শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১২ জুন, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১১ জুন, ২০১৭ ২২:৪০

হয়রানিতে ১৫ লাখ নগরবাসী

হতাশা ক্ষোভ, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আর্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাড্ডা, ভাটারা, জোয়ার সাহারা মৌজার প্রায় ১৫ লাখ নগরবাসী তাদের জমিজমা এবং বসতবাড়ির খাজনা ও নামজারির সমস্যা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। তাদের সমস্যার কখন সমাধান হবে সেটা এখনো কেউ জানে না। একাধিক প্রেসিডেন্ট অর্ডার, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা, মন্ত্রিপরিষদের জারিকৃত আদেশ কোনো পদক্ষেপই তাদের মৌলিক অধিকার বহাল করতে পারেনি। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তারা আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচ থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারছেন না। তাই নগরীর এ লাখ লাখ মানুষ তাদের বসতবাড়ি ঘিরে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জীবনের শেষ আর্তি জানিয়েছেন। আগামী ১৪ জুন অবমুক্তকৃত ১৩৮৫ একর জমির খাজনা  গ্রহণ এবং নামজারি অব্যাহত রাখা সংক্রান্ত একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছেন ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ। সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও ভূমি সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার যোগ দেবেন। তাই উক্ত সভায় সমস্যাটি সমাধানের জন্য ১৫ লাখ ভুক্তভোগী নগরবাসী মন্ত্রীদের আন্তরিক ভূমিকার প্রত্যাশা করছেন। তারা দৃঢ়চিত্তে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন। বাড্ডা, ভাটারা, জোয়ার সাহারার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী দুজন আমলার স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বাঁচতে চায়।

জোয়ার সাহারার ৮০ বছর বয়েসী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা নুরুল আলম বলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ভূমিমন্ত্রী ও সচিবের প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি, আপনারা যেভাবে হোক এলাকাবাসীর মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু কেড়ে নেবেন না। গুটিকয়েক আমলার কুদৃষ্টি থেকে নিরীহ মানুষদের রক্ষা করেন। জীবনের শেষ সম্বল বাপদাদার ভিটার খাজনা এবং নামজারি সমস্যার সমাধান করে দিন। প্রয়োজনে এর জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। যার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসস্থান সুরক্ষা করতে পারি।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিষয়টি সমাধানে অধিকাংশ কর্মকর্তা আন্তরিক। দীর্ঘ দিনের এ সমস্যাটি নিরসনের জন্য তারা চেষ্টাও করে যাচ্ছেন। এ জন্য তারা একাধিক আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছেন। কিন্তু ঢাকা জেলা প্রশাসন ও রাজউকের অসহযোগিতার কারণে নগরীর ১৫ লাখ মানুষ প্রশাসনিক জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছেন। বর্তমানে তারা এর মূল বাধা হয়ে আছেন। প্রত্যাশিত সংস্থা হিসেবে রাজউক খুব একটা টুঁ শব্দ না করলেও ঢাকা জেলা প্রশাসন সমস্যাটি জিইয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে আছে। ২০১৩ সাল পর্যন্ত তারা খাজনা গ্রহণ এবং নামজারি অব্যাহত রাখলেও বর্তমানে এর বিরোধিতা করছে। এটা তাদের পরস্পর বিরোধী কার্যকলাপ।

অভিযোগ ওঠেছে, রাজউক চেয়ারম্যান এবং ঢাকা জেলা প্রশাসন যোগসাজশ করে সমস্যাটিকে জটিল করে তুলছেন। তারা জোয়ার সাহারা, বাড্ডা ও ভাটারা মৌজার অবমুক্তকৃত জমিজমা ও বাড়িঘর সম্পর্কে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করছেন। এমন কি আন্তমন্ত্রণালয়ের সভাগুলোতে ভুল তথ্য উপস্থাপন করে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করছেন। যার কারণে সমস্যাটি দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গতমাসের ২১ তারিখের মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং রাজউককে ১৩৮ নম্বর এলএ কেসের অন্তর্ভুক্ত জমির মূলনথিপত্র এবং সে জমির ওপর হাজার হাজার বাড়িঘরের নকশা অনুমোদনের সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন জমি হুকুম দখলের কিছু নথি জমা দিলেও সেখানে জমি অধিগ্রহণের কোনো প্রমাণপত্র নেই। অপর দিকে রাজউক থেকে এ সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়নি। ১৯৯০ সালের ৯ এপ্রিল রাজউক এবং কেবিনেট মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা অনুমোদিত এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ কর্তৃক অবমুক্তকৃত ১৩৯৫ একর জমির ডিটেইর ম্যাপ এবং দাগসূচি থাকলেও সেটা রাজউক থেকে রহস্যজনক কারণে ভূমি মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হচ্ছে না।

রাজউকের একটি সূত্র জানায়, রামপুরা ব্রিজ থেকে বিমানবন্দরের নিকুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে হাজার হাজার বাড়িঘর নির্মিত হয়েছে। যার মধ্যে ১৫-২০তলা ভবনও রয়েছে। এশিয়ার অন্যতম সর্ববৃহৎ বিপণিবিতান যমুনা ফিউচার পার্কও এর মধ্যে রয়েছে। প্রতিটি ভবন এবং স্থাপনা নির্মাণের আগে রাজউক থেকে বৈধ নকশা নেওয়া হয়েছে। রাজউক এসব জমির মালিক হলে অন্যদেরকে বাড়ি করার নকশা অনুমোদন করলেন কীভাবে? মূলত এমন প্রশ্নবাণ থেকে বাঁচার জন্যই রাজউক ভূমি মন্ত্রণালয়ে নথিপত্র জমা দেয়নি। তাই আগামী ১৪ জুন অনুষ্ঠিতব্য সভায় তাদেরকে এ ব্যাপারে কৈফিয়ত তলব করা দরকার।

ঢাকা জেলা প্রশাসন ও রাজউক ভবন ঘুরে একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এটা সরকারি দুটি সংস্থার কোনো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। বর্তমানে বিষয়টি ঢাকার ডিসি এবং রাজউকের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তারা জোর করে সাধারণ মানুষের বাড়িঘর জমিজমাকে সরকারি জমি হিসেবে দাবি করছেন। অথচ উক্ত জমির রেকর্ডপত্র, দলিল-দস্তাবেজ কিংবা দখলাদি কোনোকিছুই তাদের নেই।

তাদের এ ভূমিকার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়বে সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন বলে জানা গেছে। জোয়ার সাহারা, বাড্ডা ও ভাটারা মৌজার লাখ লাখ মানুষের জমিজমা ও বাড়িঘর সংক্রান্ত দুর্দশার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিষয়টি সমাধানের জন্য গত মাসের ১৫ তারিখে ভূমি মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। অথচ বিষয়টি টিকিয়ে রেখে রাজউক এবং জেলা প্রশাসন ১৫ লাখ মানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনা আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য রেকর্ডপত্র, দলিল কিংবা দখলাদি প্রয়োজন। অপর দিকে একটি রেকর্ড গেজেটভুক্ত হলে আগের রেকর্ডটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। উক্ত আইনেই ১৩৮ নম্বর এলএ কেস থেকে অবমুক্তকৃত জমির মালিকরা ২০১৩ সাল পর্যন্ত খাজনা প্রদান এবং নামজারি সম্পন্ন করেছেন। এরপর তারা রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন।


আপনার মন্তব্য