Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৭ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ জুন, ২০১৯ ২৩:১৩

সাক্ষাৎকারে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

বাজেটে দুর্বলতা নেই রাজস্ব আয় বাড়বে বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

রুহুল আমিন রাসেল

বাজেটে দুর্বলতা নেই রাজস্ব আয় বাড়বে বাস্তবায়নই চ্যালেঞ্জ

প্রস্তাবিত বাজেটে কোনো দুর্বলতা নেই বলে মনে করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেছেন, এবার চ্যালেঞ্জ হলো বাজেট বাস্তবায়ন। এতে রাজস্ব আয় বাড়বে। অপ্রদর্শিত অর্থে সুবিধা দেওয়ার কারণে আবাসন খাত ও শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে করদাতার সংখ্যা এক কোটিতে পৌঁছে কর-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে চাই।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ-আইআরডির এই জ্যেষ্ঠ সচিবের মতে, সংস্কার হলে রাজস্ব আয় বাড়ে, এবারও বাড়বে। এই লক্ষ্যে এনবিআরের জনবল দ্বিগুণ করব। রাজস্ব আয় বাড়াতে করদাতাদের ভীতি দূর করা হবে। নতুন ভ্যাট আইনে ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দেশীয় শিল্প এবং রপ্তানি খাতেও সুবিধা দিয়েছি। তারপরও বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার নামে যারা অবৈধ ব্যবসা করছে, তাদের জেল-জরিমানাসহ অন্যান্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

গতকাল রাজধানীর সেগুনবাগিচার রাজস্ব ভবনে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বিসিএস ৮১ ব্যাচের অভিজ্ঞতাপূর্ণ একজন গুরুত্বপূর্ণ আমলা। দীর্ঘ কর্মজীবনে অর্থ, শিল্প, বাণিজ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ-বেজা এবং প্রাইভেটাইজেশন কমিশনসহ সরকারের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোতে অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি বিগত ২০১৮ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে এনবিআরে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার মতে, বিগত এক দশকে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি মোটামুটি ভালো। কর-জিডিপির অনুপাতও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আদায়ে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এক. করজাল বাড়াতে জরিপ পরিচালনা করা। দুই. প্রশাসনিক সংস্কার। তিন. বিভিন্ন সেবার বিপরীতে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর-টিআইএন বাধ্যতামূলক করা। চার. টিআইএনধারীদের আয়কর বিবরণী বা রিটার্ন দাখিলের আওতায় আনা। পাঁচ. আগামী ২০২১ সালের মধ্যে এক কোটি করদাতা সৃষ্টি করা। ছয়. হয়রানি ও ভীতি দূর করে কর প্রদানে নাগরিকদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা ও আস্থার ভাব ফিরিয়ে আনা।

তিনি বাজেট পেশের পর কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষকে বেশি চাপ দেওয়া হবে না। মাত্র ৩ থেকে ৪টি খাতে পণ্যের দাম বাড়বে। এর মধ্যে চিনিতে ৪ থেকে ৫ টাকা দাম বাড়বে। কারণ, এবার ১৫টি চিনির মিল টিকিয়ে রাখতে বাজেটে নজর দেওয়া হয়েছে। এসব মিলে ১৫ হাজার লোকের কর্মসংস্থান জড়িত। আর সব মিলিয়ে এই খাতে এক লাখ লোক নির্ভরশীল। এর সঙ্গে আছেন আখচাষিরাও।

আবার সয়াবিন তেলে আগে প্রদেয় ভ্যাট ফেরত পেতেন ব্যবসায়ীরা। এবার সয়াবিন তেল উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট আরোপ করেছি। ফলে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সঙ্গে মসলার ওপর ৫ শতাংশ কর বসানোর কারণে দাম সামান্য বাড়তে পারে। এতে সব প্রকার দ্রব্যমূল্যে চাপ পড়বে না। গুঁড়া দুধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গুঁড়া দুধ প্রকৃতপক্ষে বাচ্চাদের খাবার নয়। শিশুদের জন্য যেসব নির্দিষ্ট দুধ আমদানি হয়, সেখানে কোনো কর আরোপ করা হয়নি। ফলে শিশুদের গুঁড়া দুধের দাম বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। কিন্তু সবার মনে রাখা উচিত যে- দেশে মিল্কভিটা খুব ভালো মানের দুধ উৎপাদন করে। অনেক খামারি প্রচুর দুধ উৎপাদন করছেন, কিন্তু যেভাবে দুধ উৎপাদন হচ্ছে, সেভাবে দাম পাচ্ছে না তারা। ফলে মিল্কভিটাসহ অন্য খামারিরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে। তাদের উৎসাহ ধরে রাখতে বড়দের গুঁড়া দুধ আমদানিতে নামমাত্র করারোপ করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কোন ধরনের সংযোজন-বিয়োজন হতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন- প্রতি বছরই প্রস্তাবিত বাজেট চূড়ান্তকরণের সময় কিছু নতুন যুক্ত হয়, কিছু বাদ পড়ে, আবার কিছু বিষয়ে স্পষ্টকরণ করা হয়। আসলে বাজেট নিয়ে সংসদে আইনপ্রণেতারা কী বলেন, তার ওপর নির্ভর করছে কী পরিবর্তন আসবে।

বাড়ি ভাড়ার ওপর ৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে সব ক্ষেত্রে এই কর আরোপ করা হয়নি। ফলে একজন সাধারণ মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে যে বাসা বা বাড়ি ভাড়া নেবেন, সেখানে উৎসে কর প্রযোজ্য হবে না। কিন্তু কোনো কোম্পানি ব্যবসায়িক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহৃত হবে, এমন বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে বাড়িওয়ালাকে ভাড়ার অর্থ প্রদানের সময় ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সোনা চোরাচালান ও অর্থ পাচার প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, চোরাচালান প্রতিরোধের লক্ষ্যে বাণিজ্যিকভাবে সোনা আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এখন ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ফি দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নিয়ে সোনা আমদানি করতে পারবেন। ফলে সোনা চোরাচালান কমে আসবে বলে মনে করছে সরকার। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা সব প্রকার সোনা বৈধ করতে করমেলা হচ্ছে। এতে প্রতি তোলা সোনা বৈধ করা যাবে মাত্র এক হাজার টাকা কর দিয়ে। আশা করছি ব্যবসায়ীরা এই সুযোগ নিয়ে চোরাচালানে আসা সোনা বৈধ করবেন। তার দাবি, আগামী দিনগুলোতে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মিথ্যা ঘোষণা বন্ধ করা যাবে। বিশেষ করে পণ্য স্ক্যানিং মেশিন দিয়ে চেকিং করে। প্রস্তাবিত বাজেটে শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি ব্যবস্থা বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার অপব্যবহার বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, রপ্তানির স্বার্থে সুতা, কাপড় ও কাগজ আমদানিতে নতুন কর আরোপ করিনি। তবে বন্ড সুবিধার আড়ালে চোরাচালান ও অপব্যবহার বন্ধে ব্যাপক নজরদারি বাড়ানো হবে। ইতিমধ্যে ১৬০টি বন্ড লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এ ছাড়া যারা অবৈধভাবে ব্যবসা করছে, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বন্ডের পণ্য বিক্রি করতে যেসব অবৈধ মার্কেট তৈরি হয়েছে, তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আগামীতে বন্ডের পণ্য অবৈধভাবে কেউ বাজারজাত করলে, সব প্রকার কর সুদে-আসলে আদায় করে, চোরাকারবারিদের জেল ও জরিমানা নিশ্চিত করা হবে। বাজেটের প্রভাব আবাসন খাতে কেমন পড়তে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আবাসন খাতে যে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুবিধা দিয়েছি, তা আগেও ছিল। কিন্তু আগে করের পরিমাণ ও রেজিস্ট্রেশন খরচ বেশি হওয়াতে ক্রেতারা সাড়া দেয়নি। তাই এবার করহার কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন করবে না, এটাও নিশ্চিত করেছি। একই সুবিধা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে শিল্প স্থাপনের জন্য বিনিয়োগকারীদের দেওয়া হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে প্রশ্ন ছিল- এত বড় বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জন হবে কিনা- তিনি বলেন, প্রতিবছর বাজেট যত বড় হবে, রাজস্ব আয়ের টার্গেটও তত বেশি থাকবে। এই টার্গেট অর্জনের আপ্রাণ চেষ্টা থাকবে এনবিআরের। ভ্যাট ফাঁকি ঠেকানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সব দ্রব্যের ওপর সাধারণ মানুষ ভ্যাট দেয়, অনেক সময় কিছু ব্যবসায়ী এই ভ্যাটকেও নিজেদের লাভের অংশ ধরে নেয়। এজন্য আমরা আগামীতে ইলেকট্র্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা ইএফডি বাধ্যতামূলকভাবে বসাব। এটা করতে আগামী এক বছর সময় লাগবে। এ বছর নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য ব্যবসায়ীদের বেশ কিছু ছাড়ও দেওয়া হয়েছে।


আপনার মন্তব্য