কারিগররা বাইসাইকেল থেকে শুরু করে সব ধরনের গাড়ি, ট্রাক্টর, ক্রেন, রি-রোলিং মিল, এমনকি ট্রেনের বগিসহ যাবতীয় যন্ত্রাংশ অনায়াসে প্রস্তুত করছেন। পুরান ঢাকার মৈশুন্ডি, নবাবপুর, টিপু সুলতান রোড, বনগ্রাম, ওয়ারী ও পাশের এলাকায় এ শিল্পের বিস্তৃতি ঘটেছে। ধোলাই খাল ও আশপাশ এলাকায় রয়েছে ছোট-বড় অর্ধ লক্ষাধিক ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ বা হালকা প্রকৌশল শিল্পের নানা স্থাপনা।

কৃষিতে নীরব বিপ্লব : বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা উৎপাদনে ক্রমেই এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। ফসলের নতুন নতুন জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের সফলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা ১৩টি প্রতিকূলতাসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে।

মাছ রপ্তানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ : মিঠাপানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বাংলাদেশ। এখানকার আড়াই লাখ হেক্টর উন্মুক্ত জলাশয় আর গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মাছ চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। এখন বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদনে চতুর্থ। তবে সরকার এদিকে মনোযোগ দিলে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে। এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ধারাবাহিকভাবে এক যুগ ধরেই বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বাড়ে। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মাছ রপ্তানিও বেড়েছে ১৩৫ গুণ। বাংলাদেশের মৎসবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত মাছের জাত এবং তা দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে মাছের উৎপাদন এতটা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লা জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোয় ঘেরে মাছ চাষ রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বিশাল সম্ভাবনার খাত আউটসোর্সিং : ইন্টারনেটভিত্তিক অনলাইন আউটসোর্সিং বিশ্বব্যাপী শিক্ষিত তরুণ সমাজের কাছে জনপ্রিয় পেশা। বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এ খাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে ৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি আউটসোর্সিংয়ের সঙ্গে জড়িত। এ খাতে আয় হচ্ছে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। আউটসোর্সিং সাইট বা অনলাইন মার্কেট প্লেসে কাজের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও তথ্যব্যবস্থা (ইনফরমেশন সিস্টেম), লেখা ও অনুবাদ, ডাটা প্রসেসিং, ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া, গ্রাহকসেবা (কাস্টমার সার্ভিস), বিক্রয় ও বিপণন, ব্যবসা সেবা ইত্যাদি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশের আয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ৭ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ডলার হয়েছে। আয় বাড়ার এ হার ২৮ শতাংশের ওপরে। আউটসোর্সিংয়ের পাশাপাশি অন্যান্য কম্পিউটার সেবা থেকেও আয় বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মে মাস পর্যন্ত কম্পিউটার সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশ ১৩ কোটি ৬৪ লাখ ডলার আয় করেছে। আউটসোর্সিং, পরামর্শ সেবা ও কম্পিউটার সফটওয়্যার রপ্তানি— ওই আয় হয়েছে এ তিন খাত থেকে।

স্বপ্নের দুয়ার খুলেছে ওষুধশিল্প : ওষুধশিল্প সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের স্বপ্নের স্বর্ণদুয়ার খুলে দিয়েছে। ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতে বেসরকারি উদ্যোক্তারা রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছেন। দেশে উৎপাদিত ওষুধ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিশ্বের ১৩৩টি দেশে। দেশীয় ৪৬ কোম্পানির প্রায় ৩০০ ধরনের ওষুধ যাচ্ছে বিদেশে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৯টি ছোট-বড় ওষুধ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪টি কারখানা সচল রয়েছে। এসব কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রায় ৫ হাজার ব্র্যান্ডের ৮ হাজারের বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে বড় ১০টি কোম্পানি দেশের মোট চাহিদার ৮০ শতাংশ মিটিয়ে থাকে।


আপনার মন্তব্য