Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৯ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ মে, ২০১৯ ২২:৫৪

পর্যবেক্ষণ

কৃষকের ধান পুড়ে হরিলুট রূপপুরে ধর্ষক উল্লাস করে

পীর হাবিবুর রহমান

কৃষকের ধান পুড়ে হরিলুট রূপপুরে ধর্ষক উল্লাস করে

কৃষকের ফসল পুড়ে। বুকজুড়ে কান্না তার। ফসলের ন্যায্য মূল্য মেলে না। রূপপুরে হরিলুট চলে জনগণের টাকায়। একটি বালিশের মূল্য ও তা উঠানোর খরচ দেখে অবাক বিস্ময়ে আবার তাকিয়ে দেখে বাংলাদেশ! লুটেরাদের, দুর্নীতিবাজদের আগ্রাসন কত গভীরে। তার মানে সারা দেশে সবখানে কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্পে ভুয়া বিল করে লুটে নিয়ে যাচ্ছে লুটেরারা।

আমাদের ব্যাংকিং খাত লুট হতে হতে পঙ্গুত্ববরণ করেছে। আমাদের শেয়ারবাজার কারসাজি আর লুটেরাদের চক্রে বার বার পতিত হতে হতে বিনিয়োগকারীরা রিক্ত নিঃস্ব হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। প্রকৃতিও মাঝে মাঝে রুদ্ররুষ নেয়। দ্রোহ করে ওঠে। তাই কালবোশেখি ঝড়ের তা ব বয়ে যায়। মানুষের মনেও ক্ষোভ-দুঃখ বেদনা জমতে জমতে কখনো দ্রোহী করে। প্রতিবাদে জাগায়। আমাদের কেবল জাগে না বিবেকবোধ। আমাদের মানসিকতা মূল্যবোধহীন বিকারগ্রস্ততায় লোভ ও লালসার মোহে আচ্ছন্ন। রাতারাতি জনগণের সম্পদ, রাষ্ট্রের অর্থ লুটপাট করে অগাধ বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার, ভোগবিলাসে মত্ত হওয়ার মোহ নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজে আদর্শিক সৎ মানুষেরা যেন বোকা আর লুটেরা অসৎ নষ্টরা যেন যোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। নষ্টদের হাতে দিনে দিনে সব চলে যাচ্ছে।

গত জানুয়ারি মাস থেকে মধ্য মে পর্যন্ত তিন শতাধিক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার প্রায় অর্ধশত। প্রতিবন্ধী শিশুরাও যৌন বিকৃত পুরুষের লালসা থেকে রেহাই পায়নি। অর্ধশতাধিক যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাই ঘটেছে চার মাসে ১৬টি। ধর্ষিতা হয়ে ১০টি শিশু আত্মহত্যা করেছে। দেড় শতাধিক শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এই চিত্র এতই ভয়াবহ যে আমাদের বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধ দিনে দিনে কতটা মরে যাচ্ছে তার রূপটাই তুলে ধরেছে। পিতার কাছে সন্তান, শিক্ষকের কাছে ছাত্রী, বন্ধু, পরিচিত আত্মীয়তার বন্ধন ধর্ষকদের উন্মত্ততায় হারিয়ে যাচ্ছে। মসজিদের ইমাম থেকে মাদ্রাসার শিক্ষক হয়ে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত আজ যৌন নিপীড়ক নন, ধর্ষক! সমাজের সব শ্রেণি-পেশায় নারী ও শিশু হামেশা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গোটা সমাজ অসুস্থ হতে হতে রীতিমতো পচন ধরেছে। ধর্ষিতার কান্নার আওয়াজের সঙ্গে দেশে আজ ধর্ষকের উল্লাস চলছে। ছাত্রলীগের কমিটি ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ সংগঠনের বিক্ষুব্ধ অংশের ওপর হামলা চালাতে গিয়ে ছাত্রীদের কীভাবে রক্ত ঝরানো হয়েছে তা গোটা দেশ দেখেছে। পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজে নকলে বাধা দেওয়ায় বাংলা বিভাগের প্রভাষক মাসুদুর রহমানকে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি শামসুদ্দীন জুন্নুর নির্দেশে কীভাবে পেটানো হয়েছে তা বাংলাদেশ দেখেছে। অবশেষে জুন্নু গ্রেফতার হয়েছে। নুসরাত হত্যাকা  ঘিরে ফেনীতে কী ঘটেছে তা সবাই জানে। গোটা দেশে যখন বঙ্গবন্ধুকন্যা উন্নয়নের মহাকর্মযজ্ঞ চালিয়েছেন। তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি যখন উন্নত দুনিয়ার কাছে বিস্ময়কর, প্রশংসার তখন দেশজুড়ে সর্বত্র রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উন্নাসিকতায় কেউ কেউ তুঘলকি কারবার শুরু করেছেন। ধরাকে সরা জ্ঞান মনে করছেন। ক্ষমতা যে চিরস্থায়ী নয় এটা ভুলে যাচ্ছেন। এমনিতেই বলা হয় ব্রুট মেজরিটি কখনো কোনো সরকারের জন্য শেষ পর্যন্ত সাফল্য বয়ে আনে না। শেখ হাসিনা টানা তৃতীয় মেয়াদে এবার প্রায় সব আসনে জিতে ক্ষমতায় এসেছেন। রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যে দক্ষতা দেখিয়েছেন সেখানে আজ দলে অনুপ্রবেশকারীই হোক, দলবাজ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার দালাল, সুবিধাভোগী শ্রেণিই হোক আর দলের একটি অংশই হোক সব সাফল্য ধূসর করে দিচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রশাসনিক ছায়ায় একটা অশুভ শক্তি এই তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

শেয়ারবাজার আদৌ ঘুরে দাঁড়াবে কিনা তার খবর কেউ জানে না। দায়দায়িত্ব কেউ নিতেও নারাজ। এক দশক ধরে ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকও বাজে শেয়ার প্রবেশ করিয়ে সুখ নিদ্রা যাচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাঁটছেন। ঋণখেলাপিদের ঘুরে দাঁড়ানোর সহজ শর্তে ঋণ পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছেন। এটি প্রশংসিত হলেও কথা থেকে যায় যেসব ব্যবসায়ী চড়া সুদ নিয়মিত পরিশোধ করে নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছেন তাদের জন্য পুরস্কার কোথায়? ঋণখেলাপিরা সুবিধা পেলে এতদিন চড়া সুদ দিয়ে আসা প্রকৃত ব্যবসায়ীদেরও সন্তোষজনক সুবিধা কী দেওয়া হবে সেটি এখন প্রশ্ন। ব্যাংকিং খাত যারা লুট করে নিয়ে গেছেন দেশের টাকা যারা বিদেশে পাচার করেছেন তাদের বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং সেই টাকা ফিরিয়ে আনার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় সেটি দেখার অপেক্ষা।

কৃষকের গোলাভরা ধান কিন্তু মন ভরা আনন্দ নেই। চোখের কোনে চিকচিকে কান্না। বুকের ভিতর তীব্র দহন। বুকের যন্ত্রণায় প্রতিবাদী কৃষকের হাতে হারভাঙা পরিশ্রমে ফলানো ফসলের ধান আগুনে পুড়ে। লাভ দেখা দুরাশা, উৎপাদন খরচ পর্যন্ত পাচ্ছে না কৃষক। কৃষকের কোমর ভেঙে যাচ্ছে। স্লোগান উঠেছে “আর করব না ধান চাষ দেখব তোরা কি খাস?” ধান উৎপাদনে অনীহা জন্মেছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্রকে কৃষকের প্রতিবাদ স্পর্শ করেনি। তিনি বলেছেন, ধান পোড়ানোর ঘটনা পরিকল্পিত। এ নিয়ে সরকারি দলের হুইপ ও আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহমুদ প্রতিবাদ করেছেন। মন্ত্রীদের বক্তব্য কৃষকের মনে আশার আলো দিতে পারেনি। কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলেও বাজারে চালের দাম কমছে না। কৃষককে যে দামে ধান বিক্রি করতে হবে এতে লাভবান হবে চালকল মালিক ও দালাল। কৃষককে এভাবে লোকসানের পাল্লা গুনে নিঃস্ব হয়ে ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেওয়া যায় না।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা থাকতেই নরসিংদী থেকে কৃষক লীগকে নিয়ে সেনা শাসন জামানায় “কৃষক বাঁচাও দেশ বাঁচাও” আন্দোলন শুরু করে সফল হয়েছিলেন। তার প্রথম শাসন আমলেই তিনি দেশকে খাদ্য ঘাটতি থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত করেছিলেন। বন্যায় নিঃস্ব কৃষকের ঘরে খাবার দিয়েছেন। অকাল বন্যায় তিন বছর আগে হাওরের সব ফসল তলিয়ে গেলেও কৃষককে না খাইয়ে রাখেননি। আজ মন্ত্রীরা যত কথাই বলুন, আন্তর্জাতিক এমনকি পশ্চিমা উন্নত দেশের তুলনাই দিন না কেন এসব শেখ হাসিনার মনের ভাষা হতে পারে না। কৃষিতে ও ধানে বাম্পার ফলন শেখ হাসিনার উন্নয়নের ফল। তার কৃষিবান্ধব অর্থনীতি ও নানা পদক্ষেপে আজ কৃষকের গোলা ভরে ধান উঠেছে। সেখানে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা না গেলেও তাদের ক্ষতিটা কীভাবে পুষিয়ে দেওয়া যায়। তাদের মুখে হাসি ফুটানো যায়, সেই পথ তিনি বের করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আমরা আশা করি। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দাকালেও আমাদের অর্থনীতিকে প্রবাসী শ্রমিকের রেমিট্যান্স ও কৃষকের উৎপাদন রক্ষা করেছিল। কৃষক আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। প্রয়োজনে বিদেশে চাল রপ্তানি করে হলেও কৃষককে বাঁচাতে হবে। দেশের ঋণ খেলাপিদের মুখে হাসি ফুটানো গেলে হারভাঙা পরিশ্রমী সহজ সরল জীবনের সাধারণ সৎ কৃষকের মুখে কেন হাসি ফুটানো যাবে না। রাশেদ খান মেনন যথার্থই বলেছেন, ব্যাংক লুটেরাদের টাকা উদ্ধার করে কৃষককে দিয়ে দিন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “আমার কৃষক আমার শ্রমিক দুর্নীতি করে না, দুর্নীতি করে শিক্ষিতরা”। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার শাসন আমলে আজ সেটিই ঘটছে। তিনিও বলেছিলেন, আওয়ামী লীগারদের কেনা যায় শেখ হাসিনাকে কেনা যায় না। এটি সত্যে পরিণত হয়েছে। গত ১০ বছরে সারা দেশে দলের একটি অংশ এবং ক্ষমতাকে ঘিরে থাকা, আশ্রয়ে থাকা সুবিধাবাদীরা রাতারাতি ফুলেফেঁপে বড় হয়েছেন। তাদের অবৈধ বিত্তবৈভব ও ক্ষমতার দম্ভ সূর্যের চেয়ে বালির তাপের মতো বেশিই মনে হয়। এমনকি মাঝে-মধ্যে মনে হয় বঙ্গবন্ধু আজীবন সংগ্রাম করে নিজের জীবন দিয়ে এদের জন্যই যেন এই দেশটা বানিয়েছিলেন। আর তার কন্যা ৩৮ বছরের সংগ্রামে আজ দেশকে যত এগিয়ে নিচ্ছেন এই শয়তানরা আজ ক্ষমতার ডানায় ভর করে ততটাই পিছু টানছে। শুধু সরকার চাইলেই হবে না। একজন মুজিবকন্যা যুদ্ধ করলেই হবে না। দেশের জনগণকেও গণতান্ত্রিক আদর্শিক মূল্যবোধের বিবেকের তাগিদে সুশাসন নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে হবে।

লাখো লাখো শহীদের রক্তে কেনা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজদের অভয়ারণ্য হতে পারে না। ধর্ষকদের উল্লাস চলতে পারে না। কৃষকের কান্না, পাটকল শ্রমিকদের আহাজারি বাতাসকে ভারি করতে পারে না। রাষ্ট্রের চেয়ে লুটেরা চক্রের হাত শক্তিশালী হতে পারে না। সব ক্ষেত্রে সীমারেখা লঙ্ঘনের বন্যতা বরদাস্ত করতে পারে না এই দেশ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গ্রিন সিটি প্রকল্পে দুর্নীতির যে মহোৎসবের চিত্র বেরিয়ে এসেছে তার আজ তদন্ত ও কঠিন পদক্ষেপ দরকার। সেখানে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে একটি বালিশ কিনতে খরচ পড়েছে ৫৯৫৭ টাকা। আর একটি বালিশ ফ্ল্যাটে উঠাতে খরচ পড়েছে ৭৬০ টাকা। একেকটি বিছানার দাম পড়েছে ৫৯৮৬ টাকা। আর সেটা উঠাতে খরচ হয়েছে ৯৩১ টাকা। একটা খাটের দাম পড়েছে ৪৩৩৫৭ টাকা। আর উঠানোর ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০৭৭৩ টাকা। খাট কেনা হয়েছে ১১০টি। চাদর ও বালিশ কেনা হয়েছে ৩৩০টি করে। একটি বৈদ্যুতিক চুলার দাম পড়েছে ৭৭৪৭ টাকা। আর ওই চুলা উঠাতে ব্যয় হয়েছে ৬৬৫০ টাকা। একটি বৈদ্যুতিক কেটলির দাম পড়েছে ৫৩১৩ টাকা। আর তা উঠানোর খরচ দেখানো হয়েছে ২৯৪৫ টাকা। এমন হরিলুট ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রতিটি জিনিস কেনায় ও উঠানোতে যে ব্যয় হয়েছে তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। এতটা লিখে শেষ করা যাবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সব খানে মানুষ বলাবলি করছে- ‘বিসিএস দেবো না ডাক্তারও হবো না ব্যবসাও করবো না। রূপপুর গিয়ে বালিশ উঠাব।’ এই নির্লজ্জ হরিলুটের চিত্র শুধু কি রূপপুরে না সারা দেশে? শুধু কি গণপূর্ত কীভাবে নাকি সব বিভাগে? এটা খতিয়ে দেখতে দুদকের কি সৎ সাহসী লোকবল আছে? একজন জাহালম বিনা অপরাধে চেক জালিয়াতির মামলার জেল খাটে আর স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কেরানী আবজাল দেড় হাজার কোটি টাকার সম্পদ গড়ে। এমন তুঘলকি দুর্নীতি পৃথিবীর কোথায় আছে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন সেখানে আজ দেশের মানুষকে লাখো শহীদের রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিয়ে নামতে হবে। সব দুর্নীতিবাজ, লুটেরা অসৎ ও ধর্ষকদের রুখতে হবে।


আপনার মন্তব্য