Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৫ মে, ২০১৯ ২৩:২২

সর্বনাশ ৫৭ খাতের সমন্বয়হীনতায়

ঢাকাকে নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা, উন্নয়ন নিয়ে দূরত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের

জয়শ্রী ভাদুড়ী

সর্বনাশ ৫৭ খাতের সমন্বয়হীনতায়

রাজধানী ঢাকার সর্বনাশ হচ্ছে ৫৭ সেবা খাতের সমন্বয়হীনতায়। এক প্রতিষ্ঠান রাস্তা নির্মাণের এক মাসের মধ্যেই আবার অন্য প্রতিষ্ঠান তা খুঁড়ছে। সেবাপ্রতিষ্ঠানের নিজেদেরে মধ্যে সমন্বয় না থাকায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। পাশাপাশি বাড়ছে অর্থ অপচয়। দায়িত্ব না নিয়ে একে অন্যকে দোষাদোষীতে ব্যস্ত দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

নগরজীবনের সার্বিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে ৫৭ সেবাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে। রাজধানীর রাস্তা, ড্রেন, খাল, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, গণপরিবহন, ট্রাফিকসহ প্রতিটি সেবায় দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে। খালগুলোর কিছু দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা জেলা প্রশাসন আর বাকিগুলোর দায়িত্বে ওয়াসা। শুষ্ক মৌসুমে খাল খননের কাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকলেও বর্ষা মৌসুমে আলোচনায় তুঙ্গে থাকে খাল খনন। রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার কিছু অংশের দায়িত্বে রয়েছে সিটি করপোরেশন আর কিছু অংশের ওয়াসা। এই ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কার নিয়েও রয়েছে টানাপোড়েন। রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণ করে বিভিন্ন সংস্থ। নির্মাণ শেষে ফ্লাইওভার চালু হলেও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় না কেউ। সিটি করপোরেশন শহরের রাস্তা ঝাড়ু দেয়, কিন্তু ফ্লাইওভার তাদের তত্ত্বাবধানে না থাকায় সেগুলো পরিষ্কার করে না। গত বছর বৃষ্টির মৌসুমে মহাখালী ফ্লাইওভারের জলজট তার প্রমাণ। সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় সমন্বয়হীনতার নানা চিত্র। মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের অধিকাংশ সড়কবাতিই নষ্ট। রাতের বেলা অন্ধকারে ঝুঁকি নিয়ে চলছে যানবাহন। দীর্ঘদিন ধরে এ অচলাবস্থা চললেও নজর নেই কারও। ২০১৭ সালের ২৬ অক্টোবর উদ্বোধনের পর থেকে মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের দায়িত্ব হস্তান্তর নিয়ে চলছিল টানাপোড়েন। ফ্লাইওভারের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউ। ফ্লাইওভারগুলোর নিচের অংশ দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে ভাতের হোটেল, গাড়ির গ্যারেজ, মাদকসেবীর আড্ডাস্থল। বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে গড়ে তোলা এসব প্রকল্প সেবা সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে দখল হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে আগ্রহ থাকলেও সম্পন্ন হওয়া প্রকল্প রক্ষণাবেক্ষণে আগ্রহ নেই কারও। ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলামোটর থেকে শাহবাগ পর্যন্ত ভিআইপি সড়কে মাটির নিচে বিদ্যুতের লাইন বসায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। ২০১৮ সালে লাইনটি বসানো হয় ভিআইপি সড়কের ঠিক বিভাজক বরাবর। সড়কটিতে মেট্রোরেলের কাজ শুরু হওয়ায় বছর না পেরোতেই লাইনটি তুলে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল-ঘেঁষা ফুটপাথে বসাতে হয়েছে। একই অবস্থা বিমানবন্দর থেকে উত্তরা অংশে। গত বছরের শেষের দিকে বিমানবন্দর ফুটওভার ব্রিজ থেকে উত্তরা জসীমউদ্দীন মোড় পর্যন্ত সড়কবাতি লাগায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হওয়ায় রাস্তার মাঝবরাবর থাকা ল্যাম্পপোস্টগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। উঁচু টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখায় আলো পৌঁছায় না দুই পাশে। আট মাস আগে উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের দক্ষিণ কোনার মসজিদ থেকে রাজলক্ষী পর্যন্ত কয়েক শ গাছ কাটা হয়েছে উন্নয়নকাজের নামে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো কাজ শুরু হয়নি কিংবা কোনো সংস্থার নামফলকও নেই। কেন গাছ কাটা হলো- এর সদুত্তরও দিতে পারেনি কোনো সেবা সংস্থা। শ্যাওড়াপাড়ায় কিছুদিন আগে রাস্তা ও ফুটপাথ নির্মাণ করেছে সিটি করপোরেশন। মাস দুয়েক পার না হতেই সেই রাস্তা খুঁড়ে সুয়ারেজের লাইন বসাচ্ছে ওয়াসা। এ কাজ শেষ হতেই শুরু হবে বৃষ্টির মৌসুম। তখন এ এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় জলকাদায় ভোগান্তি পোহাতে হবে এলাকাবাসীকে। মুদি দোকানদার সোহেল রানা বলেন, ‘আগে সুয়ারেজের লাইন বসানোর পর যদি রাস্তা নির্মাণ করত তাহলে নতুন রাস্তা কাটতে হতো না। বৃষ্টির সময় এখানে হাঁটুপানি জমে। রাস্তা তৈরির পর ভেবেছিলাম ভোগান্তি কমবে। কিন্তু এখন ভোগান্তি আরও বাড়ল।’ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনসূত্রে জানা যায়, রাজধানীর যানজট নিরসনে সাতরাস্তা থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্নের প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। এ ইউটার্নগুলো নির্মাণ করতে ৩৭ দশমিক শূন্য ৯ বিঘা জমির প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথের ৩১ দশমিক ২৫ বিঘা, রেলওয়ের ১ দশমিক ৬১ বিঘা ও সিভিল অ্যাভিয়েশনের ১ দশমিক ৮৩ বিঘা জমি রয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সংস্থাগুলোর কাছে জমি ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হলে তাদের কাছ থেকে এক ধরনের নীতিগত অনুমোদনও মেলে। কিন্তু গত ৪ নভেম্বর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম কনস্ট্রাকশন্স এগুলো নির্মাণের কাজ শুরু করলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাধায় তা আটকে যায়। জমির মূল্য দাবি করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এতে বন্ধ হয়ে যায় প্রকল্পকাজ। পরে মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে এর মীমাংসা হলেও এখনো শুরু হয়নি প্রকল্পের কাজ। এখন বলা হচ্ছে, এ প্রকল্পে যানজট কতটা নিরসন হবে তা পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। অথচ এই সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করেই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। তিনটি ইউটার্নের নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকা অবস্থায় প্রকল্পকাজ বন্ধ করা হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর-১০, ফার্মগেট, গুলিস্তানে অবৈধ স্থাপনা ও হকারদের উচ্ছেদ করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই আবার একই জায়গায় বসে যায় হকাররা। পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলে জানায় সিটি করপোরেশন। ফার্মগেটে তেজগাঁও অংশে ফুটপাথ নির্মাণের খোঁড়াখুঁড়িতে কাটা পড়েছে বিটিসিএলের তার। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ওই এলাকার শতাধিক মানুষ। কিছুদিন আগেও রাস্তা সংস্কারের সময় এ তার কাটা পড়েছিল। এ এলাকার বাসিন্দা ইমতিয়াজ আলী বলেন, ‘এক রাস্তায় এতবার খোঁড়াখুঁড়ি করলে লাইন তো কাটবেই। একবার লাইন কেটে যাওয়ার পর অনেক দৌড়ঝাঁপ করে ঠিক করা হয়েছিল। সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে আমাদের এ ভোগান্তি পোহাতে হতো না।’


আপনার মন্তব্য