Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ জুন, ২০১৯ ০০:০৬

বন্ডের দুই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট

শীর্ষ মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণে হাজার হাজার ট্রাকে আসছে বন্ডের অবৈধ পণ্য, কাস্টমস পুলিশ মনে হয় অসহায়

রুহুল আমিন রাসেল

বন্ডের দুই ভয়ঙ্কর সিন্ডিকেট

অবৈধভাবে বন্ডের পণ্য কালোবাজারে বিক্রিতে জড়িত আন্ডারগ্রাউন্ডের দুই সিন্ডিকেট ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। এই শীর্ষ চোরাকারবারিদের নিয়ন্ত্রণে শত শত ট্রাকে আসছে বন্ডের অবৈধ পণ্য। এদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অবৈধ পণ্য খালাসের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে বেনাপোল স্থলবন্দর। এখানে হামেশা অবৈধভাবে খালাস হচ্ছে ট্রাকবোঝাই পণ্য। অন্যদিকে চোরাচালানের পণ্যে পুরান ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে গড়ে উঠেছে অবৈধ গুদাম। ভয়ঙ্কর এই দুই সিন্ডিকেটের গডফাদার বিপুল দাস প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহাল তবিয়তে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, বন্ডেড ওয়্যারহাউসের অবৈধ চোরাচালানে জড়িত দুটি বড় সিন্ডিকেটের মাফিয়া সদস্যদের কাছে জিম্মি দেশীয় শিল্প খাত। শুল্কমুক্ত আমদানি সুবিধার অপব্যবহার করে কাপড়, কাগজ, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করছে চোরাকারবারিরা। তারা প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার পাশাপাশি চোরাচালান বাণিজ্যে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে তারা দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে লাখ লাখ মানুষকে বেকারত্বের কঠিন জাঁতাকলে ফেলে দিয়েছে। এই ভয়ঙ্কর দুই সিন্ডিকেটের আসল হোতা পুরান ঢাকার বিপুল দাস ও জুয়েল। এর মধ্যে বিপুল দাসের নেতৃত্বে বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমসকে ম্যানেজ করে মিথ্যা ঘোষণায় শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসছে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কাগজ। বিপুল দাসের নেতৃত্বে এই অবৈধ কারবারে জড়িত পুরো পুরান ঢাকার চোরাচালানের নিয়ন্ত্রক হক ট্রেডিংয়ের মালিক জাহাঙ্গীর হক, গোল্ডেন ব্রাইডের মালিক অনিল দাস, সিয়াম অ্যান্ড সিফার মালিক সেলিম, সীমান্ত ট্রেডিংয়ের মালিক মিলন এবং সিটি পেপার হাউসের মালিক আবুল বাশার।

অন্যদিকে বন্ড সুবিধার আড়ালে আমদানি হওয়া কাগজজাতীয় পণ্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আঁতাত করে কালোবাজারে বিক্রিতে জড়িত রয়েছে চার সদস্যের আরেকটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন নয়াবাজারে চোরাচালানের গডফাদার হিসেবে পরিচিত মহসিন অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক জুয়েল। এর অন্য দুই সহযোগী আবুল হোসেন মার্কেটের কর্ণধার আবুল হোসেন ও নয়াবাজার আওয়ামী লীগের নেতা রাশেদ শিকদার। বন্ডের পণ্য চোরাচালানে জড়িত এই সিন্ডিকেটের সবাই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছেন। এদিকে দিনভর প্রকাশ্যে বন্ডের অবৈধ কাগজ বিক্রি হচ্ছে পুরান ঢাকার নুরজাহান মার্কেট, জাহাঙ্গীর মার্কেট, চান মিয়া মার্কেট ও সানফ্লাওয়ার মার্কেটে। এর মধ্যে নুরজাহান মার্কেটেই বন্ডের কাগজ বেশি বিক্রি হয়। এই মার্কেটের সাদিয়া এন্টারপ্রাইজ, আর এস এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন ব্রাইড ইন্টারন্যাশনাল, মহসিন অ্যান্ড ব্রাদার্স, খালেদ ইন্টারন্যাশনাল, সোহেল ট্রেডিং করপোরেশন, ফনিক্স ইন্টারন্যাশনাল, কবির অ্যান্ড ব্রাদার্স ও আল্লাহর দান পেপার হাউসে প্রকাশ্যে বন্ডের অবৈধ কাগজ বিক্রি হচ্ছে খোলাবাজারে। অন্যদিকে চান মিয়া মার্কেটের মাহফুজ এন্টারপ্রাইজ, জাহাঙ্গীর মার্কেটের আলী হোসেন ট্রেডার্স ও সানফ্লাওয়ার মার্কেটের সানফ্লাওয়ার ট্রেডিং বন্ডের কাগজজাতীয় পণ্য বিক্রি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে সহজেই বন্ড সুবিধায় আমদানি হওয়া ভারতীয় কৃষ্ণা ও কোরিয়ার হানসোল, শিয়া ও ঘোড়া ব্র্যান্ডের কাগজজাতীয় পণ্য বিক্রি হচ্ছে।

জানা গেছে, নয়াবাজার ও ইসলামপুরে এই মাফিয়া-গডফাদারদের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। হুন্ডির মাধ্যমে তারা অর্থ পাচার করে অবৈধভাবে কাগজ ও কাপড় আনছে। এই মাফিয়াদের কারণে টেক্সটাইল, কাগজ, প্লাস্টিক, দেশীয় বিভিন্ন শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তৈরি পোশাক, বস্ত্র ও পিভিসি কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। বন্ডের পণ্যের অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এসব চোরাকারবারির তথ্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে রয়েছে। সরেজমিন দেখা যায়, পুরান ঢাকার নয়াবাজার ও ইসলামপুরে প্রতিদিন গভীর রাতে ট্রাকে ট্রাকে খালাস হয় কাপড়, প্লাস্টিক ও কাগজজাতীয় বিভিন্ন পণ্য। চোরাকারবারিরা এসব পণ্য বিক্রি করছে কালোবাজারে। রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় আনা পণ্যের অবৈধ বাণিজ্যে ধ্বংস হচ্ছে দেশীয় শিল্প খাত। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সিনিয়র সহসভাপতি মুনতাকিম আশরাফ বলেন, ‘বন্ডের অবৈধ কারবার ও চোরাচালানের কারণে দেশীয় শিল্প খাত ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। দেশের উদ্যোক্তারা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে শিল্প গড়েছেন। এখন সেই শিল্প অবৈধ চোরাচালানের কারণে ধ্বংস হলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তাই অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অ্যাকশন দেখতে চান এই ব্যবসায়ী নেতা।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আড়ালে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’ বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, ‘বন্ডের এই মাফিয়ারা দেশীয় শিল্প খাত ধ্বংস করে দিচ্ছে। চোরাকারবারিদের এই গোষ্ঠী দেশ ও জাতির শত্রু। এসব মাফিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’ বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল বলেন, ‘বন্ডের অনিয়মের বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার। বন্ডে যেসব অনিয়ম আছে, তা দূর করতে হবে।’ জানা গেছে, আমদানিপ্রাপ্যতা নির্ধারণ আদেশের দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কাঁচামাল আমদানির পর তা বিক্রি করে দিচ্ছে একশ্রেণির ব্যবসায়ী নামধারী চোরাকারবারি। দু-একটি ঘটনা বন্ড কর্মকর্তাদের হাতে ধরা পড়লেও বেশির ভাগ থাকছে আড়ালে। অনেক প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি আদেশ যৎসামান্য থাকলেও শুধু মেশিনের উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী প্রাপ্যতা নির্ধারণ করিয়ে নিচ্ছে। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করছেন অসাধু কর্মকর্তারা। পরে তা খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়।


আপনার মন্তব্য